আগে সংস্কার, তারপর ঋণ, বার্তা আইএমএফের
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির সঙ্গে সংস্কার করতে হবে রাজস্ব খাত

ছবি: আগামীর সময়
আর্থিক খাতের সংস্কার বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশকে ঋণ দেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে আইএমএফের আলোচনা চলছে। আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি রাজস্ব খাত সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি। সংস্থাটি মনে করে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতির চাপ, কম রাজস্ব আহরণ ও দুর্বল আর্থিক খাত নিয়ে সমস্যা আছে। সেক্ষেত্রে সমন্বিত রাজস্ব ও আর্থিক খাত সংস্কার প্রয়োজন।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকালে এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক জোনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফের ব্রিফিং হয়। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এক প্রশ্নের জবাবে এ পরামর্শ দিয়েছেন সংস্থাটির এশিয়া প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃঞ্চ শ্রীনিবাসন।
আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে বাংলাদেশের জন্য ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। পরে সেই ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে অন্তর্বর্তী সরকার।
চলতি বছরের মে মাসে ওই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাসীন বিএনপি। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ।
এদিকে গত ৩ জুন আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার জানান, সরকার নতুন একটি প্যাকেজের জন্য আবেদন করেছে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে কৃঞ্চ শ্রীনিবাসন বললেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, এ অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত তিনটি শক্তি দ্বারা প্রভাবিত। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর উচ্চ জ্বালানি নির্ভরতা। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি খাতের এআই দ্রুত বিকাশ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, শুল্ক বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট বাণিজ্য সংকট।
‘বিপরীতে, যেসব দেশ সরাসরি প্রযুক্তিগত বিপ্লব থেকে উপকৃত হচ্ছে না, তাদের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে মন্থর গতিতে এগোচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তজনার মধ্যেও এশিয়ার দেশগুলোর এ ভিন্নমুখী প্রবণতা বেশ স্পষ্ট। অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে এ অঞ্চল আগামী দিনগুলোতেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সচেষ্ট রয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হয় বাংলাদেশ বিগত সাড়ে তিন বছর ধরে তীব্র মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে শুধু মুদ্রানীতি আরও কঠোর করে কি মূল্যস্ফীতির এ চাপ সামলানো সম্ভব, নাকি আরও সুনির্দিষ্ট নীতি-সহায়তা প্রয়োজন। পাশাপাশি, বাংলাদেশের বর্তমান সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আপনারা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
জবাবে আইএমএফের এশিয়া প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃঞ্চ শ্রীনিবাসন বললেন, ‘প্রশ্নগুলোর জন্য ধন্যবাদ। বাংলাদেশ সম্পর্কিত প্রশ্নটি দিয়ে শুরু করছি। আমি মনে করি, আমাদের সার্বিক মূল্যায়ন হলো রাজস্ব, আর্থিক এবং যেমনটি আপনি প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হওয়া অব্যাহত রয়েছে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব সেপ্টেম্বরে ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশে কঠোর আর্থিক অবস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বললেন, ‘এ ছাড়া কঠোর মুদ্রানীতির বাইরেও বেশ কিছু সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য কৌশল দরকার। কারণ এ মুহূর্তে আর্থিক খাত অত্যন্ত দুর্বল রয়ে গেছে। জিডিপির সঙ্গে রাজস্বের অনুপাত সময়ের সঙ্গে হ্রাস পেয়েছে এবং এটি বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি (৭ শতাংশ)। তাই রাজস্ব খাতে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কারণ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক ব্যয় এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার জন্য রাজস্বের সত্যিই প্রয়োজন রয়েছে।’
‘আর তাই, আমরা বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি’, যোগ করেন কৃঞ্চ শ্রীনিবাসন।
আইএমএফের এ কর্মকর্তা আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশের তহবিলসংক্রান্ত (ঋণ) বিষয়েও আমি কিছু কথা বলি। আপনারা জানেন, আগের ঋণ কর্মসূচির অধীনে বিতরণ কার্যক্রম আর চালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর সরকার গত মে মাসে একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আইএমএফকে অনুরোধ করেছিল। সে প্রেক্ষাপটে গত জুলাই মাসে আমাদের একটি কর্মকর্তা দল বাংলাদেশ সফর করেন। যেখানে এ সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বছরের শুরুতে আমাদের প্রকাশিত নিবন্ধের পরামর্শের সঙ্গে খুবই মিল রয়েছে। তারপর থেকে আমরা নিয়মিত আলোচনায় যুক্ত আছি।’
‘কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য আমরা উন্মুখ হয়ে আছি।’



