জগন্নাথ হল ট্রাজেডির ৪১ বছর আজ

তৎকালীন জাতীয় দৈনিকগুলোতে জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির খবর
আজ ১৫ অক্টোবর ২০২৬, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৪১ বছর। দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে মমতাজ হোসেনের লেখা ‘শুকতারা’ নাটকটি প্রচার শুরু হওয়া মাত্রই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রাণ হারায় ছাত্র, অতিথিসহ অনেকে।
সেদিন বিকেল থেকে আকাশে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল। বিনোদনের মাধ্যম বলতে বেতার ছাড়া শুধু বিটিভি ছিল। রঙিন টেলিভিশন সব জায়গায় না পৌঁছালেও জগন্নাথ হলের অ্যাসেম্বলি হলে ছিল। তাই সবার মতো আশপাশের অফিসের মানুষজনেরও বিশেষ ইচ্ছা থাকতো কত তাড়াতাড়ি আগে থেকেই ভালো একটা জায়গায় বসে নাটকটি পুরোপুরি উপভোগ করা যায়।
মৃত্যু কপালে লেখা থাকলে কেউ ঠেকাতে পারে না। সে রাতে এমন ঘটনা ঘটেছিল। নেতা গোছের কেউ আগে থেকে বসে থাকা দুজনকে তুলে দিলে তারা বেঁচে যায় প্রাণে।
রাত সাড়ে ৮টার কিছু পর। বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছিল টিভি রুম।
সে রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জগন্নাথ হলের সাবেক ছাত্র এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বাংলাদেশ রেসিডেন্ট মিশনের অর্থনীতিবিদ বরুণ কুমার দে জানান, ‘টিউশনি করে ফিরে আসতে সে রাতে আমার বেশ দেরি হয়ে গেল। দরজা দিয়ে ঢুকতে পারছিলাম না। ভেতরে কতজন দর্শক অনুমান করা যাচ্ছিল না। বেশি ভিড় হওয়ার কারণ পুরো হলে রঙিন টিভি শুধু একটাই ছিল। যদিও ইস্ট, ওয়েস্ট, সাউথ এবং নর্থ হাউজে সাদাকালো টিভি ছিল কিন্তু সিংহভাগেরই টার্গেট থাকতো শুকতারা নাটকের আগে রুমের চাবি রেখে হলেও জায়গা একটা চাই। আমি ফিরে গেলাম নর্থ হাউজে। নিচে ক্যান্টিনে খেয়ে দোতলায় টিভি রুমে গিয়ে বসলাম। নাটক শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট হয়তো গড়িয়েছে। হঠাৎ এক দপ্তরী চাচা লুঙ্গি কাছা মারা অবস্থায় এসে বললেন, বাবুরা! অ্যাসেম্বলি হলের ছাদ ধইসা পড়ছে। তাড়াতাড়ি আহেন আমনেরা।’
গিয়ে দেখি লাল রক্তে স্নান করলে যেমন লাগে সেরকম লাগছিল ছাত্র তথা দর্শকদের। অনেকে বাঁচাও বাঁচাও বলে আর্তনাদ করছিল। আমার মাথা ঘোরা শুরু হয়। রুমের চারতলায় বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ি। শরীর কাঁপছিল। নিজেকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। এ আমি কী দেখলাম! ১০-১৫ মিনিট শুয়ে থাকার পর একটু স্বাভাবিক বোধ করলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম সবকিছু। রক্ত দেওয়ার জন্য অনেকেই ছুটে যাচ্ছিল টিএসসিতে। জগন্নাথ হলের শহিদ মিনারের সামনে লাশগুলো রাখা হয়েছে। ওই রাতে হারাই আমার ক্লাসমেট দিনাজপুরের রুক্সিনি বর্মণকে। ফার্স্ট ইয়ারে কেবল দুমাস ক্লাস করেছি। তখন তো আর মোবাইলের যুগ ছিল না। আমার বাড়িতে পড়ে গেছে কান্নার রোল। বাড়িতে ফিরে যাওয়াটা জরুরি। হলের রুমের দরজায় লিখে রাখলাম কেউ যদি খুঁজতে আসে তার জন্য, ‘এই রুমের আমরা সবাই ভালো আছি’। সকালের তিস্তা এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনে চেপে রংপুরে বাড়ি ফিরে এলাম ঘটনাটি ঘটার ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর। আমাকে দেখে আমার মা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আমি বেঁচে আছি।
