বড় হচ্ছে ঢাকা
সংস্কৃতিচর্চা আটকে আছে সেগুনবাগিচায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পাঁচ দশক আগের তুলনায় রাজধানী ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি সংস্কৃতিচর্চার জায়গা। উল্টো কমেছে। নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের ভাষায়, ‘আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিনোদনের জায়গাগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এখন খাবারই যেন নগরবাসীর প্রধান বিনোদন। চারদিকে শুধু রেস্তোরাঁ আর খাবারের দোকান।’ একসময় বেইলি রোড খ্যাতি পেয়েছিল ঢাকার ‘নাটকপাড়া’ হিসেবে। নাট্যদলগুলোর কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত পুরো এলাকা। ২০০৫ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা আনুষ্ঠানিকভাবে সড়কটির নাম দেন ‘নাটক সরণি’। সেই নাটক সরণিতেও এখন আর আগের নাট্যচর্চার জৌলুশ নেই। স্থপতি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝর আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘একটি শহর যখন বড় হয়, তখন শুধু এর আয়তন বা জনসংখ্যা বাড়লেই চলে না; নগরের সঠিক বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চার কথাও চিন্তা করতে হয়। যাদের এসব নিয়ে চিন্তা করার কথা, তারা ভাবেন না। আমাদের এখানে অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সদিচ্ছা এবং জনগণের প্রতি পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব থাকায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগর সংস্কৃতি গড়ে উঠছে না।’
১৯৯১ সালে ঢাকায় ৬৪ লাখ মানুষের জন্য নাটক দেখার স্থান ছিল দুটি। এখন জনসংখ্যা দ্বিগুণ বাড়লেও নিয়মিত নাটক দেখার জায়গা বলতে কার্যত জাতীয় নাট্যশালাই ভরসা। ঢাকা সিটি করপোরেশন ২০১১ সালে বিভক্ত হওয়ার পর মোট আয়তন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, ঢাকার জনসংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি। শিল্পকলা একাডেমি ও বেইলি রোডের মহিলা সমিতি— দুটিই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় নিয়মিত নাটক হবে, এমন কোনো মঞ্চই নেই। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় আলাদা এক শহর হয়ে উঠেছে উত্তরায়। অসংখ্য মানুষের বসতি, বিপণিবিতান, রেস্তোরাঁ— সবই আছে। নেই শুধু সিনেমা হল কিংবা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
শহরের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের জন্য কতগুলো নাট্যমঞ্চ প্রয়োজন, কোথায় হবে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, কোথায় থাকবে গণপাঠাগার কিংবা সিনেমা হল— এসব প্রশ্ন যেন নগর পরিকল্পনার বাইরে
উত্তরায় বসবাসরত বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকার অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘উত্তরায় এখন এত মানুষ থাকেন, অথচ এখানে কোনো নাট্যমঞ্চ নেই। গণপাঠাগার নেই। একটি উন্মুক্ত মঞ্চ কয়েক বছর আগে করা হয়েছে, সেটি জনবহুল উত্তরার জন্য যথেষ্ট নয়।’ ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, বসিলা, কেরানীগঞ্জ, শনির আখড়া, আমিনবাজার— সবখানেই উঁচু দালান উঠছে। বিপণিবিতান ও রেস্তোরাঁয় ভরে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। কিন্তু নগরবাসীর সাংস্কৃতিক বিনোদনের জন্য গড়ে উঠছে না প্রয়োজনীয় কোনো স্থান। ফলে একদিকে মানুষ বাড়ছে, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক আয়োজনের জায়গা কমছে। গড়ে ঢাকাবাসীর প্রত্যেকের সাংস্কৃতিক বিনোদনের সুযোগ তাই আরও সংকুচিত হচ্ছে। তিন দশক আগে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা হওয়ার পর বদলে গেছে কুড়িল-বাড্ডার দৃশ্যপট। ভাটারার পাশ দিয়ে ১০০ ফিট সড়ক রূপ নিয়েছে বিনোদনকেন্দ্রে। পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কও অনেকের কাছে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেখানেও নেই কোনো সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। রামপুরা থেকে বাড্ডা পেরিয়ে খিলক্ষেত পর্যন্ত যমুনা ফিউচার পার্কের