মোবাশ্বেরা খানম বুশরার একাত্তর পরিক্রমা

বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা ধরিত্রী
একাত্তরের দুর্বহ সময়ের স্মৃতিকথার হদিস অনেকের লেখাজোখায়ই পাওয়া যায়। এর মধ্যে কয়েকজনের স্মৃতিচারণ, বিশেষ করে শহীদজননী জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি পাঠকদের সেই দুঃসহ দিনগুলোতেই নিয়ে যায় না, এক মর্মপ্লাবী আলোড়নে সেই সময়টাকে অন্তর্লোকে জাগরুক করে রাখে, আর সেই সঙ্গে এক উজ্জ্বল বিচ্ছুরণও ঘটায়। উল্লেখের একান্ত প্রয়োজনে একজনের কথাই বললাম। স্মৃতিচারণমূলক গুরুত্বপূর্ণ গোটা বই বা বিচ্ছিন্ন লেখাপত্র অনেকই পাওয়া যাবে। তবে সবে কৈশোর-উত্তীর্ণ সতেরো পেরোনো এক সদ্য-তরুণী সময়ের ঘড়ি ধরে সেই দুর্বিসহ সময়কে যে বিশদভাবে ডায়েরিবন্দি করেছিল, তা যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি দীর্ঘদিন পরে এর আত্মপ্রকাশ ও সাবলীল ভাষাভঙ্গি যথেষ্ট কৌতূহল উদ্দীপকও। যার কথা বলছি তিনি মোবাশ্বেরা খানম বুশরা— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন, পিএইচডিও করেছেন এবং নিজেকে শিক্ষকতায় নিয়োজিত রেখেছেন গোটা কর্মজীবন। অন্য পরিচয়ে তিনি একজন পরিশ্রমী অনুবাদক। অনূদিত লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: এজি স্টক, উইনিফ্রেড হল্টবি, লিও টলস্টয়, ম্যারি উলস্টনক্রাফ্ট, হাওয়ার্ড ফাস্ট, মার্ক টোয়েন। পাশাপাশি রয়েছে তার একাধিক গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস ও স্মৃতিকথা। বই আকারে সদ্যপ্রকাশিত ডায়েরিভিত্তিক এই স্মৃতিচারণের নাম সময়ের ঘড়ি— স্মৃতিস্নাত একাত্তর। বইটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য— দিন-তারিখ ধরে ডায়েরিভুক্ত এন্ট্রিগুলোর পাশাপাশি কোন প্রেক্ষাপটে সেসব লেখা হয়েছিল তার ওপরও লেখক আলোকপাত করেছেন। শেষোক্ত কাজটি তার অতীতচারিতা সম্বন্ধে বর্তমানের পর্যবেক্ষণ। ফলে তা হয়ে উঠেছে চুয়ান্ন বছর আগের এক সদ্য তরুণীর বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থা ও অভিজ্ঞতার এক ধরনের বিশ্লেষণাত্মক ব্যাখ্যাও। লেখকের জবানিতে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই দিনপঞ্জি লেখার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল তার বাবার পরোক্ষ প্রভাবে। সেসব ছিল নিছকই ব্যক্তিগত দিনপঞ্জি। তবে একাত্তরে এসে ব্যক্তিগত সীমানা ছাড়িয়ে ডায়েরির এন্ট্রিগুলো হয়ে উঠেছে সময়ের চিহ্নবাহী দলিল। ভূমিকায় লেখক জানাচ্ছেন: ‘একাত্তরকে নিয়ে স্মৃতিকথা লেখার দীর্ঘদিনের ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে একাত্তরে লেখা ডায়েরিটা পেয়ে গেলাম। সেখানে প্রতিদিনের ঘটনাবলির বিবরণ। ...চুয়ান্ন বছরেও সে স্মৃতি সতেজ, অমলিন। ...সঙ্গে মিশেছে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতের অভিমান, ক্ষোভ, কষ্ট ও বেদনা। হতাশা তো আছেই, তবু হতাশ না হওয়ার মরিয়া প্রয়াসও রয়েছে। সবকিছু মিলেই আমার একাত্তর পরিক্রমা।’ মূল ডায়েরিটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। কালো রেক্সিনের হার্ডবাউন্ড মলাট, নাম রুপালি, মলাটের ভেতরগায়ে ইংরেজিতে নাইটিন সেভেন্টি ওয়ান ও তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র। সময়ের চাপে মলাটের জেল্লা খসে গিয়েছে, বাঁধাইও নড়বড়ে, কিন্তু ভেতরে কিছুটা হলদেটে পাতার পর পাতায় পরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষর।
