ঝরা পাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাতিয়া
মনে আছে, গতবার বলেছিলেন লন্ডনের চেয়ে আপনার দেশের গুলুতেই খাবারের স্বাদ লাগতো বেশি। অথচ লন্ডনের সুপারমার্কেটে হাজারটা জিনিসের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগের তুলনায় গুলুতে বাছাবাছি করার মতো অত বিকল্পই ছিল না। মনে হচ্ছে, আজ আপনাকে বাছাবাছির ঝামেলা থেকে বাঁচিয়েই দিলাম।
ওকেলো
ধন্যবাদ! জানো, মাঝে মাঝে লন্ডনের রান্নাঘরটার কথা মনে পড়লে আমি যেন দার্শনিক হয়ে যাই! প্রতিটা ক্যাবিনেট জিনিসে ঠাসা। ক্যানড খাবার, শুকনো খাবার, চাল-ডাল, সিরিয়াল, স্ন্যাকস, বিস্কুট—কী নেই সেখানে! আবার একেকটা জিনিস এক রকমও নয়—পাঁচ পাঁচটা করে ব্র্যান্ড! যদি পাঁচবার মত বদলাই! ফ্রিজ এত ভর্তি থাকতো যে আরেকটা কিনতে হয়েছে। তারপরও কোনো কোনো রাতে আমরা পিৎজা বা চাইনিজ খাবার অর্ডার করি। কারণ এত খাবার থাকার পরও কীভাবে যেন মনে হয় —‘ ঘরে খাওয়ার মতো তেমন কিছুই নেই।’
কাতিয়া
বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা তো ভালো, তাই না? কোনো সুযোগই না থাকার চেয়ে অন্তত ভালো। সোভিয়েত ইউনিয়নের কী হয়েছিল, সেটাই দেখুন। আপনার কি সত্যিই মনে হয়, কোনো কিছু বেছে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় মানুষ তখন সুখী ছিল?
ওকেলো
আজ আমি যে কথাটা বোঝাতে চাইছিলাম, তুমি কিন্তু সেটাই প্রমাণ করে দিলে। কিছু বিষয় আমরা খুব বেশি দ্বিমাত্রিকভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদ, পূর্ব বনাম পশ্চিম, স্বাধীনতা বনাম নিপীড়ন—তালিকা আরও অনেক লম্বা করা যায়।
তুমি যে-ই বুঝলে আমি এই অন্তহীন পছন্দের সুযোগে আসলে বিরক্ত, অমনি তোমার মাথায় চলে এল বিপরীত মেরুর সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা—যেখানে পছন্দের সুযোগ প্রায় ছিলই না।
আমি
ভাইয়েরা, আমরা কিন্তু আসল ইস্যু থেকে দূরে সরে যাচ্ছি! পুঁজিবাদ আর ফিয়াট মুদ্রা—মানে এমন টাকা, যার পেছনে নিজস্ব মূল্য আছে এমন কোনো কিছুর সমর্থন নেই, তাই তো? এই দুটো কীভাবে আমাদের অনিবার্যভাবে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়?
ওকেলো
আমি কিন্তু তিনটার কথা বলেছিলাম। তোমার মনে নেই হয়তো। প্রথমটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো চিন্তার কেন্দ্রীকরণ, যেখান থেকে আজকের জাতিরাষ্ট্রগুলো গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে আমরা আগেই কথা বলেছি, তাই এখন আর না বলি।
আর পুঁজির ধ্রুপদী সংজ্ঞা হলো— পুঁজি উৎপাদনের উৎপাদিত উপকরণ…।
কাতিয়া
দাঁড়ান, দাঁড়ান! আপনি কিন্তু কেমব্রিজে লেকচার দিচ্ছেন না। আরেকটু সহজ করে বলা যায় না?
ওকেলো
সহজ করে বললে, পুঁজি হলো এমন কিছু যা দিয়ে অন্য কিছু তৈরি করা যায়। তুমি সেটা ব্যবহার করে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করো, মুনাফা করো, আর সেই লাভ আবার নতুন পুঁজিতে পরিণত হয়। তারপর আবার একই চক্র শুরু হয়। এভাবেই চলতে থাকে।
ধরো, তোমার ১০০ ডলার পুঁজির একটা কোম্পানি আছে। তোমার লক্ষ্য হলো প্রতি বছর ১০ শতাংশ লাভ করা। প্রথম বছরে তুমি ১০ ডলার লাভ করলে। তখন তোমার পুঁজি হলো ১১০ ডলার। পরের বছরও ১০ শতাংশ লাভ করতে হলে তোমাকে কিন্তু ১০ না, ১১ ডলার আয় করতে হবে। বছর বছর এভাবেই বাড়তে থাকবে অঙ্কটা।
তোমার কোম্পানির মতো সারা দুনিয়ার প্রত্যেকটা কোম্পানিই প্রতি বছর ওই বাড়তি আয়টা করতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বাড়তি লাভটা আসবে কোথা থেকে? কাউকে না কাউকে তো সেজন্য বাড়তি পণ্য বা সেবা কিনতে হবে, তাই না?
