অনুবাদের দিগ্দর্শন
এক নিরাময়ী চিকিৎসাপত্র

বইটি প্রকাশ করেছে উজান প্রকাশন
বাংলাদেশের সাহিত্যের এখন মৃতদশা; বই প্রকাশ হয়, বছর বছর হাজার হাজার, কিন্তু তাতে যেহেতু পাঠকের মন নেই— সেহেতু সেই সাহিত্যকে জীবিত বলা যায় না। কিন্তু প্রকাশকদের তো বই বের করতে হবে, এর সঙ্গে তাদের রুটিরুজি জড়িত আর লেখকদেরও লিখতে হবে, যেহেতু তাকে কিছু একটা কামড়ায় আর দু-চার পয়সাও হয়তো পাওয়া যায়; কিছু যখন আর করার নেই— গল্প-উপন্যাস-কবিতায় পাঠকের মন নেই, তখন সৃষ্টির দায় মাথায় নিয়ে বাংলাদেশর কতিপয় লেখকনামক শ্রমিক অনুবাদ-রচনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। প্রকাশকরাও অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বেশিরভাগ নতুন প্রকাশকদের প্রকাশনী সংস্থায় বা বই বিক্রয়কেন্দ্রে উঁকি দিলে দেখা যাবে সেখানে সয়লাব হয়ে আছে আনুবাদ গ্রন্থে। সেসব অনুবাদগ্রন্থগুলো কী বিষয়ে? বেশিরভাগই আত্মোন্নয়নমূলক। থ্রিলার অথবা জনপ্রিয়-সাহিত্যের অনুবাদ। কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কোনোরকমে বাংলায় ভাষান্তর করা। বাক্যগঠন ঠিক নেই, কোনোরকম সম্পাদনা নেই এবং অনেক ক্ষেত্রে অনুবাদের যথার্থ অর্থও ঠিক নেই। সেটা কতদূর পর্যন্ত স্বেচ্ছাচারিতার পর্যায়ে যায় তার উদাহরণ রাজু আলাউদ্দিন তার বইতে দেখিয়েছেন। জুলফিকার নিউটন নামের এক অনুবাদক এমনকি অন্যের অনুবাদও নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। ইংরেজি থেকে বাংলায় নয়, তিনি অনুবাদ করেছেন বাংলা থেকে বাংলায়। এমনও আজকাল প্রায়ই দেখা যায়, কোনো বিখ্যাত গ্রন্থ বাংলায় একবার অনূদিত হওয়ার পর আরও দু-চারজন সেটা অনুবাদ করতে শুরু করেন। কিন্তু তারা কারণ দেখান না ওই বইয়ের আগে একটা অনুবাদ বাজারে থাকা সত্ত্বেও তারা কেন সেটা করেন। আগেরটা ভালো ছিল না বলে, নাকি আগেরটার ছায়ায় নিজেরটা করতে সহজ বলে! আলীম আজিজ অনুবাদ করেছেন কার্লোস ফুয়েন্তেসের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আউরা’। যেটা আগেই অনুবাদ করেছিলেন বিখ্যাত অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। আলীম তাও কেন সেটা অনুবাদ করতে গেলেন তার কারণ দেখাননি। এবং রাজু আলাউদ্দিন ইংরেজি টেক্সট পাশাপাশি রেখে দেখাচ্ছেন আলীম আজিজ কোন কোন জায়গায় অনুবাদের বিপর্যয় ঘটিয়েছেন। অনেক জায়গায় তিনি এমন অংশও জুড়ে দিয়েছেন মূল টেক্সটে যেটা নেই। এ প্রসঙ্গে রাজু আলাউদ্দিন লিখেছেন, মানবেন্দ্রের চেয়ে ভালো করা দূরে থাক, তার চেয়ে কতটা খারাপ করা যায়, যেন তারই এক প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ সাফল্য নিয়ে এগিয়ে আছেন আলীম আজিজ। বাংলাদেশের বর্তমান অনুবাদ-সাহিত্যের এ নানামুখী প্রবণতা-স্বেচ্ছাচারিতা ও বিপর্যয় নিয়ে রাজু আলাউদ্দিনের সাম্প্রতিক প্রবন্ধগ্রন্থ— অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা। গত বইমেলায় বইটি প্রকাশ করেছে ‘উজান’ প্রকাশন। দুই