ডায়েরির সূচনা ১৬ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার, ১৯৭১। ঋতুচক্রে সবে বসন্ত এসেছে, লেখকের মনে-ভাবনায় তারই মুখরিত দোলা, তবে কয়েকটি এন্ট্রির পর যেই তিনি মার্চের দিনপঞ্জিতে মনোনিবেশ করেছেন, আমরা লক্ষ করি তিনি অন্য জগতে পাড়ি দিচ্ছেন, যেখানে তার অনুভূতিতে বুদবুদ তুলছে এক অনিশ্চিত ভবিতব্যের ক্রমধাবমান সংকেত। ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল, মিছিলে-স্লোগানে আন্দোলিত রাজধানীসহ গোটা দেশ, মিলিটারির গুলি, হরতাল। তপ্ত, ঝঁাঝাল দিন-রাত্রি। তারপর রেসকোর্সে ৭ই মার্চের ভাষণ থেকে পঁচিশে মার্চ পর্যন্ত দিনপঞ্জির প্রতিটি এন্ট্রিতে রয়েছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা সেই সময়ের ঘটনাবলি। লেখক জানচ্ছেন, তখন তার পরিবারের বাস ছিল ঢাকা শহরের চামেলিবাগের এক গলিতে, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস কাছাকাছি হওয়ায় পঁচিশে মার্চ রাতে পুলিশ লাইনসে পাকিস্তান আর্মির তাণ্ডব ও পাল্টা প্রতিরোধের যে চিত্র মনে গেঁথে বসেছিল তা এক অর্থে তাকে নিক্ষেপ করেছিল দুর্যোগের করাল দুর্বিপাকে। ডায়েরিতে নির্মোহ ও মর্মস্পর্শী বর্ণনা রয়েছে তার সে অভিজ্ঞতার।
মোবাশ্বেরা খানমের গোটা ডায়েরি জুড়ে রয়েছে ৯ মাসব্যাপী যুদ্ধকবলিত এই ভূখণ্ডের প্রাত্যহিক ঘটনাপ্রবাহ। রাজনীতির কূটচাল থেকে আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তিধরদের দৃষ্টিভঙ্গি, আপামর জনসাধারণের শঙ্কাকূল দিনরাত্রি, বিশেষত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্ব, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, সবই রয়েছে এখানে। ডায়েরিতে কয়েক দিনের এন্ট্রি অনুপস্থিত, কারণ হিসেবে লেখক জানাচ্ছেন, ঢাকায় থাকা বিপজ্জনক ভেবে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তার পরিবার তখন বিভিন্ন জায়গায়— ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও উত্তরবঙ্গে কিছুদিনের জন্য ঠাঁই নিতে বাধ্য হওয়ায় ডায়েরির কয়েকটি পাতা খালি রয়ে গিয়েছিল। এই যে স্থানান্তর, এর ফলে যে জিনিসটি বিশেষভাবে তার নজরে পড়েছে তা এই ছোট দেশে স্থানভেদে সামাজিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধের বিকট পার্থক্য, যা সেই উদ্বেগাকুল সময়েও দুঃখজনকভাবে অটুট ছিল। নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কার্যকলাপের যে বয়ান তার লেখায় রয়েছে তার সূত্র দেশি-বিদেশি রেডিওতে শোনা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার সংবাদ। বস্তুতপক্ষে সংবাদ আহরণের একমাত্র মাধ্যম তখন ছিল রেডিও। সে কারণে আজকের দিনে