কোম্পানিগুলোর পণ্য বা সেবার বিক্রি বাড়ানোর কয়েকটা উপায় আছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছে। ফলে ক্রমেই আরও বেশি মানুষ আরও বেশি জিনিস কিনবে। অথবা মাথাপিছু আরও বেশি ভোগ করবে। আমার লন্ডনের বাসার রান্নাঘরের কথা বললে না কাতিয়া? কাবার্ডের তাকভর্তি নানান খাবার, দ্বিতীয় ফ্রিজও খাদ্যে ঠাসা। অর্থাৎ এত খাবার আছে যেগুলো খেয়ে শেষ করাই হবে না। কিছু নষ্টও হয়ে যাবে।
কিন্তু এই বাড়তি কেনাকাটারও তো একটা সীমা আছে। একসময় রান্নাঘরের জায়গা ফুরিয়ে যাবে—অথবা আমার পেটের শূন্যস্থান। তখন কী হবে?
আমি
এ পর্যন্ত তো বুঝলাম। বলে যান—মন দিয়ে শুনছি।
ওকেলো
মুনাফা বাড়ানো অব্যহত রাখার আরেকটা উপায় আছে। তা হলো জিনিসপত্র যাতে দ্রুত নষ্ট বা অচল হয়ে যায় সে ব্যবস্থা করা। যেমন ধরো, হিমালয়ের লবণ—হাজার হাজার বছর ধরে পাহাড়ে পড়ে আছে, একটুও নষ্ট হয়নি। অথচ লবণের কৌটা রান্নাঘরের তাকে উঠিয়ে রাখার তিন বছর না যেতেই তার মেয়াদ শেষ!
আমি
কোনো পণ্য নষ্ট হওয়ার জন্য তো যুদ্ধের দরকার নেই। তাহলে যুদ্ধের সঙ্গে এর সম্পর্কটা কোথায়?
ওকেলো
ভাবো। একটু মাথা খাটাও। ইঙ্গিত তো দিলামই—‘নষ্ট হয়ে যাওয়া’।
আমি
বুঝেছি। পণ্যকে অচল করে দিয়ে নতুন চাহিদা তৈরি করা হয় । যেমন, আমার ফোনটা। একটা সফটওয়্যার আপডেট করলে হার্ডওয়্যার আর সেভাবে কাজ করে না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে নতুন ফোন কেনার কথা ভাবতে হয়।
মিকিতা
সেটাকেও তো একরকম আগেভাগে মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া বলা যায়, তাই না?
ওকেলো
ধরো, ঘরবাড়ির মতো কোনো সম্পত্তি নষ্ট হয়ে গেল। সেটাও তো এক ধরনের ‘মেয়াদ শেষ’ হওয়া—শুধু একটু দ্রুতগতিতে আর কী! তখন তা আবার কিনতে বা বানাতে হয়।
বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় আড়াই শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় হয়। তার মানে সামরিক পণ্য ও সেবার জন্য ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের চাহিদার বিষয়। ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, নজরদারি ব্যবস্থা—এসব তৈরি আর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। সময়মতো আধুনিকায়নও করা লাগে।
কিন্তু এ তো কেবল শুরু। এবার ধ্বংসের কারণে তৈরি হওয়া চাহিদাটাও যোগ করো। কেউ ৫০ ডলারের একটা সাইকেল গুড়িয়ে দিতে ১০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে না। লক্ষ্য থাকে বড় বড় ও মূল্যবান স্থাপনা—বিদ্যুৎব্যবস্থা, বন্দর, সেতু, টেলিকম টাওয়ার এইসব। এগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে আবার কাউকে না কাউকে বানাতে হবে। তার মানে নতুন চাহিদা, নতুন উৎপাদন। চক্রটা ঘুরতেই থাকে।
যুদ্ধে একজন মানুষ মারা গেলে গড়ে আরও পাঁচ থেকে সাতজন আহত হয়। তাদের চিকিৎসা, ওষুধ, চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার জন্য তৈরি হয় নতুন চাহিদা।
গণমাধ্যমও বহু ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্প। যুদ্ধ তার সবচেয়ে লাভজনক গল্পগুলোর একটি—সেলিব্রিটিদের কেলেঙ্কারি, এমনকি প্রিয় রাজপরিবারের বিবাহবিচ্ছেদের কাহিনীর চেয়েও বেশি মনোযোগ টানে যুদ্ধের খবর।
মিকিতা মাথা নাড়ছে। ওর মনে হচ্ছে ব্যাপারটাকে এভাবে দেখাটা অতিরিক্ত সরলীকরণ। প্রতিরক্ষা বাজেট যে বিপুল, আর যুদ্ধ ও যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ যে নতুন পণ্য ও সেবার চাহিদা তৈরি করে—তা খুবই ঠিক। কিন্তু তার মনে হয় না, এটাই প্রমাণ করে যে পুঁজিবাদই যুদ্ধের কারণ।
মিকিতা বলতে চাইল, এই সম্পর্কটা ঘটনাচক্র মাত্র। কার্যকারণের বিষয় না।
ওকেলো অবশ্য একমত হলেন না তার সঙ্গে। পররাষ্ট্রনীতির ওপর বড় করপোরেশনগুলোর সরাসরি প্রভাব খাটানোর একের পর এক উদাহরণ তুলে ধরলেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনেকটাই ঠিক করে তেল কোম্পানিগুলো। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ফুলেফেঁপে ওঠে প্রতিরক্ষা ঠিকাদাররা। ওকেলো মনে করেন, এটা শুধু স্বার্থের সংঘাত না, এ এমন এক ব্যবস্থা যেখানে মুনাফা ও নীতি ‘দুজনে দুজনার’ হয়ে চলে।
(চলবে)
ঝরাপাতার সংসার
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬




