রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালিমা লেপন করলে কী ঘটে?

ঢাবিতে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দিতে দেখা যায় এক নারীকে। আর এক রিকশাওয়ালাকে দেখা যায় কালি পরিস্কার করতে- সংগৃহীত ছবি
রবীদ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয় ১৯৪১ সালে। তখনো ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়নি, বাংলাদেশ তো তখন দূর কল্পনা। এখানে এটিও স্পষ্ট করা দরকার, জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথের কল্পনার মধ্যে বাংলা থাকলেও ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ছিল না। এটি তার কোনো 'অপরাধ'ও নয়; বরং বলা যেতে পারে, সে বাস্তবতা রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকার সময়ে তৈরিই হয়নি।
পরে ১৯৪৭ সালে যখন ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত করার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হলো ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র— পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথবিরোধীতা শুরু হলো মূলত সে সময় থেকে। কেন এই রবীন্দ্রবিরোধীতা? এর মর্মমূলে গেলে আমরা দেখতে পাব, এখানে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের চেয়ে তার ধর্মীয় পরিচয়কে প্রধান করে তোলা হলো। 'রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কবি', তখন যারা রবীন্দ্রনাথের বিরোধীতা করেছিলেন, সোজা কথায় এই ছিল তাদের প্রধান ন্যারেটিভ। এই ধুয়ো তুলে পাকিস্তান রেডিওতে রবীন্দ্রনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। তখন পাকিস্তান সরকার এই নিষিদ্ধের কারণ ব্যখ্যা করে বলেছিল— “পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থী হওয়ার কারণে রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার সীমিত বা বন্ধ করা হবে’’- এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬৭ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। অবশ্য ১৯৬৫ সালের ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধের সময় থেকেই তৎকালীন সরকারের তরফে রবীন্দ্রবিরোধীতার ন্যারেটিভ প্রচার করা হতে থাকে।
এখন তো পাকিস্তান আমল নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেরও অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। তবে বাংলা ভাষা তথা বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে ররীন্দ্রনাথকে এখন কি আমরা বর্জন করব? কেন বর্জন করব? এই বর্জন-প্রক্রিয়ার কার লাভ, কার ক্ষতি, গণ-অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় প্রশ্নগুলো খতিয়ে দেখা এখন খুব জরুরি।
সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপ্টানোর ঘটনা ঘটেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক কম বয়সী মেয়ে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপ্টে দিচ্ছেন। মানে তাকে বর্জন করতে চাচ্ছেন।
কথা হলো, রবীন্দ্রনাথে এই কম বয়সী মেয়ে বা তার মতো আরও যারা আছেন, তাদের সমস্যা কোথায়?
তারা বলার চেষ্টা করছেন, রবিবাবু বাংলাদেশের বিরোধীতা করেছেন। খেয়াল করুন, পাকিস্তান আমলে সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রবিরোধীতার সূচনা ঘটেছিল, এই কবি পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থি, এই কথা বলে। আর এখন বাংলাদেশে তার ছবিতে যারা কালিমা লেপন করছেন, তারা বলছেন, তিনি বাংলাদেশের বিরোধীতা করেছিলেন।
কীভাবে এবং কোন ইতিহাস জ্ঞান দিয়ে তারা এ কথা বলেন আল্লাহ মালুম।
যারা এখন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে 'বাংলাদেশ বিরোধীতা'র তত্ত্ব প্রচার করতে চান কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীদ্রনাথ বিধায় তা বদল করতে চান, তাদের মনের মধ্যে কি এই কথিত বিষয় থাকে যে ১৯০৫ সালে যে বঙ্গবভঙ্গ হওয়ার কথা ছিল, রবীন্দ্রনাথ তার বিরোধীতা করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ঐতিহাসিক নথি নেই।
তার পরেও তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে রবিবাবুর এই বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা থেকেই তিনি বাংলাদেশের বিরোধী ছিলেন, এ কথা বলা হচ্ছে; তাহলেও কথাটি ধোপে টেকে না। কারণ, বঙ্গভঙ্গ রদ না হলে বাংলাদেশ হওয়ার বাস্তবতা বা প্রয়োজনই থাকত না। তাহলে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশ বিরোধী হলেন কীভাবে?
বরং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সাংস্কৃতিক অবলম্বন হয়ে উঠেছিলেন। যদিও এই পৃথিবীতে তখন শারীরিকভাবে তার কোনো অস্তিত্ত্ব ছিল না। তার পরেও কীভাবে তিনি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অস্ত্র হয়ে উঠলেন?
উত্তর হলো, গেল শতকের ষাটের দশকের মধ্যভাগ থেকে ১৯৭১ সাল অব্দি ববীন্দ্রনাথকে আমরা নতুনভাবে নির্মাণ করেছিলাম। যে কারণে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ সেই সময়কার পাকিস্তান টেলিভিশনে তার লেখা 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে গানটি প্রচার করা হয়। সে গানে 'ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ভেরে/ তোমার দুয়ার আজি ভরে গেছে সোনার মন্দিরে'-এর এই মা আমাদের কাছে দেশমাতৃকার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথের পূজাপর্বের এই গানকে যে ১৯৭১ সালে আমরা লড়াইয়ের অংশ করে তুললাম, দেবী আরাধনার সংগীতকে যে দেশমাতৃকার প্রণতিগীত হিসেবে রূপান্তরিত করে তুললাম এর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে রবীন্দ্রনাথকে আমরা নতুনভাবে নির্মাণ করেছি। এই রবীন্দ্রনাথ একান্তই আমাদের, যাকে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছি।
মনে রাখতে হবে, আমাদের অর্জিত এই রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ভক্তিপ্রিয় রবীন্দ্রনাথ নন, তিনি এমন এক প্রতিভূ, যিনি সবাইকে লড়াইয়ের প্রেরণা দেন।
তাহলে এখনকার বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথে সমস্যা কোথায়?
