মোস্তফা কামাল
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ১১০ মেগাওয়াটে নিতে চায় মেঘনা গ্রুপ
- সাত কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প
- সবুজ প্রযুক্তিতে বাড়ছে বিনিয়োগ
- পুনর্ব্যবহার ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে গুরুত্ব

গ্রিন ডায়ালগে বক্তব্য দিচ্ছেন মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ৬৫ মেগাওয়াট। নতুন সাতটি শিল্প-কারখানায় আরও ৪৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আছে প্রতিষ্ঠানটির। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গ্রুপটির ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ১১০ মেগাওয়াটে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ : জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আয়োজনে প্যানেল আলোচনায় এ তথ্য জানান এমজিআই চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল।
তিনি বলেন, ‘পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। শিল্পের উৎপাদন বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পানির ব্যবহারে আরও দক্ষ হতে হবে, বর্জ্য কমাতে হবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করতে হবে।’
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলার অংশ। মেঘনা গ্রুপের পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের মধ্যে কাগজ ও প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার অন্যতম।’
২০০৭ সালের দিকে কাগজ পুনর্ব্যবহারের কারখানা চালুর কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিত্যক্ত কাগজ ও কার্টন সংগ্রহ করে সেগুলো পুনরায় উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করেও পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব উপাদান থেকে প্লাস্টিক দানা তৈরি করে নতুন পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। কিছু পুনর্ব্যবহৃত উপাদান গ্রুপের নিজস্ব কারখানায় ব্যবহৃত হয়, বাকিগুলো সরবরাহ করা হয় অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে।
রপ্তানিমুখী জাম্বো ব্যাগ উৎপাদনে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহারের কথা তুলে ধরে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পুনর্ব্যবহৃত উপাদানের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। বর্জ্য সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করা সম্ভব।’
মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু আছে। আরও সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর পরিকল্পনা জানান এমজিআই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদনের উপজাত অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু উপজাত পশুখাদ্য তৈরিতে এবং কিছু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ রয়েছে।’
বগুড়ার একটি অটোমেটিক রাইস মিলে ধানের তুষ থেকে তেল আহরণ এবং অবশিষ্ট উপাদান পশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যবহারের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
রাসায়নিক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে এই শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, ‘উৎপাদনের উপজাত যাতে নদী বা পরিবেশে সরাসরি ফেলে দিতে না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াজাতকরণব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এতে বর্জ্য কাজে লাগানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে আমাদের একটি নতুন আটা উৎপাদন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ হাজার ২০০ টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে।’
পরিবেশবান্ধব ইস্পাত উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগের কথাও জানান এমজিআই চেয়ারম্যান। বলেন, ‘বাংলাদেশে ইস্পাত উৎপাদনের কিছু প্রচলিত পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও কার্বন নিঃসরণের ঝুঁকি রয়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মেঘনা গ্রুপের নতুন ইস্পাত কারখানাটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ভিত্তিতে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসির অর্থায়ন রয়েছে।’
‘এই কারখানার কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশ স্ক্র্যাপ স্টিল বা ব্যবহৃত ইস্পাত থেকে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইলেকট্রিক ফার্নেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্ক্র্যাপ গলিয়ে ইস্পাত উৎপাদন করা হবে’, যোগ করেন তিনি।
শিল্পাঞ্চলে সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর গাছ লাগানোর নির্দেশনা রয়েছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনাতেও বৃক্ষরোপণ ও গাছের পরিচর্যার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।’
‘চলতি বছর আমরা ৮০ হাজার বৃক্ষরোপণ করেছি। আমরা মনে করি, শিল্পায়নের পাশাপাশি সবুজ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কারখানা, সড়ক, শিল্পাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় গাছ লাগানো হলে পরিবেশের উন্নতিতে সহায়ক হয়।’ তবে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে স্থান নির্বাচন, উপযুক্ত প্রজাতি বাছাই এবং নিয়মিত পরিচর্যার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
বক্তব্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।



