সাহিত্যের স্বায়ত্তশাসন প্রসঙ্গ ওয়ালীউল্লাহ এবং শহীদুল জহির

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাঙালির চিন্তাজগৎ ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক গভীর রূপান্তর ঘটছে, যা শুধু নন্দনতাত্ত্বিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে কাজ করছে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষমতার নতুন বিন্যাস। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু (১৯৪৮) থেকে শুরু করে সমকালীন শহীদুল জহিরের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সাম্প্রতিক তর্কবিতর্ক— এক করে দেখার সুযোগ আছে। সাহিত্যকে তার স্বকীয় নন্দনতাত্ত্বিক ও দার্শনিক জায়গা থেকে না পড়ে, তাকে নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক ‘প্রকল্প’ বা প্রজেক্টের অধীন করার যে প্রবণতা, তা আমাদের চিন্তাজগৎকে সংকুচিত করে দিচ্ছে কি না, ভাবা দরকার। এ দুই ভিন্ন সময়ের লেখকদের কেন্দ্র করে মূলত একটি একক, ঐতিহাসিক এবং গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটই উন্মোচিত হচ্ছে আমার কাছে।
ত্রিমুখী প্রকল্পের ফাঁদ
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু শুধু একটি ভণ্ড মাজারের অসারতাকে ডিল করে না; বরং তা ছিল সামন্ততান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের ভেতর গ্রথিত ভয়, অস্তিত্বের সংকট এবং আধ্যাত্মিকতার নামে ক্ষমতার রাজনীতির এক নিখুঁত উন্মোচন। কিন্তু দীর্ঘদিনের পঠন-পাঠনের ধর্মীয় ও প্রগতিশীল ডিসকোর্স এই মহান উপন্যাসটিকে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বা প্রজেক্ট বানিয়ে তুলেছে।
এখানেই দেখা যায় এক অদ্ভুত সমাপতন, যেখানে বিপরীতমুখী মেরুগুলো আসলে একই সূত্রে গাঁথা।
সালাফি ও ওহাবিদের প্রকল্প (শুদ্ধ আকিদার বয়ান): সালাফি ও ওহাবি ধারার ইসলামিস্টদের প্রধান এজেন্ডা হলো সমাজ থেকে মাজার, পীরপ্রথা এবং লোকায়ত ইসলামের ‘বেদাত’ বা কুসংস্কার দূর করা। তারা যখন লালসালু পাঠ করে, তখন তাদের উদ্দেশ্য ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যগুণ বা শোষণের মনস্তত্ত্ব বোঝা নয়। তারা মজিদের ভণ্ডামিকে ব্যবহার করে এটা প্রমাণ করতে যে— মাজার সংস্কৃতি মানেই হলো শিরক ও ধোঁকাবাজি। অর্থাৎ, উপন্যাসটিকে তারা নিজেদের ‘শুদ্ধ আকিদা’ প্রতিষ্ঠার একটি নেতিবাচক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করে।
সুন্নিদের একাংশের প্রকল্প (ধর্ম অবমাননার বয়ান): সুন্নিদের যে অংশটি মাজার, পীর এবং লোকায়ত সুফি ঐতিহ্যকে ধারণ করে, তাদের অবস্থান এর ঠিক বিপরীত। তারা মজিদের চরিত্রটির ভেতর মাজার সংস্কৃতির ওপর একটি বড় আঘাত দেখতে পায় এবং মনে করে, এ উপন্যাসের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে পীর-মাশায়েখ এবং তাদের ধর্মীয় আবেগকে খাটো করা হয়েছে। ফলে, তাদের প্রকল্পে লালসালু হয়ে ওঠে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ হানার একটি প্রগতিশীল চক্রান্ত। সুন্নিদের অন্য অংশটি মাজার রাখতে চায় তাদের মনমতো শরিয়তসম্মত উপায়ে; যেখানে মিলাদ, জিয়ারত, মানত সঠিক নয়। আর মাজারের পাগল, ভক্ত, মুরিদ ও ছিন্নমূলসহ অন্যদের থেকে মাজারের অধিকার কেড়ে নিয়ে শরিয়ার নামে নিজেদের আকিদা প্রতিষ্ঠা করা। মাজারকেন্দ্রিক আলোচনা তারা সহানুভূতির সঙ্গে শুরু করে, কিন্তু শেষ করে অসামাজিক কার্যকলাপের বয়ান এবং তথাকথিত মাদকবিরোধী মন্তব্যের মাধ্যমে। তারা নিজেদের আকিদা অনুযায়ী সংস্কারের নামে কার্যত মাজার দখল করতে চায়।
প্রগতিশীলদের প্রকল্প (সামগ্রিক ধর্ম-বিরোধিতার হাতিয়ার): অন্যদিকে, সেক্যুলার বা প্রগতিশীলদের একটি বড় অংশ ওয়ালীউল্লাহর অস্তিত্ববাদী দর্শনকে আড়াল করে একে তাদের নিজস্ব এজেন্ডায় ফিট করেছে। তাদের প্রজেক্ট হলো— মজিদকে দেখিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যে, ধর্ম মানে শুধুই প্রতারণা, ক্ষমতার লোভ আর পশ্চাৎপদতা। তারা উপন্যাসের আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও মানুষের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে বাদ দিয়ে একে শুধুই ‘ধর্মীয় শোষণের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ইশতেহার’ হিসেবে পাঠ করতে চায়।
এ সবকটি পক্ষই আসলে সাহিত্যকে তার রূপক, বহুমাত্রিকতা এবং মানুষের ভেতরের অস্তিত্ববাদী সংকট থেকে বিচ্যুত করে টেক্সটটিকে শুধুই একটি ‘মতাদর্শিক ইশতেহার’ বা ‘আইডিওলজিক্যাল প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে দেখতে চায়। ফলে, ওয়ালীউল্লাহ পাঠ বহুদিন ধরে একটা এলিট অংশের ভেতর সংকুচিত করে সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে অদরকারি করে তোলা হয়েছে।
শহীদুল জহির এবং বাস্তবতার ম্যাজিক
ওয়ালীউল্লাহর পর আজ যখন শহীদুল জহির চাঁদমারি হয়ে উঠতে থাকে তখন সংকটের শিকড়টা বুঝে ওঠা দরকারি, নিজের মতো করে। শহীদুল জহির বাংলা সাহিত্যে এমন এক কথাকার, যিনি বাঙালির অবদমিত মনস্তত্ত্ব, ঢাকা শহরের গলি এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ট্রমা ও ক্ষতকে এক অলৌকিক কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
সাম্প্রতিককালে তার উপন্যাসে রাজাকারের দাড়ি-টুপি থাকা নিয়ে যে আপত্তি, তা মূলত সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বকে রাজনৈতিক সেন্সরশিপের অধীন করার প্রয়াস। ১৯৭১ সালের বাস্তবতায় পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের একটা বড় অংশের দাড়ি-টুপি বা ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার ছিল এক অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য। জহির সেই সত্যকে তার নিজস্ব আখ্যানে তুলে এনেছেন। একে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে খাটো করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা আসলে সাহিত্যের ইতিহাস-সচেতনতা এবং রূপক তৈরির ক্ষমতাকে অস্বীকার করার শামিল।
দুই সময়, এক সংকট
ওয়ালীউল্লাহ ও শহীদুল জহিরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল বিষয়বস্তু বা চরিত্রের রূপায়ণে নয়, বরং সাহিত্যের স্বাধীনতার প্রতি তাদের আস্থায়। ওয়ালীউল্লাহ লিখছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে, যখন ধর্মের মোড়কে এক নতুন জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি হচ্ছিল; আর শহীদুল জহির লিখেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও তার