পর্বে বিভক্ত বইটিতে প্রবন্ধ আছে ২০টি। দুটি আছে অনুবাদবিষয়ক কবিতা। প্রথম পর্বে সংকলিত হয়েছে অনুবাদ-সাহিত্যের নানা দিক। যেমন— অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন, তা তুলে ধরেছেন প্রথম প্রবন্ধে। লেখক লিখেছেন, এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তোলা অনিবার্য হয়ে ওঠে— অনুবাদ আসলে কী এবং ভালো বা আদর্শ অনুবাদ বলতে কী বুঝি? কিংবা আরও গভীরে গিয়ে এই প্রশ্নও তো তোলা সম্ভব যে অনুবাদ আদৌ সম্ভব কি না? ‘বিশ্বস্ততা’ এবং ‘আদর্শে’র প্রশ্নে আমরা এই মুহূর্তে না গিয়ে প্রথমে এ মৌলিক প্রশ্নের ফয়সালা করা জরুরি বলে মনে করি। ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাঁ লুক গদারের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক বলেছেন, ‘সবকিছুই হচ্ছে অন্য কিছুর অনুবাদ।’ লেখক এ কথাও বলতে ভোলেননি, বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে আন্তঃসংযোগ ঘটেছে মূলত অনুবাদের মাধ্যমেই। সম্রাট শাহজাহানের বড় ছেলে দারাশুকো ফারসি ভাষায় উপনিষদ অনুবাদ করেছিলেন বলেই ফারসি থেকে তা ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করতে পেরেছিলেন এক প্রাচ্যবিদ ফরাসি পরিব্রাজক আঁকেতিল দ্যু পেরঁ। আঁকেতিল অনূদিত সেই উপনিষদের একটি কপি পৌঁছেছিল জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের হাতে। তার বাকি জীবন কেটেছিল এই ভারতীয় আত্মার উষ্ণতায়। রাজু আলাউদ্দিন আমাদের এও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, আমাদের ভাষায়ও দীর্ঘদিন থেকে বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ হয়ে আসছে। ফারসি, ফরাসি, ইংরেজি এবং স্প্যানিশ থেকেও অনুবাদ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে মূলত ইংরেজি অনুবাদই থেকেছে প্রধান নির্ভর। ইদানীং অনুবাদ প্রায় জোয়ারের রূপ ধারণ করেছে; কিন্তু আমাদের সৃষ্টিশীল লেখক সাহিত্য-সমালোচকরা এসব অনুবাদের গুরুত্ব বা গুরুত্বহীনতা সম্পর্কে মোটামুটি নির্বাক। অনুবাদ কোনো সৃজনশীল সাহিত্যধারা নয়। অতএব তা গুরুত্বহীন— এ আদিম ধারণায় বন্দি থাকার ফলে বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদের প্রতি তারা অবহেলা পোষণ করেন। বিদেশি সাহিত্যের যাও কিছু বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে, কিন্তু বাংলা-সাহিত্যের অনুবাদের কী অবস্থা? সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় কয়টা অনুবাদ হয়েছে, হচ্ছে, হয়? দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘বাংলা সাহিত্যের অনুবাদের দীনতার কারণ’-এ লেখক তার কিছু দিকে আমাদের দৃষ্টি কেড়েছেন। লেখক বলছেন, ‘আবু ইসহাক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, সৈয়দ হক, মাহমুদুল হক— এরা উপন্যাস ও গল্পে ঘটনার বুনন এবং বয়ানে যে-সীমাতিক্রমী শৈল্পিক বিভাব আর অনুভূতির সর্বজনীনতাকে স্পন্দিত করেছেন, তা যেকোনো