ঝরাপাতার সংসার

আমি: আপনি বলছেন, চিন্তার কেন্দ্রীকরণ যুদ্ধ ডেকে আনে। কিন্তু ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ এখনো তো জাতি-রাষ্ট্র। তারা তো আর একে অন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করছে না। অবশ্য বলকান আর ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে বলতে হবে কথাটা।
ওকেলো: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করা বন্ধ করল, যখন তারা বুঝতে পারল যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শই সবচেয়ে বড় বাধা। আজ সেই দেশগুলোরই অনেকে এক অতি-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় কাজ করে-ইউরোপীয় ইউনিয়ন নামে। এটি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিপরীতে অভিন্ন ইউরোপীয় পরিচিতিকে তুলে ধরে। কিছু সদস্য দেশে এমনকী স্কুলে আর জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয় না। এই নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্মের কোন দাপ্তরিক ভূমিকা নাই।
আমি: কিন্তু বাকি বিশ্বের কথা কী বলবেন? অন্যান্য অঞ্চলও কি জাতি-রাষ্ট্রের মডেল পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ বোধ করে? নাকি ভাষা ও ধর্মের প্রতি সংযোগটা এতই গভীরে প্রোথিত যে তা ছিন্ন করা যায় না?
ওকেলো: এটা খুব চোখে পড়ার মতো, তাই না? ইউরোপ যখন তার শতশত বছরের পুরনো জাতি রাষ্ট্রের আদর্শ ঝেড়ে ফেলে অতিরাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করছে বাকি বিশ্ব তখন যেন বিপরীত দিকেই হাঁটছে।
বৃহত্তর অর্থে ভারতের কথাই ধরো। বিউপনিবেশীকরণের যুগে এই অঞ্চলেই জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠার একটা প্রায় টেক্সটবুক উদাহরণ দেখা গেল। তা হয়েছিল ভারত ভেঙে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমে। তিনজন প্রভাবশালী মুসলিম নেতা ও চিন্তক দ্বিজাতিতত্ত্ব নামে এক তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিলো, ব্রিটিশ ভারতের মুসলমান ও হিন্দুরা দুটি আলাদা জাতি যাদের আছে পৃথক ধর্ম, সংষ্কৃতি ও পরিচয়। সুতরাং তাদের জন্য দুটি পৃথক মাতৃভূমি দরকার।
দ্বিজাতিতত্ত্বের বদৌলতে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রটিতে ভাষাগত বৈচিত্র উপেক্ষা করে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়া হয় একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। অথচ বড় জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর কেউই এ ভাষায় কথা বলতো না।
১৫ শতাংশ অমুসলিম অধিবাসী ভারতে চলে যাওয়ায় ইসলাম হয়ে উঠল চরম একচেটিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠের ঐক্যবদ্ধ পরিচয়। চাপা পড়ে গেল ধর্মীয় বহুত্ব। আর কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ বিভিন্ন জাতির প্রদেশ নিয়ে গড়া সারা পাকিস্তানের অধিবাসীদের কাছেই ভারতকে অভিন্ন শত্রুতে পরিণত করে।
ইংরেজ আর ফরাসি জাতীয় পরিচয় যেভাবে গড়ে উঠেছিল, এ যেন ঠিক তারই প্রতিচ্ছবি—এক ভাষা, এক ধর্ম, আর এক অভিন্ন শত্রু।
আমি: মজার ব্যাপার বলতে হবে। আর সেই ব্যবধানগুলোই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনটি যুদ্ধ বাঁধার জন্য দায়ী, তাই না?
ওকেলো: এ পর্যন্ত চারটা। আর সবকিছু যেভাবে চলছে তাতে আগামীতে আরও যুদ্ধ হতেই পারে।
মজাটা লক্ষ্য করেছো? জনগোষ্ঠীর বৈচিত্রের বিচারে ইতিহাসে ভারতের জুড়ি মেলা ভার। ছোটবড় মিলিয়ে হাজারের বেশি ভাষা, এক আকাশের নিচে সবগুলো প্রধান ধর্মের মানুষের বাস, প্রায় নদীর বাঁকে বাঁকেই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি এদেশে। হাজার হাজার বছর ধরে এই মানুষেরা একত্রে বাস করে এসেছে। আর এখন পারছে না।
দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্গাতা তিন ভারতীয়র প্রত্যেকেই শিক্ষাগ্রহণ করেছেন ইংল্যান্ডে। একজন ইংল্যান্ডে প্রশিক্ষিত ব্যারিস্টার, একজন কেমব্রিজে পড়েছিলেন, আর তৃতীয়জন ছিলেন দুটোই—কেমব্রিজে পড়াশোনা করা ও ইংল্যান্ডে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যারিস্টার।
বিকেন্দ্রীভূত একটা সমাজে বিজাতীয় ধারণা আমদানি করলে তার জন্য মূল্য দিতে হবে না?
দেখো, প্রকৃতিতে কেন্দ্রীকরণ বলে কিছু নেই। প্রকৃতি চলে আপন গতিতে, অসংখ্য বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। প্রকৃতি তার সব জায়গা থেকে শক্তি সংগ্রহ করে এক জায়গায় জড়ো করে না। যখনই তুমি একটিমাত্র জায়গায় শক্তি জড়ো করবে তখনই পেয়ে যাবে আক্রমণ করার ক্ষমতা। এর সঙ্গেই আসে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দুর্বলতাও।
আমি
আপনি কি তাহলে বলতে চাইছেন ইগরের মতো মানুষেরা এই কেন্দ্রীভূত ধারণার শিকার মাত্র? এমনকী তারা বুঝতেও পারে না কী করছে?