বাংলা একাডেমিতে কাজ করতে এসে গোডাউন ভবনের তিনতলায় একদিন গেলাম। কেন যেন একদিন মনে হলো জগন্নাথ ট্র্যাজেডির খবর বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো কেমন কাভারেজ করেছিল দেখার।
বাংলা একাডেমি প্রেসের জুনিয়র লাইনো অপারেটর এখন যিনি অবসরে এবং ৭১ বছরে উপনীত সেই সহকর্মী গোলাম নবীর সঙ্গে একদিন একান্ত আলাপনে বললেন, ‘অফিসের পাশের পরমাণু শক্তি কমিশনের ড্রাইভার রব ভাই আর আমি জগন্নাথ হলে গিয়েছিলাম শুকতারা নাটক দেখতে। নাটকটি শুরু হওয়ার সময়ও বৃষ্টি হচ্ছিল বাইরে। হঠাৎ আচমকা কী ঘটে গেল কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। বিমের নিচে আটকে পড়লাম। রব ভাইও মারাত্মক আহত। তার মাথা বেয়ে রক্ত পড়ছিল। আমি বললাম, আপনি চলে যান। এই বিম না সরলে আমি কোনোক্রমেই বের হতে পারব না। পরে নারায়ণগঞ্জের দুজন ছেলে আমাকে উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সেখানে জায়গা না পেয়ে পিজি এবং সেখানেও ভর্তি হতে না পেয়ে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে আসে। নারায়ণগঞ্জের ওই ছেলে দুটোকে আমি অনেক খুঁজেছি তাদের আর পাইনি। আমার পকেটের সব টাকা কারা যেন বের করে নিয়েছিল বিমে আটকাবস্থায়। শ্বশুর বাড়ির দেওয়া ঘড়িটি শুধু পেয়েছি। পরে পঙ্গুতে ভর্তি হই। আমার চিকিৎসার সব খরচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বহন করে। ১৫ অক্টোবর আহত হলেও অফিসের কাজে যোগ দেই ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে।’
জগন্নাথ হলের অ্যাসেম্বলি হাউজ ভবনের অডিটোরিয়ামটি তখন ব্যবহৃত হতো টিভি রুম হিসেবে। চুন-সুরকিতে নির্মিত ভবনটি আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও শোনা যায় জনপ্রিয় ধারাবাহিক শুকতারা দেখতে সেদিনও সেখানে জড়ো হয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। কারণ সাদা-কালো টিভির সময়ে হলের একমাত্র রঙিন টেলিভিশনটি ছিল বাড়তি আকর্ষণ।
মুহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়া ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে রাতেই উদ্ধার করা হয় ৩৫টি মরদেহ। সব মিলিয়ে প্রাণ হারান ৪০ জন, আহত হন তিন শতাধিক মানুষ।
তখন আমি ছিলাম পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। বাংলা একাডেমির আরেক অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী উপপরিচালক সৈয়দ মাহবুব হাসান জানান, ‘আমরা আজিমপুর ইডেন কলেজের ঠিক বিপরীতে পুরাতন সরকারি কোয়ার্টারে থাকতাম। ঘটনা ঘটার পর এত এম্বুলেন্সের শব্দ স্বাধীন বাংলাদেশে কখনো কানে আসেনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা ছাড়াও সাধারণ মানুষ রক্ত দেয়ার জন্য যেভাবে এগিয়ে এসেছিল এমনও শুনতে পেয়েছি আমারটা নেন আমি দেব আগে।’
৪১ বছর পর এসে মনে হয় বাংলাদেশটাকে বড় ভালোবাসে অনেকেই। এদেশ তো আমাদের সেই প্রিয় দেশ একজনের জন্য আপনজনের পাশে দাঁড়াতে আমরাই শিখে গেছি।
জগন্নাথ হলের সামনে দিয়ে যখনই যাই তখন মনে পড়ে কিশোর কুমারের সেই গানটি-
‘এইতো জীবন হিংসা, বিবাদ, লোভ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ
চিতাতেই সব শেষ হায় চিতাতেই সব শেষ।’
লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক, সহপরিচালক, বাংলা একাডেমি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র, পায়রাবন্দ, মিঠাপুকুর, রংপুর





