গণি রোড থেকে সরছে সচিবালয়, বসবে আদালত
- শেরেবাংলা নগরে বাণিজ্য মেলার পুরাতন মাঠে যাবে সচিবালয়
- পুরান ঢাকার নিম্ন আদালত আসবে গণি রোডের সচিবালয়ে
- একনেকে তুলতে তৎপরতা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আঁকাবাঁকা গলি আর জায়গার প্রচণ্ড সংকট। প্রতিদিন সেখানেই ভিড় জমান ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। নেই বসার জায়গা, নেই প্রয়োজনীয় সুবিধা। বিচারপ্রার্থী থেকে আইনজীবী— সবাই দিশাহারা। এ চিত্র পুরান ঢাকার আদালতপাড়ার (নিম্ন আদালত বা অধস্তন আদালত)। দীর্ঘদিনের এই সংকট কাটাতে এবার বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এতে বদলে যাবে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু ও জজকোর্টের ঠিকানা। রাজধানীর নবাব আবদুল গণি রোডে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রখ্যাত বর্তমান সচিবালয় এলাকায় নিম্ন আদালত স্থানান্তরের চলছে পরিকল্পনা। আর সচিবালয় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠ প্রাঙ্গণে।
এরই মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন সচিবালয় ভবনের অবকাঠামোর জন্য লে-আউট (নকশা) প্রস্তুত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এটি চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর সময়ে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। আর লে-আউটে ভবনগুলোর অবস্থান দেখার পর বর্তমান সরকারপ্রধান পছন্দ করে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন এসব তথ্য।
আবদুল গণি রোডের বর্তমান সচিবালয় এলাকায় নিম্ন আদালত স্থানান্তরের বিষয়ে গত আগস্টের শেষের দিকে হয় আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক। এ ছাড়া বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরকে নিয়ে হয়েছে আরও একাধিক বৈঠক। এরই ধারাবাহিকতায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের লে-আউট-সংক্রান্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সর্বশেষ বৈঠক বসে গত বৃহস্পতিবার।
আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা বলছিলেন, পুরান ঢাকা থেকে আদালত ভবন সরিয়ে বর্তমান সচিবালয় চত্বরে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। সেই লক্ষ্যে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় সরানোই উপযুক্ত পথ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কর্তারা। সেজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারের তরফ থেকে ভবনের অবস্থানসহ পুরো এলাকার একটি লে-আউট তৈরি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর গণপূর্ত অধিদপ্তর শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার খেলার মাঠে ২৪ একর জমির ওপর সচিবালয়ের জন্য বিভিন্ন ভবনের একটি লে-আউট প্রস্তুত করে। যে লে-আউট বেশ পছন্দ করেছেন সরকারপ্রধান। গুরুত্ব বিবেচনায় চলতি বছরের এডিপির সবুজ বইয়ে তা তালিকাভুক্তের জন্য দেওয়া হয়েছে জোর তাগাদা।
ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া আরেক কর্মকর্তা জানালেন, সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পর নড়েচড়ে বসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে শিগগির জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। আর অনুমোদন পেলে বাস্তবায়ন করা হবে নির্ধারিত প্রকল্প।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রকল্পটির প্রয়োজনীয় তথ্য-ব্যাখ্যাসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে এরই মধ্যে যাবতীয় তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে, যা গৃহায়ন এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা-৩ গত বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনের কাছে সরবরাহ করেছে। যার নম্বর ২৫.০০.০০০০.০০০.১৩৫.১৪.০০২১.২৬/৩৩৫ এবং তারিখ ৮ অক্টোবর ২০২৬। এতে স্বাক্ষর করেছেন গৃহায়ন এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা-৩-এর উপসচিব (বিকল্প কর্মকর্তা) রুবায়েত হায়াত শিপলু। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব), ভৌত অবকাঠামো বিভাগ এবং কার্যক্রম বিভাগের সদস্যকে (সচিব) এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যার বিষয় ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রস্তাবিত ‘ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। এর সূত্র স্মারক নং ২৫.৩৬.০০০০.৩১০.১৪.০০১.১৮/২১৮২। আর ৮-১০-২০২৫ তারিখে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে পাওয়া।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না থাকায় প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণ করা যাচ্ছে না। ফলে প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ ২৯ হাজার টাকার খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর প্রকল্পটি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় ঢোকানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তাবসহ আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রোগ্রামিং কমিটির সারসংক্ষেপও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় ১১৮টি আদালত রয়েছে। এসব আদালতে প্রায় সাড়ে চার লাখ ফৌজদারি ও দেড় লাখ দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় আদালত চলার দিনগুলোতে প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি বিচারপ্রার্থীর বিচরণ এই আদালতপাড়ায়। সব আদালতের জন্য পৃথক এজলাস ব্যবস্থা নেই। কিছু আদালতের এজলাস ভাগাভাগি করে চলে মামলার বিচারের কাজ। মামলা ব্যবস্থাপনার জন্য সেরেস্তা, নকলখানা, রেকর্ডরুমও পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়া বিচারপ্রার্থীদের জন্য বসা বা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নেই তেমন ব্যবস্থা। আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য আদালত প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও নেই। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত টয়লেট ব্যবস্থাও নেই। ভবনে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত লিফটও নেই। গাড়ি পার্কের জন্য নেই কোনো জায়গা।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া গতকাল শনিবার আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘পুরান ঢাকায় অনেক কিছু অ্যাকোমোডেশন করা যাচ্ছে না। কারণ একেবারে সংকীর্ণ এলাকায় আদালত অবস্থিত। সেটা যদি সচিবালয় বা অন্য কোনো প্রসারিত জায়গায় নেওয়া হয়, তবে ভালো হবে। এটা সরাতে পারলে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। এটা স্থানান্তরের খবরটা শুনে ভালো লাগছে।’
নিম্ন আদালতের বিচারপ্রত্যাশী কাজী হায়দার আলী জানালেন, আদালতপাড়ায় তাদের ভোগান্তির অন্ত নেই। এজলাসে আইনজীবীদের বসার ব্যবস্থা থাকলেও বিচারপ্রার্থীদের বসার কোনো জায়গা নেই। ফলে আদালতের বারান্দাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। অনেক দিন গেছে সারা দিন একটুও বসার সুযোগ হয়নি, স্থান সংকটের কারণে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে। তবে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আগামীর সময় এরপর কথা বলার চেষ্টা করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির সঙ্গে। তবে গতকাল রাতে কল করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে কল করার কারণ জানিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও মেলেনি কোনো জবাব।