ভাষায় এবং দূরবর্তী যেকোনো বিশ্বনাগরিকের হৃদয়কে স্পর্শ করবে; কিন্তু ভাষিক বাধার কারণে এই স্পন্দন অন্যপ্রান্তের কর্ণকুহরে গিয়ে প্রবেশ করছে না। বাংলা সাহিত্যের, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাহিত্যের এটা একটা বড় দুর্বলতা হয়ে রইল, অনুবাদের অভাবে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ বাংলা সাহিত্যের রসাহরণ থেকে বঞ্চিত। লাতিন-সাহিত্য অনুবাদের কারণেই আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। লেখক প্রশ্ন তুলেছেন— আমাদের এমন একজন অধ্যাপক ও লেখক কি আছেন, যিনি সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ বা বক্তৃতার মাধ্যমে বিদেশি লেখক, পাঠক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা প্রকাশনার কর্ণধারদের আকৃষ্ট করতে পারেন? প্রথম পর্বের প্রবন্ধগুলোতে রাজু আলাউদ্দিন আরও আলোচনা করেছেন অনুবাদকদের সৃজনশীলতা ও ভাষার নতুন বিন্যাস, অনুবাদ প্রসঙ্গে ভালতেয়ার— বহুদিন উপেক্ষায়, বহুদিনের অন্ধকারে, বাংলা, স্প্যানিশ ও বোর্হেসের অনুবাদ, আমাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বিলম্বিত কাফকা এবং রূপান্তর, পেদ্রো পারামো— আনিসুজ্জামানের ‘অনুবাদ’, কিংবা পুষ্পবনে মত্ত হাতি, পালোমিনোর খুন ও অনুবাদকদের জালিয়াতি, খারাপ অনুবাদের ভালো দিক, ভাষার প্রতিভা ও সৃষ্টির ডালপালা, ‘বিমাতার গুণগান’-এর অসৎ অনুবাদ ইত্যাদি প্রসঙ্গে। দ্বিতীয় পর্বে তিনি আলোচনা করেছেন, নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নি— এক ‘বিশ্বাসঘাতক’ পরম বন্ধু, উইলিয়াম রদিচে— বাঙালির এক বিশ্ববান্ধবের প্রয়াণ, মান্নান সৈয়দের অনুবাদ আপন আয়নায় পূর্ণাঙ্গ অবয়ব, অনুবাদের সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত— খলিকুজ্জামান ইলিয়াস, পুষ্কর দাশগুপ্ত— নিঃসঙ্গ নাবিবের প্রস্থান, আফসানা বেগমের ফকনার ও তর্জমার তাৎপর্য ইত্যাদি নিয়ে। এ পর্বের লেখাগুলো মূলত তার প্রিয় অনুবাদকদের প্রতি এক প্রকার শ্রদ্ধানিবেদন। সব মিলিয়ে ‘অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা’ গ্রন্থে রাজু আলাউদ্দিন এমন কিছু আলাপ-বয়ান ও বক্তব্য হাজির করেছেন, যা বাংলাদেশের অনুবাদ-সাহিত্যের নানা দিগ্দর্শন উপস্থাপন করে। আমাদের অনুবাদ সাহিত্যে যে অরাজকতা চলছে তার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ এ অসামান্য বইটি। এ বইটি অনুবাদ সাহিত্যকে আরও গভীরভাবে বুঝতে ও ভাবতে আমাদের সাহায্য করবে। বাংলাদেশে এ ধরনের বই আরও দরকার এবং এ ধরনের বই নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও দরকার। দুর্ভাগ্যবশত এ ধরনের আলোচক আমাদের খুব বেশি নেই। থাকলে আমাদের অনুবাদ-সাহিত্য এতটা নৈরাজ্যকর অবস্থায় পৌঁছাত না। যারা অনুবাদ করেন, অনুবাদ পড়েন তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য বলেই আমি মনে করি। অনুবাদের মহামারীর যুগে এটি এক নিরাময়ী চিকিৎসাপত্র।



