মানুষের উপকারে ছুটে চলেন আলাউদ্দিন

দুই সহযোগীকে নিয়ে রাস্তার পাশে নালা করে দিয়েছেন আলাউদ্দিন
সূর্য ওঠার আগেই হাতে দা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। গ্রামের সরু পথের দুই পাশের ঝোপঝাড় ও আগাছা পরিষ্কার করেন, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন। মানুষের উপকারের তাগিদ থেকেই নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছেন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পূর্ব গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের কালামাটি গ্রামের মোহাম্মদ আলাউদ্দিন (৪৬)। তিনি ওই গ্রামের ইশাদ আলীর ৯ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জীবিকার জন্য কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন রাস্তা, স্কুলমুখী পথ ও সড়কের পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
২০২৩ সালে কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে জুড়ী উপজেলার কালামাটি এলাকার ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটি রাস্তা পরিষ্কারের মধ্য দিয়ে আলাউদ্দিনের এ উদ্যোগের শুরু। এরপর তাদের কাজ করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তাকে উৎসাহ দেন। তার কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক তরুণ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন। স্ত্রী, তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে আলাউদ্দিনের সংসার। কৃষিকাজের পাশাপাশি অটোরিকশা চালান তিনি। এ ছাড়া তার মাছ ও মুরগির খামার রয়েছে।
জুড়ীর লাঠিটিলা এলাকার বাসিন্দা খোর্শেদ আলম বললেন, ‘আমাদের এলাকায় অনেক পর্যটক আসেন। সড়কের পাশের মাইলফলকটি ঝোপঝাড় ও ময়লায় ঢেকে থাকায় অনেকে জায়গাটি চিনতে পারতেন না। আলাউদ্দিন ভাই নিজ উদ্যোগে সেটি পরিষ্কার করেছেন। এখন সহজেই জায়গাটি শনাক্ত করা যায়। বড়লেখার হাতলিয়া এলাকার সারজান আহমদ বলেছেন, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া মানুষের সুবিধার জন্য এমন কাজ করা সত্যিই বিরল। তার উদ্যোগ অন্যদেরও ভালো কাজে উৎসাহিত করবে।
রাস্তা পরিষ্কারের পাশাপাশি রাস্তার পাশের নষ্ট নলকূপ মেরামত, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, চিকিৎসা সহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতেও সহযোগিতা করেন আলাউদ্দিন। প্রয়োজনে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকার ও প্রবাসে থাকা দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকেও সহায়তা সংগ্রহ করেন।
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন এ পর্যন্ত ৯ জনকে দোকান করে দিয়েছেন। শারীরিক সমস্যায় নিয়মিত কাজ করতে না পারা বিজন বললেন, ‘আমার পায়ে সমস্যা থাকায় নিয়মিত কাজ করতে পারি না। আলাউদ্দিন ভাই আমাকে একটি টং দোকান করে দিয়েছেন। এখন এটি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি।’
জুড়ীর কছুরগুল এলাকার কাদির আহমদ বললেন, ‘অসুস্থতার সময় ওষুধ কেনার সামর্থ্য ছিল না। আলাউদ্দিন ভাই আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়েও খোঁজ নিয়েছেন।’ আলাউদ্দিন নিজের টাকায় এবং প্রবাসীদের আর্থিক সহায়তায় ঘর মেরামতের সুযোগ পেয়েছেন একই এলাকার আব্দুল খলিল।
আলাউদ্দিন বললেন, ‘একটি ভালো কাজ করার পর যে আনন্দ পাই, তা কোনো সম্পদের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। মানুষের মুখের হাসিই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই।’
পূর্ব জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুয়েল উদ্দিন বলেছেন, আলাউদ্দিন খুব ভালো মনের একজন মানুষ। তিনি নিঃস্বার্থভাবে জনকল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। তার মতো মানবিক মানুষ বর্তমান সময়ে খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমার যতটুকু সম্ভব, তাকে সহযোগিতা করে যাব।’
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বড়লেখা উপজেলা শাখার সভাপতি তাহমীদ ইশাদ রিপন বলেছেন, সড়কের পাশের ঝোপঝাড় চালক ও পথচারীদের দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আলাউদ্দিন এসব পরিষ্কার করে নিরাপদ চলাচলের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন।



