আবুধাবিতে মা-ছেলের মৃত্যু : যাবার আগে বন্ধুদের জাগিয়ে গেল মায়াবতী

ছেলের সঙ্গে অসীমা চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার আধার মানিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন ‘মায়াবতী’। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তার সরব উপস্থিতি বন্ধুদের সক্রিয় রাখত সবসময়। গত সোমবার সকালে লিখেছিলেন, ‘শুভ সকাল, দিনটা সবার ভালো কাটুক।’ বিকালে হাসির ইমোজি দিয়ে শেষ মেসেজে লিখেছিলেন, ‘সেটা ইহকালের চিরুনি অভিযান করলে পাবে বলে মনে হয় না। যা নাই তা তোমাদের চাই।’ সেই মেসেজের কয়েক ঘণ্টা পরই আবুধাবিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান অসীমা চৌধুরী ও তার ছেলে অরিত্র বিশ্বাস। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার স্বামী প্রকৌশলী সরূপ বিশ্বাস।
গত সোমবার বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে বন্ধুদের গ্রুপে শেষবারের মতো শুভ সকাল জানিয়েছিলেন অসীমা। এরপর কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বিকালেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। আবুধাবি সময় বিকাল পৌনে ৪টার দিকে গ্রুপে শেষ মেসেজটি পাঠান। রাতে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার পথে তাদের প্রাইভেট কারটিকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয় আরেকটি গাড়ি। এতে ঘটনাস্থলেই মা ও ছেলের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার সময় গাড়ি চালাচ্ছিলেন সরূপ। তাদের স্নাতকপড়ুয়া মেয়ে গাড়িতে না থাকায় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান।
অসীমার মৃত্যুতে আধার মানিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ‘স্কুল ৯৩’ শোকাচ্ছন্ন। গ্রুপের বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন প্রাণের ‘মায়াবতী’। তার পীড়াপীড়িতে কেউ গ্রুপে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারতেন না। তিনি চ্যাট শুরু না করলে যেন কারও ঘুমই ভাঙত না। সবাইকে আড্ডায় টেনে আনা, খোঁজখবর নেওয়া আর বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট রাখাই ছিল তার স্বভাব। সেই মানুষটির শেষ মেসেজের পর আর কোনো সাড়া না পেয়ে শোকে স্তব্ধ বন্ধুরা।
অসীমার শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কদুরখিল এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সরূপ দ্বিতীয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পরিবার নিয়ে আবুধাবিতে বসবাস করছেন। অসীমার বাবার বাড়ি রাউজানে। তার মা ও ভাই দেশে থাকেন না। রাউজানের আধার মানিক গ্রামেই কেটেছে অসীমার স্কুলজীবন। আধার মানিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। আবুধাবিতে একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করার পাশাপাশি গানও করতেন অসীমা।
প্রবাসে থেকেও স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন তিনি। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের জন্য গড়ে তুলেছিলেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ‘স্কুল ৯৩’। গ্রুপের সবাইকে উজ্জীবিত রাখার দায়িত্ব যেন নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন। তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি বন্ধুদের দৈনন্দিন আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।
বন্ধু সুবর্ণা চৌধুরী ফেসবুকে অসীমাকে স্মরণ করে লিখেছেন, ‘আবুধাবির বানিয়াস সেন্ট্রাল মর্গে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিথর শুয়ে আছে আমার স্কুলবেলার বন্ধু চম্পা। ক্লাস সিক্সে যার নাম পালটে রাখা হয়েছিল অসীমা; সে আজ জীবনের সীমা অতিক্রম করে চলে গেল! বন্ধুদের গ্রুপে সবচেয়ে সরব জন আজ নীরব! কথা ছিল একদিন শুধু আমাকে জানিয়ে দেশে ফিরবে। তারপর বন্ধুদের একটা আড্ডা হবে। সেই আড্ডায় সবাইকে চমকে দিয়ে সে হাজির হবে। অথচ আজ সবাইকে চমকে দিয়ে সে পত্রিকার শিরোনাম! কত দীর্ঘ পথ আমরা চলেছি একসঙ্গে! আজ শুধুই স্মৃতি! ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে।’
অসীমা ও তার ছেলে অরিত্রের মরদেহ আবুধাবির বানিয়াস সেন্ট্রাল মর্গে রাখা হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যিনি বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আড্ডায় মেতে ছিলেন, তার এমন আকস্মিক চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না কেউ। বন্ধুদের কাছে অসীমা ছিলেন সেই মানুষ, যিনি সবাইকে জাগিয়ে রাখতেন, একসঙ্গে বেঁধে রাখতেন। শেষবারের মতো মেসেজ দিয়ে চলে যাওয়া সেই ‘মায়াবতী’ এখন তাদের কাছে শুধুই স্মৃতি।




