মানিকগঞ্জের অতীত, বর্তমানের সংকট ও ভবিষ্যতের উন্নয়ন নিয়ে কিছু কথা

মানিকগঞ্জ শহর
আমার বয়স আশি পেরিয়েছে। বলতে পারেন মানিকগঞ্জ শহরের সমানই আমার বয়স। পরিণত বয়সে সংসারজীবন, রাজনৈতিক জীবন কিংবা পেশাগত জীবনের শত সংকটের সময়ে এই শহর এবং তার পাশ দিয়ে প্রবহমান কালীগঙ্গাই আমার সঙ্গী হয়েছে। শৈশব থেকে আজও দেখছি এই শহরকে, এই নদীকে। দুই দেখার মধ্যে অনেক তফাত হয়ে যাচ্ছে আজকাল। কিছু ভালো হয়েছে, কিছু আমরা হারিয়েছি।
মানিকগঞ্জ একসময় নদী ও খালকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল। ১৮৭২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ মহকুমার শহর এলাকায় ১১ হাজার ৫৪২ জন মানুষ বাস করতেন। তৎকালীন ঢাকা জেলার অন্যান্য মহকুমা শহরের তুলনায় এই জনসংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।
কুচবিহার, আসাম, ত্রিপুরা ও রংপুর থেকে পণ্যবাহী নৌযান মানিকগঞ্জে আসত। পাট, ডাল, গুড়, সরিষা ও তামাকের ব্যবসা ছিল জমজমাট। নদী ও খাল ছিল মানুষের যাতায়াতের পথ। একই সঙ্গে এগুলো শহরের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
তখন সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা আজকের মতো উন্নত ছিল না। খাদ্যশস্য পরিবহনে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হতো। পাঁচশ থেকে এক হাজার মণ পণ্যবাহী নৌকা কালীগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদী থেকে খালপথ ধরে খাদ্যগুদাম পর্যন্ত আসত। তখনকার খালগুলো এখনকার তুলনায় অনেক বেশি প্রশস্ত ও গভীর ছিল।
পরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক চালু হয়। সড়ক যোগাযোগ বাড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরনও বদলে যায়। ধীরে ধীরে নদী ও খালের ওপর আমাদের নির্ভরতা কমে আসে।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলেও আমরা পুরোনো নদী ও খালগুলো সচল রাখার প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিইনি।
শহরের প্রধান খালটিই এখন সংকটে
আজ মানিকগঞ্জ শহরে বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটির দিকে তাকালে কষ্ট হয়। পুরো খালটায় ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষাকালেও খালের বিভিন্ন অংশে পানি আসে না। বিগত সময়ে নামকাওয়াস্তে এক কিলোমিটারের জায়গা সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছে। কিন্তু খালের প্রধান সমস্যার সমাধান হয়নি।
আগের মতো খালটির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে শহরের পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ ও সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আমাদের শৈশবের সেই টইটম্বুর থই থই স্বচ্ছ পানি দেখতে পাব। তাই প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করে খাল খনন, সংযোগপথ পুনরুদ্ধার, বর্জ্য অপসারণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে বছরে অন্তত কয়েক মাস খালটিতে পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা যেতে হতে পারে।
সহজভাবে বললে, প্রথমে খালের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে জরিপ করতে হবে। কোথায় পানি প্রবেশের পথ বন্ধ, কোথায় খাল ভরাট হয়েছে, কোথায় দখল কিংবা আবর্জনার কারণে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এগুলো শনাক্ত করতে হবে। একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, শুধু সৌন্দর্যবর্ধন করে হাত গুটিয়ে নিলে হবে না। শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার প্রধান ও অন্যতম অবলম্বন হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে খালটির খনন ও যথাযথ সংস্কারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ও বাস্তবধর্মী উদ্যোগ চাই
ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের বড় একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আমার প্রাণের শহর মানিকগঞ্জও এর বাইরে নয়। সম্প্রতি পৌরসভার ডেঙ্গুবিরোধী পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিয়ে নাগরিকদের প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অভিযোগ, কিছু জায়গায় খালের পাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা হলেও খালের মাঝখানে জমে থাকা পানি ও জলজ আগাছার জায়গাগুলো যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হয়নি।
এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার। কারণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধের কর্মসূচি শুধু লোক দেখানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কোথায় পানি জমে আছে, কোথায় এডিস মশার প্রজনন হতে পারে এবং কোন জায়গায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবে যাচাই করতে হবে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানে পানির উৎসগুলো শনাক্ত করা, জমে থাকা পানি অপসারণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমি মনে করি, পৌর প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার।
সমস্যা মানিকগঞ্জের, প্রশ্নটি হয়তো গোটা দেশের
দেশের বিভাগীয় বড় শহরগুলোর বাইরে অনেক জেলা শহরেই পানি, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ও মশাবাহিত রোগের সমস্যা রয়েছে। দূষিত পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রভাব সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপরই পড়ে।
মানিকগঞ্জের এসব সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থার কথা ভাবা দরকার। যেখানে নিরাপদ পানি, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনস্বাস্থ্যকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এলাকার মানুষের দুর্ভোগ ও নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রয়োজন অনুভব করেছি। দেশে-বিদেশে ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তি থেকেও এ বিষয়ে ধারণা পেয়েছি।
এই ব্যবস্থায় সৌরশক্তিচালিত পানি সরবরাহ, আধুনিক ড্রেনেজ, মল-কাদা পরিশোধন এবং জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস তৈরির ব্যবস্থা থাকতে পারে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এসব কাজে স্থানীয় মানুষকেও যুক্ত করা জরুরি।
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিকল্পনাটি কতটা ভালোভাবে বাস্তবায়িত হয়। সাধারণ মানুষ এর সুফল পাচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে মানিকগঞ্জের পানি, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি সম্ভব।
আমার স্বপ্নের মানিকগঞ্জ
আমি প্রায়ই ভবিষ্যতের মানিকগঞ্জকে কল্পনা করি। ধরুন, ২০৩১ সালের এক সকাল। আমার নাতনি বা কেউ একজন প্রাতরাশের সময় কলের নিচে হাত ধুচ্ছে। কমিউনিটি পানি সরবরাহব্যবস্থা থেকে সেই পানি আসছে। সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে পানির পাম্প চলছে। পানি শোধন করা হচ্ছে। নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফলও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে।
এখন আর রাস্তায় বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয় না। রাস্তা এমন উপাদান দিয়ে তৈরি হতে পারে, যার মধ্য দিয়ে বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশ করতে পারে। একে ‘পোরাস পেভমেন্ট’ বলা হয়। পাশের ড্রেন দিয়ে বাকি পানি সরে যায়।
২০২৬ সালের মতো জীর্ণশীর্ণ কালীগঙ্গায় নৌকা বাইচের বদলে আরও প্রশস্ত, গভীর ও স্রোতস্বিনী নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন হচ্ছে। ৫ কিলোমিটারের পুরো খালটি সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি আরও প্রশস্ত, গভীর হয়েছে। খালের পানি সেচ ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য ব্যবহার হচ্ছে। ছুটির দিনের বিকালগুলোতে মানুষজন অবসর সময় কাটাচ্ছে নির্মল বাতাসে।
বাজারের জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরি হচ্ছে। কিছু বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করা হচ্ছে। প্লাস্টিক আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের জন্য রাখা হচ্ছে। আগে যে বর্জ্য খালে ফেলা হতো, তা এখন পরিবেশের ক্ষতি না করে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। এ সংক্রান্ত সমস্যার সম্মুখীন হলে, ভুক্তভোগী ডিজিটাল মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও এসব অভিযোগের জবাব দিতে হচ্ছে।
এই দৃশ্য আমার কল্পনা। ২০৩১ সালে মানিকগঞ্জ ঠিক এমন হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু ২০৩১ সালের মানিকগঞ্জকে এমনই দেখতে চাই।
বড় প্রকল্পের পাশাপাশি আরও যেসব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎস থেকেই জৈব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে পরিবেশদূষণ কমবে। একই সঙ্গে কম্পোস্ট তৈরি ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
নাগরিকদের অংশগ্রহণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় মানুষ যেন খাল দখল, আবর্জনা, জলাবদ্ধতা ও পানি সরবরাহের সমস্যা জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তারা যেন নিজেদের অভিযোগের অগ্রগতি দেখতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
আইনজীবী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ



