মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ খোরশেদ

রোগীদের বিনা ভাড়ায় চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে দেয় এই অ্যাম্বুলেন্স
মাস ছয়েক আগে নিজ বাড়ির সামনের সরু গলিতে বুকে ব্যথা নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন ট্রাকচালক নূর ইসলামকে। পরে রিকশায় করে হাসপাতালে নিতে নিতে প্রাণ যায় তার। ঘটনাটি ‘করোনা বীর’ খোরশেদকে নাড়া দেয়। ভাবেন সরু গলিতে চলাচলের উপযোগী অ্যাম্বুলেন্স সুবিধাসমৃদ্ধ যান তৈরির কথা। দেশীয় যন্ত্রাংশ আর সাশ্রয়ী সরঞ্জাম ব্যবহার করে স্থানীয় ‘মিস্ত্রিকে দিয়ে থাইল্যান্ডের অটোরিকশা ‘টুক টুক’-এর আদলে তৈরি করেন তিন চাকার বিদ্যুৎচালিত অ্যাম্বুলেন্স। এরপর তাতে স্ট্রেচার, অক্সিজেন সিলিন্ডার, বেড স্থাপন করেন। মাত্র সাড়ে ৩ লাখ টাকায় তৈরি এই অ্যাম্বুলেন্স ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। একবার চার্জ দিলে চলে টানা আট ঘণ্টা। মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে একজন চালক নিয়োগ দেন। পাঁচজনের একটি টিম ২৪ ঘণ্টা নারায়ণগঞ্জ সিটি এলাকাসহ ফতুল্লা, বন্দর, আড়াইহাজার, সোনারগাঁয়ে রোগী পরিবহন করছেন বিনা ভাড়ায়। গত ৫ জুন উদ্বোধনের পর তিন মাসে তিনশর বেশি রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সসেবা দেওয়া হয়েছে। প্রধানত রোগীদের হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আনা-নেওয়া এবং মরদেহ কবরস্থান বা শ্মশানে নেওয়ার জন্য চালু করা হয়েছে এই অ্যাম্বুলেন্সসেবা। গত ৫ জুন এই অ্যাম্বুলেন্স উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক সহকারী ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের চারবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ (৫৩) জানালেন, ২০১৩ সালে তিনি গার্মেন্টস ব্যবসায় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এরপর মনস্থির করেন বাকি জীবন মানুষের সেবায় কাটিয়ে দেবেন।
২০২০ সালে করোনা মহামারীর শুরুতে যখন ভয়ে কেউ করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফন বা সৎকার করতে এগিয়ে আসছিলেন না, তখন ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন খোরশেদ। তার নেতৃত্বে গঠিত স্বেচ্ছাসেবী দল ‘টিম খোরশেদ’ করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গে মারা যাওয়া ৩৭৫ ব্যক্তির দাফন ও সৎকার করে সাড়া জাগিয়েছিলেন। এবার তিনি চালু করেছেন ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা।
‘স্বল্প আয়ের মানুষ চাইলেই একটা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে পারেন না, সেক্ষেত্রে দেশীয়ভাবে তৈরি এই অ্যাম্বুলেন্স একদিকে যেমন সাশ্রয়ী তেমনি প্রত্যন্ত এলাকা, সরু গলির বাসা থেকেও রোগী পরিবহনের সক্ষম। এই সেবা চালুর পর থেকে বিনামূল্যে হটলাইনের মাধ্যমে মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছি’— বললেন খোরশেদ।
‘টিম খোরশেদ’-এর অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আলী সাহাব, আনোয়ার মাহমুদ, নাঈম মোল্লা ও আনোয়ার হোসেন।
খোরশেদের ভাষ্য, ‘মানুষ স্বস্তি পাচ্ছেন, এটা দেখতে পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত।’ তিনি জানালেন, বর্তমানে সোলারনির্ভর একটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স (মরদেহ পরিবহনের জন্য) নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
খোরশেদের নেতৃত্বে তার টিম ২০০৪ সাল থেকে মানুষকে খাদ্য সহায়তা, সেলাই মেশিন, সাইকেল প্রদান, শিক্ষার্থীদের আর্থিক অনুদান দিয়ে আসছে। প্রতি ঈদে ১০ হাজার পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, ছিন্নমূল মানুষকে রান্না করা খাবার বিতরণ, পুলিশের সহযোগিতায় অজ্ঞাত মৃতদেহ দাফন/সৎকার, ফ্রি অক্সিজেন সরবরাহ, রক্তদান কর্মসূচি, রাস্তায় পড়ে থাকা অজ্ঞাত অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, হুইলচেয়ার বিতরণ, ছিন্নমূল মানুষকে কম্বল ও মশারি বিতরণ, প্রচণ্ড গরমে শ্রমজীবী মানুষকে বিশুদ্ধ ঠান্ডা পানি, শসা, হাতপাখা বিতরণসহ নানা কার্যক্রমে সবসময় সক্রিয় তিনি।
এসব কাজের জন্য খোরশেদ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সনদ ও স্বীকৃতিপত্র পেয়েছেন।



