প্রিয় ৫ বই
- মহাভারত— কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
- গীতবিতান— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ— ফিওদর দস্তয়েভস্কি
- সিদ্ধার্থ— হারম্যান হেস
- শ্রেষ্ঠ কবিতা— ভাস্কর চক্রবর্তী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মহাভারত
মহাভারতের অনেক নামের ভেতরে একটি নাম ছিল ‘জয়’। কীসের জয়, কার পরাজয়? একজন মানুষ আসলে কে? কী তার পরিচয়? মহাভারত পড়লে এর উত্তর হলো— মানুষের আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছাই হলো সেই মানুষ। সে কী চায়? কীভাবে চায়?— এর উত্তরের একজন মানুষের পরিচয় উঠে আসে। মহাভারত পড়লে একজন মানুষ, যদি তার কোনো দক্ষতা থাকে, তো সেই দক্ষতার দায় বারবার অনুভব করতে পারে। মহাভারত বিশাল বই। বড় বইয়ের একটি বড় দিক হলো— এ বই অনেকটা সময় আমাদের চুপ থাকতে সাহায্য করে। আর যে চুপ থাকতে পারে, সেই ভাবতে পারে। মহাভারত পড়া শুরু করা মাত্র বিচিত্র ভাবনা শুরু হয়। ভাবো, ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো। ঋত্বিক ঘটকের এই সহজ কিন্তু গভীর কথার আসল মরতবা মহাভারত পড়া ও পড়ে ভাবার ভেতরে টের পাওয়া যায়।
গীতবিতান
প্রতিদিনই যে বইয়ের পাতা উল্টে ধ্যানের জগতে চলে যাওয়া যায়, চলে যাওয়া যায় আনন্দের জগতে। ‘তার অন্ত নাই যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ’ বা ‘আকাশভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ’ বা একদম ছোট্ট তিন লাইনের গান ‘নূতন প্রাণ দাও প্রাণসখা আজি সুপ্রভাতে’— প্রতিদিনের বেঁচে থাকার জ্বালানি, সেই সঙ্গে বহু জ্বালাপোড়া নিমেষে দূর করে দেওয়ার মতো গান। সেলিম আল দীন গীতবিতানের সূত্রে রবীন্দ্রনাথকে বলতেন পৃথিবীর দুর্বোধ্যতম কবি। আমার নিজেরও মনে হয়, এত রহস্য, এত গূঢ়ৈষা আর কোনো রচনায় পাওয়া যায়! বারবার নতুন নতুন দুয়ারে হানা দেওয়া; কোনো দুয়ার অনেক ঠেলায়ও খোলে না, কোনোটাবা সহজে খুলে যায়। যেমন ‘দীর্ঘজীবনপথ কত দুঃখতাপ কত শোক দহন’— এর মতো গান। এমন করে বারবার নিজেকে খুঁজে পাওয়া ও খুঁজে পেয়ে ফের হারিয়ে যাওয়ার মতো গ্রন্থ আর কি আছে জগতে?
দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ
বলা হয় তিন হাজার বছরের সেরা বইগুলোর এটি একটি। কেন? মিখাইল বাখতিনের মতে, উপন্যাসের শীর্ষদেশ স্পর্শ করেছেন ফিওদর দস্তয়েভস্কি। এ এমন এক গভীর দার্শনিক ও জীবনবাদী উপন্যাস, দস্তয়েভস্কিও খ্রিস্টীয় ভাবধারা পেরিয়ে সারা জগতের সব মানুষের উপন্যাস হয়ে ওঠে। দিমিত্রি, ইভান ও আলিওসা কারামাজভের পাশে স্মার্দিয়াকভও আমাদের চেতনার জগতে ঢুকে জানিয়ে দিতে থাকে— আমরা কে কেমন? উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলো জিতে যাওয়া, হেরে যাওয়া পেরিয়ে জীবন-উদযাপনের দিকে নিয়ে যায়। দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ জীবনের তেমনই বই। বারবার পড়েও যে বই শেষ হয় না। রবীন্দ্রনাথের গান যেমন শোক পেরিয়ে যাওয়ার টানে টান দেয়, এই উপন্যাসও ঠিক তেমন করেই টান মারে রাত্রিজাগানো নদীর দিকে।
সিদ্ধার্থ
কোনো বই সম্পর্কে এই নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন যে, এই বই পড়লে আপনার জীবন বদলে যাবে, কিন্তু সিদ্ধার্থ সম্পর্কে এ কথাটা ভরসার সঙ্গেই বলা যায়। এই বইও আত্ম-আবিষ্কারের বই। এই বই প্রতিদিনের জন্ম-মৃত্যু থেকে জেগে ওঠার বই, এই বই অপার সহজজীবনের দিকে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দেওয়ার বই। এই উপন্যাস থেকে করা কনরার্ড রুকসের চলচ্চিত্র সিদ্ধার্থতে যখন বলা হয়, ‘স্টপ সার্চিং, গিভ লাভ’— তখন অস্তিত্বে কাঁপন ধরে। জার্মান ভাষায় তো পড়া আপাতত সম্ভব নয়, কিন্তু ইংরেজি অনুবাদের এই বইয়ের আশ্চর্য গীতিময়তা যতবার পড়া হয়, ততবার পাগল করে দেয়।
শ্রেষ্ঠ কবিতা
এখন এটি নিত্য অভ্যাস হয়ে গেছে। যেখানেই যাই— কোনো দীর্ঘ কি হ্রস্ব সফরে, সবসময়ের সঙ্গী এই বই। যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো কবিতা পড়তে পারি। পড়ে কিছুক্ষণ বইটা বন্ধ করে রাখি। কতবার যে একই কবিতা আগের বা একেবারেই ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতিতে মাতিয়ে দেয়! কখনোবা মগ্নচৈতন্যে শিস দিয়ে বেজে উঠতে থাকে জীবনের অপার নিঃসঙ্গতা, নাগরিক বিচ্ছিন্নতা আর প্রেম-আবেশ। কারও কারও মতে ভাস্করের কবিতার আত্মা আছে, শরীরটা সম্পূর্ণ নয়— তাতে আমার নিজের কোনো অসুবিধা হয় না। তার জ্যান্ত-জীবন্ত কবিতার স্রোতে আমাকে বারবার প্রকৃত কবিতাযাপনের স্বাদ দেয়। একজন গদ্য লেখকের জন্য কবিতার পড়ার এই দানকে কখনো কি অস্বীকার করা যায়?



