অবহেলিত প্রবীণদের ঠিকানা সাজুর বৃদ্ধাশ্রম

আশ্রমের বাসিন্দা এক বৃদ্ধাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছেন সাজু
বাবা-মা সন্তানদের অনেক কষ্ট করে বড় করেন। তাদের জন্য ত্যাগ করেন সারা জীবন। কিন্তু সমাজের অনেক বাবা-মা থাকেন অনাদর-অবহেলায়, যাদের পাশে থাকার মতো কেউ নেই। তাদের কথা ভেবেই নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের সাজেদুল ইসলাম সাজু (৪৫) গড়ে তুলেছেন একটি আবাসস্থল— নাম দিয়েছেন নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম।
সাজুর এই পথচলার শুরু ২০১৮ সালের জুন মাসে। উপজেলার বড়ভিটা বাজারে একদিন সকালে নিজের কীটনাশকের দোকান খোলার সময় এক পাশে ষাটোর্ধ্ব এক নারীকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন সাজু। দৃশ্যটি তার মনে নাড়া দেয়। এরপর বৃদ্ধ ওই নারীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গোসল করান, নতুন কাপড় পরিয়ে দেন। সেই একটি ঘটনা বদলে দেয় তার জীবনদর্শন।
২০২২ সালে নিজের দোকানের আয় দিয়ে দোকানের অদূরে ১৪ শতাংশ জমির ওপর ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন বৃদ্ধাশ্রমটি। তার এই চলার পথে এসেছে নানা বাধা, অনেকে করেছেন কটূক্তি। অর্থের অভাবে অনেকের কাছ থেকে নিয়েছেন সহযোগিতা, কিন্তু থেমে যাননি সাজু।
গত চার বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৭০ জন অসহায় প্রবীণ নারী-পুরুষ এখানে আশ্রয় পেয়েছেন। তাদের কেউ পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন, কেউ থেকে গেছেন এই আশ্রমেই। এ পর্যন্ত ৬৭ প্রবীণ নারী-পুরুষ এই বৃদ্ধাশ্রমে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১৩ জনের দাফন কাফনের ব্যবস্থা করেছেন সাজু। বর্তমানে এই বৃদ্ধাশ্রমে ৬৫ জন নারী-পুরুষ বসবাস করছেন। তাদের কারও স্বামী-সন্তান আছে, কিন্তু পাশে নেই। কেউ আবার জীবনের নানা প্রতিকূলতায় হয়ে পড়েছেন সম্পূর্ণ নিঃস্ব। তাদের কাছে নিরাপদ আশ্রময়ই শেষ ঠিকানা।
আশ্রমের বাসিন্দা মোকলেছুর রহমান বললেন, ‘আমার ছেলে এখানে রেখে গেছে। কেউ খোঁজখবর নেয় না। পরিবারের কথা মনে পড়লে কষ্ট লাগে। তবে এখানে ভালো আছি।’
জমিলা খাতুন নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমে আছেন তিন বছর। তার ভাষ্য, ‘সাজু আমাদের ছেলের মতো করে আগলে রেখেছেন। ছেলে-মেয়ে কেউ খবর নেয় না। আমরা এখানে পরিবারের মতো করে আছি, কষ্ট হলেও এখানে ভালো আছি। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই সে আগলে রেখেছে আমাদের।’ মনে অনেক কষ্ট থাকলেও সাজুর প্রতি কৃতজ্ঞ বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দারা। কারণ পরিবারের কেউ পাশে না থাকলেও সাজু তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
সাজেদুল ইসলাম সাজু বললেন, ‘নিজ উদ্যোগে আশ্রমটি গড়ে তুলেছি। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অসহায় মানুষ এখানে বসবাস করেন। আবার কেউ খবর দিলে নিজ খরচে আমি তাদের নিয়ে আসি। যতদিন পারি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের দেখভাল করে যেতে চাই।’
বর্তমানে আশ্রমের বৃদ্ধদের দেখাশোনার জন্য তিনজন নারী ও দুজন পুরুষ কর্মী রয়েছেন। নারীদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য রয়েছেন একজন নারী শিক্ষক। খাবার, চিকিৎসা, ওষুধ, কর্মীদের ব্যয় বাবদ বৃদ্ধাশ্রমে মাসে খরচ হয় প্রায় ১ লাখ টাকা। এই ব্যয় মেটাতে সাজুর হিমশিম অবস্থা।
নীলফামারীর সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানালেন, সাজেদুল ইসলাম সাজুর উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। প্রতি ঈদে আশ্রমের বাসিন্দাদের জন্য সহায়তা দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অসহায় প্রবীণদের সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর প্রতি মাসে খাবারের জন্য চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়।
নিজের তিন সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব সামলেও অন্যের বাবা-মায়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া সাজু শুধু একটি বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা নন, তিনি মানবিকতার এক নীরব উদাহরণ।