অনেক বিস্মৃত রাজনীতিকের বক্তব্য সময়ের প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় তার লেখায় জায়গা পেয়েছে। বলতে গেলে, একাত্তরের যত স্মৃতি মানুষের মনে স্থির আসন গেড়ে আছে তার কোনো কিছুই যেন বাদ পড়েনি এই বিরল দিনপঞ্জিতে। এমনকি জুন-জুলাই মাসের দিকে মহামারীর মতো যে চোখের অসুখ (প্রচলিত কথায় ‘চোখ ওঠা’) দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাকেও তিনি যুদ্ধদিনের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেছেন— যথার্থভাবেই করেছেন।
মোবাশ্বেরা খানমের দিনপঞ্জিতে আমরা পাই দেশের কয়েকজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য। পারিবারিক সম্পর্ক ও আত্মীয়তার সূত্রে যাদের সঙ্গে লেখক ও তার পরিবারের লোকজনের আলাপচারিতা সেই দুঃসহ সময়কে কিছুটা হলেও হয়তো সহনীয় করে থাকবে। তাদের মধ্যে ছিলেন খ্যাতনামা সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন (যিনি যুদ্ধের শেষলগ্নে পাকিস্তানি দোসরদের বুদ্ধিজীবী নিধনে শহীদ হয়েছিলেন), সাংবাদিক তোয়াব খান, হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ, মুক্তিযোদ্ধা সাইদুল আনাম টুটুল (পরে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র সম্পাদক ও পরিচালক, আর যা না বললেই নয়, একান্ত ব্যক্তিগত পরিচয়ে তিনি ও লেখক কয়েক বছর পরে হয়েছিলেন স্বামী-স্ত্রী)। তাদের কেউই আজ বেঁচে নেই, বেঁচে নেই আরও অনেকে, যাদের সঙ্গে দুঃসময়কে ভাগাভাগি করেছিলেন লেখক। শহীদ সিরাজউদ্দিন হোসেনের মৃত্যুর খবরে ১৮ ডিসেম্বর, শনিবার লেখকের ডায়েরির ভাষ্য: ‘কী লিখব! সিরাজচাচা নেই (ইন্নালিল্লাহে...রজিউন)। কেউ নেই, যে কজন, আনুমানিক দুইশ জন, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, ডাক্তারকে ধরে নিয়ে গেছে তারা কেউই নেই।’
মোবাশ্বেরা খানম ডায়েরির ইতি টেনেছেন ৩১ ডিসেম্বর, শুক্রবার, ১৯৭১। ডায়েরিভুক্ত এন্ট্রি এবং তার বর্তমান পর্যবেক্ষণ ও ছবিসহ মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা দুইশর কাছাকাছি। খুদে হরফের কারণে চোখে চাপ পড়ে, বিশেষ করে ডায়েরি অংশ। স্মরণীয় এ বইটি আরও পাঠযোগ্য পরিপাট্য দাবি করে। প্রকাশক ‘বাংলা ধরিত্রী’ চাইলে পরের সংস্করণে এ খামতিটুকু দূর করতে পারে।
বইয়ের শেষে লেখকের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্ববহ। তিনি লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়ার প্রবল প্রতাপান্বিত প্রয়াসের সামনে অনেকটা যেন নিরুপায় হয়েই আমার কাঁচা হাতের দিনলিপিটিকে আশ্রয় করে আবার শক্তি খুঁজে পেতে চাইলাম। স্তব্ধ, হতবাক মনের ভেতরে গুমরে ওঠা বর্তমানের বিলাপের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো আমাদের একদা অতীতের গৌরবদৃপ্ত উচ্চকণ্ঠ উচ্চারণকে।’ বুঝতে অসুবিধা হয় না, সময়ের ঘড়ি ধরে তিনি দুর্বিসহ দিনের স্মৃতিকেই পরম নিষ্ঠা ও মমতায় ধারণ করেননি, এক আপাত-অনির্দেশ্য আগামীর দিকে চোখ রেখেছেন বলেই সময়ের এই ঘড়িকে তিনি বন্ধ হতে দিতে চান না, কিছুতেই না।






