হিমালয়ের কোলে চতুর্থ দিনের রোমাঞ্চ
মেঘের চাদরে ঢাকা তেংবোচে

ছবি: আগামীর সময়
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে আমাদের এভারেস্ট বেস ক্যাম্প অভিযানের চতুর্থ দিনের যাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নামচে বাজার থেকে শুরু করে আজ আমরা এসে পৌঁছেছি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৮৬৭ মিটার (১২,৬৮৭ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত পাহাড়ি জনপদ ‘তেংবোচে’ (Tengboche)-তে। বিকাল ৫ টার সময় এখানকার তাপমাত্রা ছিল -১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে -৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
নামচে বাজার থেকে তেংবোচে পর্যন্ত আজকের এ পথচলা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর এবং চ্যালেঞ্জিং। পুরো পথ জুড়ে আমাদের সঙ্গী ছিল রুক্ষ পাথরের সুউচ্চ পর্বতমালা আর চারপাশ ঘিরে থাকা তুলার মতো সাদা মেঘের আস্তরণ। এর মাঝে প্রায় অর্ধেক সময় ধরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আমাদের পথ আগলে রেখেছিল। তবে পথের সবচেয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ছিল পাহাড়ি মৌমাছির উৎপাত। স্থানীয়দের মতে, কোনো এক অসচেতন পর্যটক মৌমাছির চাকে আঘাত করায় পুরো ট্রেইলে মৌমাছিগুলো বেশ চড়াও হয়েছিল। যারা সাবধানতাবশত এক্সপোজড বা খোলা জায়গাগুলো সতর্কতার সঙ্গে দ্রুত পার হয়ে গেছেন, তারা রক্ষা পেয়েছেন; আর যারা অসতর্ক ছিলেন, তাদের বেশ পোহাতে হয়েছে এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা।
বিকাল ৫টার দিকে ঠান্ডাকে উপেক্ষা করেই আমরা তেংবোচে চারপাশটা একটু ঘুরে দেখার চেষ্টা করলাম। এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বিখ্যাত ‘তেংবোচে মনাস্ট্রি’ (Tengboche Monastery)। এটি খুম্বু অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ তিব্বতি বৌদ্ধ বিহার বা গুম্ফা। ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মনাস্ট্রির ইতিহাস বেশ প্রাচীন ও সংগ্রামের। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় বড় বিপদের মুখে পড়েও স্থানীয় শেরপা সমাজ ও ভক্তদের প্রচেষ্টায় এটি বারবার পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
এভারেস্ট অভিযাত্রী ও স্থানীয় শেরপাদের কাছে এ মনাস্ট্রি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি তাদের মানসিক শক্তি ও আশীর্বাদের পবিত্র স্থান। মনাস্ট্রির পাশেই রয়েছে একটি চমৎকার ও উষ্ণ বেকারি, যা এ হিমালয়ের গভীরে পর্যটকদের দারুণ এক প্রশান্তি দেয়।
তেংবোচে থেকে এভারেস্ট, লোটসে বা অন্যান্য বিখ্যাত পর্বতমালাগুলো দেখার জন্য আমরা বিকাল বেলা উন্মুখ হয়ে থাকলেও, খারাপ আবহাওয়ার কারণে আজ সেগুলোর দেখা মেলেনি। চারপাশ ঘন মেঘে ঢাকা থাকায় প্রকৃতির সেই মহিমান্বিত রূপ আজ আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে গেল। তবে আশা রাখছি, রবিবার সকালে আবহাওয়া পরিষ্কার হলে হয়তো এ শৃঙ্গগুলোর দেখা মিলবে।
প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতা, বৃষ্টির লুকোচুরি আর দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তেংবোচের এ হিমশীতল পরিবেশে রাত কাটানো আমাদের এ অভিযানের অন্যতম রোমাঞ্চকর একটি অধ্যায় হয়ে রইল। সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি, যেন আগামী দিনগুলোতেও সুস্থ থেকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।