ওকেলো: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা-ই। আগুনটা জ্বালিয়ে রাখার জন্য তাদের লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয় মাত্র।
তুমি যখন নিজের জাতির মানুষকে বলো যে তাদের দেশটা জাতি, ধর্ম বা এমন অন্য কোন কারণে শ্রেষ্ঠতর, তখন একই সঙ্গে এটাও ইঙ্গত করো যে অন্যরা কোন না কোনদিকে নিচু পর্যায়ের। শ্রেষ্ঠত্বের এই বোধ তোমাকে দশ হাজার মাইল দূরে বাস করা জনগোষ্ঠীকেও ঘৃণা করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। অথচ তাদের হয়তো তুমি জীবনে দেখোইনি, তাদের সম্পর্কে কিছু জানোও না।
তোমাকে একটা ছোট, সেই কেন্দ্রীভূত গল্পই বারবার শোনানো হয়—একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ মানেই সন্ত্রাসী, একটি নির্দিষ্ট জাতি মানেই খারাপ, একটি নির্দিষ্ট নৃগোষ্ঠীর সদস্য মানেই সাক্ষাত দানব। আর হাজার হাজার, কখনোবা লাখো নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া যুদ্ধকে উস্কে দেওয়া, সমর্থন করা কিংবা নীরবে সায় দেওয়ার জন্য অনেক সময় সে ধারণাটাই যথেষ্ট হয়ে যায় ।
এর মধ্যে কাতিয়া আমাকে তিনবার ফোন করেছিল, কিন্তু আমি ধরিনি। এবার এলাে শুধু একটা শীতল বার্তা: কখন ফিরবে জানিও।
জবাবে আমি লিখলাম: আধ ঘণ্টার মধ্যে।
ওকেলোকে বললাম, আমাকে এখন যেতে হবে। উনি আমাকে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তার নিজের অবশ্য মোটেই সেদিকে যাওয়ার কথা না। আমি তাই বললাম, মেট্রোতেই চলে যাব। এবার মেট্রাে স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম দুজনেই।
মেট্রোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে ওকেলো ব্যাখ্যা করে চললেন, কেন তার মনে হয় জাতিরাষ্ট্র তার গঠনগত কারণেই বারবার যুদ্ধের জন্ম দেবে। তার মতে, একটি দেশ সমৃদ্ধ বা গণতান্ত্রিক হলেই এ সত্যটা বদলে যাবে না। ওকেলো বললেন, একটা দেশ নিজের সীমানার ভেতরে খুবই ন্যায়সঙ্গত ও উন্মুক্ত হতে পারে, কিন্তু সীমানার বাইরেই হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর।
ওকেলোর ভাষায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশটিই একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সহিংস। তার আগের একশ বছরে গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা হিসাবে বিবেচিত দেশটিও ছিল ওই সময়ের সবচেয়ে সহিংস রাষ্ট্র।
হলে ফিরলে কাতিয়া আমার দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকাল। জানা গেল, তিনবার ফোন করেও আমাকে না পেয়ে সে আঙ্কেল ভ্লাদকে ফোন করেছিল। আর তখনই জেনে যায়, ভ্লাদ আঙ্কেলের ছেলের জন্মদিনের কথা বলে আমি আসলে তাকে ধাপ্পা দিয়েছিলাম।
কাতিয়ার কাছে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতেই হলো, আমি ওকেলোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। মিথ্যা বলার কারণ, আমি চাই নাই, সে মনে করুক ওকেলোর প্রতি আমার বিশেষ কোনো ব্যক্তিগত আগ্রহ আছে।
এবার কাতিয়াকে সত্যি কথাটা বললাম। জানালাম ইগরের কথা। যেটাই কিনা ওকেলোর সঙ্গে আমার একা কথা বলার আসল কারণ।
কাতিয়া শুনে আমাকে ভালোমন্দ কিছুই বলল না। একটুও চমকে উঠল না। শুধু শুনে গেল। তবে এমনভাবে না, যেন সে বের করতে চেষ্টা করছে আমি আসলে বিশ্বাসঘাতক কি না। বরং এমন স্থিরভাবে শুনে গেল যাতে মনে হলো আমার কষ্টটাকে সত্যিই বুঝতে পারছে।
কাতিয়ার চাউনিতে আমি অবিচল নিশ্চয়তা আর মমতারই ছায়া দেখলাম। এ দৃষ্টির অর্থ বোঝার জন্য কোনো কথার প্রয়োজন হয় না।
মুহূর্তটা আমার মনে গেঁথে গেল। এই প্রথমবার বুঝলাম, কাতিয়া আসলে কেমন বন্ধু। এমন একজন, যার সামনে ভেঙে পড়লেও লজ্জা লাগে না। এমন একজন, যে নিখুঁত হতে বলে না। বলে শুধু সৎ হতে।
সেদিনই আমি বুঝলাম—ভেতরে ভেতরে নীরব শক্তির খনি এই চটপটে মেয়েটা আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ।
(চলবে)