পরবর্তী ট্রমা নিয়ে। দুই সময় ভিন্ন, কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই সাহিত্য ক্ষমতার অস্বস্তিকর অঞ্চলকে উন্মোচন করেছে। তারা কেউই ধর্ম, জাতি বা ইতিহাসের সরকারি ভাষ্য (Official Narrative) লেখেননি; তারা লিখেছেন মানুষের জটিলতা। কিন্তু সাহিত্যগুণের প্রভাব বিবেচনায় তাদের লেখা বারবার মতাদর্শের আদালতে তোলা হয়েছে। এ সংকটের মূলে রয়েছে সাহিত্যপাঠের কয়েকটি মৌলিক এবং পদ্ধতিগত বিকার— সাহিত্যকে টেক্সট নয়, প্রমাণ হিসেবে পড়ার প্রবণতা: উপন্যাসকে একটি স্বাধীন নন্দনতাত্ত্বিক সৃষ্টি হিসেবে দেখার পরিবর্তে, একে ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা নৈতিক অবস্থান প্রমাণের দলিল বা ‘ডকুমেন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
চরিত্র ও লেখককে এক করে ফেলার প্রবণতা: উপন্যাসের কোনো চরিত্রের বক্তব্য, আচরণ বা প্রতীককে সরাসরি লেখকের ব্যক্তিগত মতাদর্শ হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে— যা সাহিত্যপাঠের সবচেয়ে প্রাথমিক ভুল। মজিদের শঠতা যেমন ওয়ালীউল্লাহর ইসলামবিদ্বেষ নয়, তেমনি জহিরের উপন্যাসে রাজাকারের দাড়ি-টুপিও লেখকের কোনো গোষ্ঠীগত বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ নয়। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, শহীদুল জহিরও মুক্তিযুদ্ধের বয়ানের রাজনীতির নিশানার পড়ে জনপরিসরে অদরকারি এবং ওই একটি এলিট সাহিত্যগোষ্ঠীর কাছে কুক্ষিগত হয়ে পড়তে পারে।
পরিচয় রাজনীতির অধীনে সাহিত্যের অধীনস্থতা: সাহিত্যকে তার বহুমাত্রিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধর্মীয়, জাতীয়তাবাদী বা মতাদর্শিক পরিচয়ের কঠিন পরীক্ষায় বসানো হচ্ছে। ফলে টেক্সটের ভেতরের জটিলতা ও ধূসর অঞ্চলগুলো (Grey areas) হারিয়ে যাচ্ছে। ‘মজিদ’ বা ‘রাজাকার’কে কেন্দ্র করে কোনো সংযোগ তৈরি হচ্ছে না, বরং ‘সাহিত্যকে কীভাবে পড়া হচ্ছে’— এ প্রশ্নটিই বড় হয়ে উঠছে। লালসালুতে মজিদকে শুধু ‘ধর্মের প্রতিনিধি’ বানালে যেমন উপন্যাস সংকুচিত হয়, শহীদুল জহিরের চরিত্রগুলোকে শুধু ‘একটি পরিচয়গোষ্ঠীর প্রতিনিধি’ বানালেও একই সংকোচন ঘটে। উভয়ক্ষেত্রেই সাহিত্য তার চরিত্র হারিয়ে পরিচয়-রাজনীতির শুষ্ক নথিতে পরিণত হয়।
সামাজিক ও নৈতিক সেন্সরশিপের বিস্তার: রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সেন্সরশিপের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে সামাজিক মাধ্যম, জনমত ও সংগঠিত পরিচয়ভিত্তিক চাপ। এই নতুন ধরনের ‘মব সেন্সরশিপ’ লেখক ও সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণের নতুন ও বিপজ্জনক হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
সাহিত্যের স্বায়ত্তশাসনের সংকট: সাহিত্য যদি শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য, ধর্মীয় শুদ্ধতা বা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ছকে বিচার হয়, তবে তার নিজস্ব কল্পনা, রূপক, দ্ব্যর্থতা ও সমালোচনামূলক শক্তি ক্রমশ হারাতে থাকবে। দুই ভিন্ন সময়ের এ দুই লেখকই শেষ পর্যন্ত একই আদি ও অকৃত্রিম প্রশ্নের মুখোমুখি— সাহিত্য কি তার সত্য বলবে, নাকি ক্ষমতার পছন্দসই সাজানো বয়ানকে তুষ্ট করবে?
পরিচয় রাজনীতি, পেট্রো-ডলার এবং মাজার ভাঙার দর্শন
এই পুরো মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে এক সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর—
ইসলামীকরণ ও পেট্রো-ডলারের প্রভাব: গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্স এবং পেট্রো-ডলারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বাঙালির চিরায়ত সুফি ও মরমি ঐতিহ্যকে হটিয়ে এক ধরনের কঠোর, লৈখিক এবং রিচুয়ালসর্বস্ব ধর্মতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
মাজার ভাঙার রাজনীতি: অতি সম্প্রতি মাজার ভাঙার যে হিড়িক দেখা গেছে, তা শুধু স্থাপত্য ধ্বংসের বিষয় নয়; এটি আসলে সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা। যে মজিদ লালসালুতে মাজার তৈরি করে ক্ষমতার ভিত্তি গড়েছিল, আজকের শুদ্ধতাবাদী গোষ্ঠীগুলো সেই মাজার ভেঙে নিজেদের ক্ষমতার আধিপত্য কায়েম করতে চায়।
ইতিহাসের বিনির্মাণ ও মুক্তিযুদ্ধ: শহীদুল জহিরকে টার্গেট করার অর্থ হলো মুক্তিযুদ্ধের বয়ানকে নিজেদের সুবিধাজনক ছাঁচে ঢেলে সাজানো। যখন কোনো লেখক ইতিহাসের সেই ধূসর ও কুৎসিত সত্যগুলোকে শৈল্পিক সততায় তুলে ধরেন, তখন তা নতুন রাজনৈতিক শক্তির অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন জারি রাখা প্রয়োজন। লালসালুর সেই মজিদই কি একাত্তরে রাজাকারের রূপ ধারণ করেছিল আর চব্বিশের পটভূমিতে এসে সেই মজিদই কি আবার খোলস বদলে মাজারের ওপর হামলাকারী হয়ে উঠছে? স্থান-কাল-পাত্রভেদে মজিদের অবয়ব বদলাতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার লোভ এবং ধর্মের মোড়কে আধিপত্য বিস্তারের মনস্তত্ত্বটি একই থেকে যায়। আজ যে শুদ্ধতাবাদীরা মাজার ভাঙছে, তারা আসলে ওয়ালীউল্লাহর মজিদেরই এক উল্টো পিঠ— চরিত্র ভিন্ন হলেও ক্ষমতার সমীকরণটি একই।
এবং সাহিত্যের প্রতিরোধ
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ থেকে শহীদুল জহির— এ যাত্রাপথটি আসলে দেখায় কীভাবে একটি সমাজ ক্রমেই তার বহুত্ববাদ, পরমতসহিষ্ণুতা এবং শৈল্পিক জটিলতা গ্রহণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। সাহিত্য কোনো সরল সমীকরণ নয় যে, তাকে ‘সঠিক আকিদা’ বনাম ‘ভুল আকিদা’ কিংবা ‘ধর্ম’ বনাম ‘প্রগতি’র বাইনারিতে ভাগ করে ফেলা যাবে। শহীদুল জহির বা ওয়ালীউল্লাহকে যখন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন মূলত বাঙালির সেই বহুমাত্রিক আত্মপরিচয়টাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, যা একই সঙ্গে ধার্মিক, মরমি, ধর্মনিরপেক্ষ এবং বিপ্লবী। সাহিত্যকে তার নিজস্ব দার্শনিক স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দিতে হবে।