ব্লকবাস্টার মুভিজ ছাড়া কোনো সিনেমা হল নেই। গুলশানে একটি সিনেমা হল ছিল, সেটিও বন্ধ হয়েছে বহু বছর আগে। ঢাকার পূর্বাংশে যাত্রাবাড়ী থেকে ডেমরা পর্যন্ত শহর প্রসারিত হচ্ছে। নতুন নতুন বাড়ি উঠছে। কিন্তু সেখানেও কোনো মঞ্চ হয়নি। সিনেমা হল যতগুলো ছিল, সেগুলোরও বেশ কয়েকটি এখন বন্ধ। পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের দিকেও ছড়াচ্ছে শহর। গুলিস্তানে ঘটা করে নির্মাণ করা হয়েছিল মহানগর নাট্যমঞ্চ। কিন্তু সেখানে নাটক মঞ্চায়নের পরিবেশ না থাকায় সেটিও আদতে বন্ধই রয়েছে। তবে এটি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে সম্প্রতি ‘ঢাকা নাট্যোৎসব’ও আয়োজন করেছে ডিএসসিসি। পশ্চিম দিকে ধানমন্ডি পেরিয়ে মোহাম্মদপুর ছাড়িয়ে বসিলা কেরানীগঞ্জে গিয়ে ঠেকেছে ঢাকা শহর। শ্যামলী থেকে মোহাম্মদপুর রিং রোডের পশ্চিম ও উত্তর পাশে গত দুই দশকে বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে বসতি। হয়েছে নিত্যনতুন বিপণিবিতান। কিন্তু ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর এলাকা জুড়ে খুঁজলে একটি সিনেমা হলই শুধু পাওয়া যায়। রায়েরবাজারের সেই মুক্তি সিনেমা হলটিও ধুঁকছে। শ্যামলী সিনেমা হলটি সিনেপ্লেক্সে রূপ নিয়েছে। শংকরে রয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন। পুরো ঢাকা শহরে বেসরকারি উদ্যোগে কিছু শিল্প গ্যালারি, স্টুডিও থিয়েটার থাকলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুবই হতাশাজনক বলে মনে করছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। জনবহুল মিরপুর এলাকায় কালশী, মাটিকাটাতেও বাড়ছে জনবসতি, নেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। একসময় ছয়টি সিনেমা হল থাকলেও সব এখন চালু নেই। তবে বেসরকারি উদ্যোগে স্টার সিনেপ্লেক্সের একটি শাখা করা হয়েছে। নাটক কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের একটি জায়গা ছিল মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের টাউন হল। সেটিও এখন নেই। টাউন হলের জায়গাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ময়লার গাড়ি রাখার জায়গা বানিয়েছে। সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, ২৩ বছর ধরে এখানে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হলেও, তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকারই। বরং জুলাই অভ্যুত্থানের পর দ্রুত একটি মসজিদ নির্মাণ করে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ওই জায়গায় ‘অপু আমান নাট্য আসর’ আয়োজন করেছিল অপেরা নাট্যদল। দলটির সাধারণ সম্পাদক নাহিদ স্মৃতি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা ডিসেম্বরে এখানে অনুষ্ঠান করলাম। এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে দেখি মুক্তমঞ্চ ভেঙে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে এবং খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করা হয়। পাশেই তো একটি মসজিদ রয়েছে।’ শহরে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র না থাকায় কিশোর গ্যাংসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে— মনে করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ জামিল আহমেদ। তিনি বললেন, ‘মিরপুরে এত মানুষ থাকেন কিন্তু নিঃশ্বাস নেওয়া কিংবা মুক্তচিন্তা করার মতো কোনো পরিসর নেই। কিশোরদের মধ্যে যে নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে, তার একটি কারণ হতে পারে সৃজনশীল সংস্কৃতিচর্চার সুযোগের অভাব।’ ঢাকা শহর যেমন আয়তনে বাড়ছে, তেমনি বড় বড় পরিকল্পনায় ফ্লাইওভার, দ্বিতল সড়ক, মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ শহরের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের জন্য কতগুলো নাট্যমঞ্চ প্রয়োজন, কোথায় হবে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, কোথায় থাকবে গণপাঠাগার কিংবা সিনেমা হল— এসব প্রশ্ন যেন নগর পরিকল্পনার বাইরে। শহর তাই বড় হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার সঙ্গে বড় হচ্ছে না নাগরিকের সাংস্কৃতিক জীবন।



