মুল্লুকের সন্ধানে যাত্রা

বদরুন নাহারের বই মুল্লুক যাত্রা প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য
শোভাযাত্রা শব্দটি সংক্ষিপ্ত হয়ে যাত্রা হয়েছে বহুকাল। যার অর্থ দাঁড়ায় গমন বা কোথাও যাওয়া। মুল্লুক শব্দটা শুনলেই বাঙালি মনে যে কথাটা জেগে ওঠে তা হলো— ‘মগের মুলুক/মুল্লুক’! মুল্লুক অর্থ দেশ বা একটা বৃহৎ এলাকা। আবার অরাজক পরিস্থিতি বোঝাতেও মুল্লুক শব্দের ব্যবহার হতে দেখা যায়। কাজেই ‘মুল্লুক যাত্রা’ শব্দটা শুনলে প্রথম মনে হবে নির্দিষ্ট দেশে বা কোথাও যাওয়া হচ্ছে। সাধারণ অর্থ তাই দাঁড়ায়। কিন্তু এ যাত্রা মানে যাত্রা নয়, নয় কোথাও যাওয়া। এ যাত্রার উদ্যোগ নেওয়া মানে আরও বেশি শৃঙ্খলিত হওয়া, আরও বেশি গণ্ডিবদ্ধ হওয়া। বৃহৎ একটা জনগোষ্ঠী যতবার তাদের ‘দ্য ক্যাম্ফ’ যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, যাত্রা করেছে, ততবার মনুষ্য অধিকার লঙ্ঘন করে আরও বেশি গণ্ডিবদ্ধ, শৃঙ্খলিত করে রেখেছে সাহেব, সর্দার, বাবু নামক শাসকগোষ্ঠী। তাদের কূটচালে সেই মানুষগুলোর আর কখনো মুল্লুকে ফেরা হয়ে ওঠে না, কেবলি স্বপ্ন দেখতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কল্পনায় তারা দ্যাশের মুখ দেখতে পায় ঠিক কিন্তু কখনোই দ্যাশে আর যাওয়া হয় না, শিকড় না মেললেও পরগাছা হয়ে থেকে যেতে হয় এ-গাছ ও-গাছে।
ঔপন্যাসিক মুল্লুক যাত্রায় আমাদের দেশের এমন এক জনগোষ্ঠীর কথা চিত্রায়িত করেছেন, যাদের ব্রিটিশ, পাকিস্তান এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনগোষ্ঠীও পরগাছার মতো করে, নিরন্ন, চির-অভাবী করে রেখেছে। অথচ এ মানুষগুলোর হাড়ভাঙা খাটুনির জন্যই আমাদের ধোঁয়া ওঠা স্নিগ্ধ সকাল শুরু হয়। যখন আমরা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সকাল শুরু করি, ঠিক তখন সর্দারের লাঠিপেটার ভয়ে কিংবা একমাত্র জীবিকাটা হারানোর ভয়ে শূন্য পেটে তাদের যেতে হয় পাতা তুলতে।
চা শ্রমিকদের যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গ এ উপন্যাসে উঠে এসেছে। নিত্যদিনের অভাবী জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা মিথ ও রূপকথা, সংস্কার ও কুসংস্কার, অলৌকিকতা, রাজনীতি, শ্রেণি-শোষণ ইত্যাদি এক দার্শনিক বোধের দিকে নিয়ে যায়।
উপন্যাসের পরতে পরতে দার্শনিক চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। এ দর্শন কখনো লেখকের মন-নিঃসৃত, কখনো সেই মানুষগুলোর বয়ানের অংশ। প্রথম অধ্যায়ের এক জায়গায় দেখা যায়, ‘বেঁচে থাকা মানে এমনি, অনেক কিছু ভুলেই বেঁচে থাকতে হয়’। রাতের বেলা দিপেন মুণ্ডার শিশু সন্তানকে শিয়াল টেনে নিয়ে গেছে অথচ সকালে তার বউ-সন্তান হারানোর কষ্ট কোঁচড়ে নিয়ে চা পাতা তুলতে যায়। অনেক কিছু ভুলেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাকে! অস্তিত্বরক্ষায় কী করুণ লড়াই!
উপন্যাসের অলৌকিক শক্তিধর চরিত্র গুনোমণি যখন প্রথম সবাইকে নিয়ে মেঘনা নদী পার হয়ে মুল্লুক যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন সেই মুল্লুক শুধু শ্রমিকের মুল্লুক থাকে না, হয়ে ওঠে সকল ঘরহারাদের প্রতীক। যেন সকলেরই একই উচ্চারণ— ‘আহা মুল্লুক! সেও তো শূন্যের হাহাকারে মরুময় মরীচিকা।’
শুক্রমণি চরিত্রটিও এমনই রহস্যময়। ‘রুদমিলা ম্যাডামে’র কার্ডটা বের করে সে কল করতে যায় কিন্তু সেই কল রিসিভ নাও হতে পারে সেই ভেবে শুক্রমণি আর কল করে না, ‘যেনো থাক একটা গোপন আশা। হতাশ হবার বদলে হয়তো একটা আশা গোপন থাক।’ বাগানিদের যাপিত জীবনের জমানো গল্পগুলো ‘কখনো তা বুড়ো পাতার মতো কালচে আবার কখনোবা কচিপাতার মতো চকচক করে, ...।’
উপন্যাস জুড়ে রয়েছে একটা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের লড়াই। সেই লড়াই থেকেই সংকট, টিকে থাকার টানাপড়েন। ‘খুদকুঁড়ো খেয়ে কাঁচি হাতে টোপর ঝুলিয়ে, ঝুড়ি কাঁধে ঢাল বেয়ে নেমে যাও বনসাই গাছের কাছে। গাছের মাথায় যদি সকালের রৌদ চিকচিক করে, তবে সুখ।’ অর্থাৎ চা গাছের সবুজ সুন্দর রূপই চা বাগানিদের সুখের কারণ, বেঁচে থাকার অবলম্বন। মানুষ আর চা গাছ যেন ‘পরস্পর বেঁচে থাকার সম্পর্কে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বছরের পর বছর’!
