প্রজন্মকে বইয়ে ফেরাচ্ছেন খালিক উদ্দিন

শহর বদলে দিতে সবসময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি ছোট ঘর, কয়েকটি বই আর একজন মানুষের দৃঢ় স্বপ্নই তৈরি করতে পারে পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া শহরের ব্যস্ততম সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে তেমনই একটি ছোট্ট ঘর। যার নাম ‘আদর্শ পাঠাগার’। বাইরে শহরের কোলাহল, ভেতরে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা একদল পাঠক। আর এই পাঠাগারের পেছনে রয়েছেন একজন মানুষ— শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক মো. খালিক উদ্দিন।
২০১৯ সালের ১ অক্টোবর। যখন মোবাইলের স্ক্রিন ক্রমেই মানুষের অবসর আর আড্ডার বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে, ঠিক তখনই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন খালিক উদ্দিন। পারিবারিক শিক্ষা সহায়তা সংগঠন ‘আহমদ জে. সোহান ফাউন্ডেশন’-এর সহযোগিতায় কুলাউড়া শহরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আদর্শ পাঠাগার’। উদ্দেশ্য একটাই, মানুষকে আবার বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনা।
শুরুতে ছিল অল্প কিছু বই, ছোট্ট একটি ঘর। তবে ছিল সীমাহীন স্বপ্ন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও অবশ্য ছিল। সবচেয়ে বড় যেটি ছিল, তা হলো মোবাইলের স্ক্রিন ফেলে মানুষ কি আবার বই পড়বে?
খালিক উদ্দিন অবশ্য হাল ছাড়েননি। তার বিশ্বাস ছিল, মানুষের ভেতরে জ্ঞানের তৃষ্ণা কখনো শেষ হয় না, প্রয়োজন শুধু সেই তৃষ্ণাকে জাগিয়ে তোলার।
সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি স্কুলে স্কুলে গেছেন, কলেজের করিডরে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন বই। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ফাঁকে বই পড়ার উপকারিতা নিয়ে কথা বলেছেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বলেছেন, ‘একটি বই পড়ে দেখুন, জীবনকে হয়তো অন্যভাবে দেখতে শুরু করবেন।’ ধীরে ধীরে তার সেই আহ্বানে সাড়া দিতে শুরু করে মানুষ।
তার গড়ে তোলা আদর্শ পাঠাগার শুধু বই ধার দেওয়া বা পড়ার জায়গা হয়ে থেমে থাকেনি। বই পড়াকে মানুষের কাছে আনন্দের অভিজ্ঞতায় পরিণত করতে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় ‘আদর্শ পাঠাগার বইপড়া উৎসব’। এতে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন মা-মেয়ে, বাবা-ছেলে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা। আয়োজকদের কাছে এটি শুধু প্রতিযোগিতা নয়; বরং বই থেকে দূরে সরে যাওয়া একটি প্রজন্মকে আবার বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে আটটি বিশেষ ইভেন্টের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৭০০ পাঠককে বই পড়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন খালিক উদ্দিন। বই পড়ায় উৎসাহ দিতে পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছেন নগদ অর্থ, বৃত্তি, বই ও বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ। তার লক্ষ্য, একটি বই পড়ার আনন্দ যেন পাঠককে পরবর্তী আরেকটি বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করে।
বই পড়ানোর পাশাপাশি বই উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি। এ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রায় ছয় হাজার কপি বই মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতেও গিয়েছেন। নিজের উদ্যোগে দিয়েছেন বই। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও লাইব্রেরিয়ানদের অনুরোধ জানিয়েছেন, তারা যেন শিক্ষার্থীদের বইমুখী করতে চেষ্টা করেন। পাশাপাশি বই পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে সাধ্যমতো বিভিন্ন সহযোগিতাও করেছেন।
বর্তমানে আদর্শ পাঠাগারের দুটি শাখায় বই রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কপি। তবে পাঠকের তুলনায় এই সংগ্রহকে অপ্রতুল মনে করেন প্রতিষ্ঠাতা খালিক উদ্দিন। প্রতিদিন নতুন পাঠক পাঠাগারে আসেন। তারা নতুন বই খোঁজেন, পছন্দের বই পড়তে চান। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় চাহিদামতো বই সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না।
খালিক উদ্দিন বললেন, ‘আমার পাঠাগারের নিজস্ব কোনো আর্থিক উৎস নেই। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও নিয়মিত কোনো আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যায় না। ফলে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।’ এই সীমাবদ্ধতাই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
‘একটি বই দান মানে একটি আলো দান’
মো. খালিক উদ্দিন বলছিলেন, ‘আমি পেশায় একজন শিক্ষক। তবে আমার শিক্ষার্থীদের কখনো শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিনি। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন গঠনমূলক বই পড়ার জন্য তাদের উৎসাহিত করি। কুলাউড়া শহরে এমন একটি পাঠাগার গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, যেখানে বই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষ আবার বইয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন।’
সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে বই দান করতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘একটি বই দান করা মানে একটি আলো দান করা। আপনার দেওয়া একটি বই হয়তো একজন কিশোরকে কিশোর গ্যাং থেকে ফিরিয়ে আনবে, একজন তরুণীকে নতুন স্বপ্ন দেখতে শেখাবে।’



