থাইল্যান্ড হতে পারে বাংলাদেশিদের ব্যবসার উর্বরভূমি

সংগৃহীত ছবি
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের প্রাণকেন্দ্র সুকুমভিতের ‘নানা’ মেট্রোরেল স্টেশনের কাছেই ‘কিউ মার্ট’। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোরশেদুল আলমের বাড়ি বাংলাদেশের ফেনীতে। বাংলাদেশিদের জন্য যেকোনো পণ্যে বিশেষ ছাড় রয়েছে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির স্টাফ নারায়ণগঞ্জের আফ্রিদী। তিনি ব্যাংককের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করছেন।
মোরশেদ আলম বছর তিনেক আগে ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে ব্যবসা করতেন। পণ্য কেনাকাটার সুবাদে তাকে নিয়মিত ব্যাংককে যাতায়াত করতে হতো। ব্যবসার সম্ভাবনা ও সুযোগ বুঝতে দেরি হয়নি মোরশেদের। সাহস করে বাংলাদেশের ব্যবসা গুটিয়ে ব্যাংককে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন। গত তিন বছরে ছোট্ট দোকানটি এখন বড় সুপারশপে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশিদের জন্য সেখানে ভালো ব্যবসা করার সুযোগ রয়েছে বলে এই প্রতিবেদককে জানান মোরশেদ আলম। তিনি এখন পরিবার নিয়ে ব্যাংককে বসবাস করছেন এবং সেখানে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
মোরশেদ আলমের মতো বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মী মাজেদুল নয়নও ব্যাংককে সফলভাবে ব্যবসা করছেন। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, ভ্রমণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সাংবাদিক মাজেদুল নয়ন। পর্যটনসহ এসব সেবা নিয়ে তাঁর একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। দিন দিন তার ব্যবসা বড় হচ্ছে বলে জানান নয়ন।
শুধু মোরশেদ বা মাজেদুল নয়নই নন, ব্যাংককে রয়েছেন আরও অনেক সফল বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। তাদের ভাষ্য, থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের জন্য ব্যবসার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। সাহস করে শুরু করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। দেশটির বাজারে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে। কেউ ইলেকট্রনিকস ও যন্ত্রপাতি, কেউ গাড়ি ও শিল্পের যন্ত্রাংশ, আবার কেউ জ্বালানি, রাসায়নিক ও কৃষিপণ্য সরবরাহ করে বাজার সম্প্রসারণ করছে। সেখানে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর) থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, থাইল্যান্ডের সঙ্গে কৃষি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন ব্যাংককে।
তিনি আরও বলেন, থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে।
বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। কৃষকেরাও অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে হালাল বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
শুধু দুই দেশের বাণিজ্যঘাটতি কমানোই সরকারের লক্ষ্য নয়; বরং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ গড়ে তুলে সামগ্রিক বাণিজ্য বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হবে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এর বিপরীত ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে।
থাইল্যান্ডের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির মোট আমদানি ছিল প্রায় ৩০১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে এসেছে প্রায় ৮০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা মোট আমদানির ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। জাপান থেকে এসেছে ২৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, তাইওয়ান থেকে ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে যথাক্রমে ১৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, থাইল্যান্ডের বাজারে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে চীন থাইল্যান্ডে টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক পণ্য, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্যের বড় সরবরাহকারী। জাপান গাড়ি, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতিতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাইওয়ান সরবরাহ করে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক চিপ ও কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে শিল্পপ্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহের ক্ষেত্র জ্বালানি ও খনিজ তেল।
থাইল্যান্ডের নিজস্ব উৎপাদন ও রপ্তানি শিল্পও বিস্তৃত। দেশটি কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিকস, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, রাবারজাত পণ্য, চাল এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করে। ফলে বিদেশি সরবরাহকারীদের জন্য শুধু ভোক্তাবাজার নয়, দেশটির শিল্পকারখানার সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, সিরামিক, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য থাইল্যান্ডের বাজারে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এসব পণ্যের প্রকৃত চাহিদা, আমদানি শুল্ক, স্থানীয় প্রতিযোগিতা, পণ্যের মান ও বাজারে প্রবেশের শর্ত যাচাই করে রপ্তানি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
থাইল্যান্ডে বাজার সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের স্থানীয় আমদানিকারক ও পরিবেশকদের সঙ্গে অংশীদারত্ব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় অংশগ্রহণ এবং ই-কমার্সভিত্তিক বিপণনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মানসম্মত পোশাক, পরিবেশবান্ধব পাটপণ্য, প্রতিযোগিতামূলক দামের সিরামিক এবং নির্ধারিত মান পূরণকারী ওষুধের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে।