মৌলিক অধিকারের অভাব যাদের নিত্যসঙ্গী, সেখানে শ্রমিকরা শিক্ষা পাবে কোথা থেকে! অথচ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বড় হাতিয়ার শিক্ষা। সেটি বাগানে শূন্যের কোঠায়। তবু কেউ একজন যখন অক্ষর চেনে, উদগ্রীব হয়ে ওঠে বাকিদের চেনাবার জন্য। যেন সবাই শিখতে পারে, পড়তে পারে। তাই গুনোমণির বর লাল বুনরাজি যখন পড়তে শিখল, সে আর কুলিদের হাজিরা খাতায় নাম লেখায়নি। অবৈতনিক এক কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করে সে। ‘সুন্দরী বাগানের ছাপড়া ঘরে কুলি-কামিনদের ছেলেপেলেকে অক্ষর চেনায়। অ-তে অজগর শেখায়।’ এভাবেই যখন শিক্ষার ছোঁয়া লাগে, কেউ কেউ পড়তে পারে, কেউ লিখতে পারে, কেউবা লিখতে-পড়তে পারে, তখন তাদের টিকে থাকার লড়াই একটু হলেও জোরদার হয়। শহরের বাবু, ইউনিয়নের লোকেদের লিখে দেওয়া পোস্টারে, শিখিয়ে দেওয়া বুলিতে, হাতে ধরিয়ে দেওয়া দাবির পরিবর্তে একসময় হরিশ-রতনেরা নিজে নিজেই তাদের অধিকারের কথা লিখতে চায়, ‘বেশ শীর্ণ দেহের ছেলেটি কুলির ঘরের; কিন্তু সে লিখতে পড়তে জানে! তাতেই আজ তাদের কথা লিখে দিবে বলেছে! ...নিজেদের লোকেরা লিখে দিবে... শহরের বাবু নয়।’
রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে নিষ্পেষিত জীবনের গল্প এই উপন্যাসে আগাগোড়া। ব্রিটিশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ আমলই শুধু নয়, গোটা জনপদের পট-পরিবর্তনের দৃশ্যও ঔপন্যাসিক অনেকটা ফুটিয়ে তুলেছেন। গুনোমণি তাই বলে ওঠে; ‘বাবা শাহ্জালাল সোনার খোঁজে নয়, মাটির খোঁজে এসেছিল।’ যে মাটি থেকে উৎখাত হয়েছে কেউ, আবার কেউ গেড়েছে নয়া খুঁটি। ভূমির ধর্ম এই, তার বুক চিরে যেমন নানারকম ফসল ফলে, তেমনি নানান মানুষ তার অধিকার ফলায়। সেই পরিবর্তনের ফলেই কোন মুল্লুক থেকে আসা লোকগুলোও বলে... ‘ভোট দিলে এই পূর্ব পাকিস্তানের নেতাকেই দিতে হবে। ...এবার দেশকে ছেড়ে যাওয়া চলবে না, এটাই তার জন্মস্থান, তার বাপেরও জন্ম এখানেই, এটা তাদেরই দেশ।’
জীবন বাস্তবতা ও জীবনের বেঁচে থাকার করুণ সংগ্রাম এখানে উপভোগ্য নয় কিন্তু উপজীব্য। জীবনের রূপ, রস, গন্ধ কেমন হয়— তা তারা জানে না। প্রচলিত জীবনের ধারা এখানে খাটে না। এখানে... ‘পাতা তোলার থলি ফেলে, জোঁকের মুখে রক্ত ঢেলে চলতে থাকা জীবন।’
এমন বাস্তব জীবনের মাঝেও রয়েছে কুসংস্কারের ছড়াছড়ি, অজ্ঞতা। শুধু নামে মিল আছে বলেই গুনোমণিকে আদিমাতা ঐশ্বরিক কিছু ভেবে বসে থাকা। অথচ সেই গুনোমণিকেও পিঠে ঝোলা বেঁধে কাজে যেতে হয় রোজ। দারিদ্র্য তার পিছু ছাড়ে না।
কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন অথচ অশিক্ষায় জর্জরিত, মৌলিক চাহিদার অভাবে বিপন্ন, ইতিহাসে নিষ্ঠুর রাজনীতির বলি হওয়া জনজীবনের এক দলিল বলা যায় এই মুল্লুক যাত্রাকে। সবুজ সতেজ চা বাগানের আড়ালে যে জমাট ঘন দীর্ঘশ্বাস গুমরে উঠছে শত শত বছর ধরে, তারই বয়ান মেলে এ উপন্যাসে।