সমস্যাটি রবীন্দ্রনাথ নয়, সমস্যা হলো জুলাই পরবর্তী সময়ে উগ্র ডানপন্থিদের উত্থান প্রক্রিয়ায়। এই অভ্যুত্থানে বাম-ডান-মধ্যপন্থি সবাই-ই শামিল ছিলেন, কিন্তু অভ্যুত্থানের পর গোটা অভ্যুত্থানকে একধরনের ডানপন্থি ন্যারেটিভের মধ্যে ভরে ফেলতে চাইলেন একটা শ্রেণি, যাতে এই অভ্যুত্থান ডানপন্থিদের, এটি প্রমাণ করতে সুবিধা হয়।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক্ষত্রে ডানপন্থিরা এমন কিছু কাজ করলেন, যাতে তৈরি হলো তীব্র অবিশ্বাস।
বলা ভালো, এই অবিশ্বাসের দরূন সামনে প্রচণ্ড ভুগতে হবে সবাইকে। যারা একধরনের মধ্যপন্থি লিবারেল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সত্য হলো, তাদের প্রায় সবাই-ই প্রতারিত হয়েছেন। তবে এখনো হয়তো আশা হারাননি অনেকেই।
কিন্তু যারা আশা হারাননি, তাদের আশা যাতে পুরোপুরি ধূলিস্মাৎ করে দেওয়া যায়, সোজন্য এসেছে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়া প্রকল্প। ঘৃণা উসকে দেওয়ার প্রজেক্ট। আর এই প্রকল্পেকে 'কামিয়াব' করতে যারা উঠেপড়ে নেমেছেন, তারা কারা? তাদের পেছনে কারা রয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তরও আমাদের খুঁজতে হবে। অন্তর্ভূক্তিমূলক বাংলাদেশের পথে এই শ্রেণীর প্রধান বাঁধা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এরাই নানা ইস্যু সামনে এনে আমাদের বারবার বিভক্ত করেছে। শুধু তাই নয়, সমাজকে এরা যেমন ভীতিকর করে তুলেছে, একইভাবে ক্রমাগত সমাজের মধ্যে নানান ক্যাওস উৎপাদনেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেছে। এর ফলে যা হয়েছে তা হলো, সমাজ বিভক্ত হয়েছে। আমাদের মধ্যে বিভেদ বেড়েছে। এই বিভেদকারীদের আমাদের সন্দেহ করতে পারতে হবে।
পাশাপাশি এও বোঝা দরকার, যারা এখন রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালিমা লেপন করছেন, এই কালিমা লেপনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রপ্রিয় জাতির মধ্যে তারা বিভেদ ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে আর কী করতে চাইছেন? দুই পক্ষকে মুখোমুখি করে ঘৃণা উসকে দেওয়াই তাদের কাজ।
এরপর খেল খতম। তাদের কাজ আদতে এখানেই শেষ। তারপর সবাই এমনিতেই বিভক্ত হবে। আর আমাদের মতো অনেকেই আরেকবার প্রতারিত বোধ করব, এই তো তাদের চাওয়া, তাই না?
মাথা মোটা 'বুদ্ধিহীন মুসলমান' পরিচয়বাদী উগ্র রাজনীতি এভাবেই ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
তবে যারা এই বিভক্তি ঘটিয়ে বিরাট কাজ করছেন বলে মনে করছেন, তাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, এই বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ আগের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক ও অবলম্বনযোগ্য হয়ে উঠবেন অচিরেই। আমাদের নির্মিত এই রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে বারংবার আমরা লড়াই করার প্রেরণা পাই। আবারও বলি, রবীন্দ্র ভক্তিবাদীতা নয়, এবার রবীন্দ্রনাথ উদ্ভাসিত হবেন বুদ্ধির মুক্তির সম্প্রসারণ ঘটানোর মধ্য দিয়ে।
আমরা যেন এ কথা মনে রাখতে পারি যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ভাষায় সাহিত্যচর্চা করেছেন, সেই ভাষার গন্তব্য ও ভবিষ্যৎ কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতেই।
ফলে যখন রবীন্দ্রনাথের ছবিতে আপনি কালিমা লেপন করবেন, তার নামে ভুলভাল তথ্য ছড়াবেন, তখন আমি রবীন্দ্রনাথকেই আরও বেশিভাবে আঁকড়ে ধরে বলব, 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/ তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী, ওগো মা...।'
এখন যারা রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালিমা লাগাচ্ছেন, তারা যেন এই ইতিহাস ভুলে না যান যে, আমাদের দেশমাতৃতাকে বিভক্ত করতে চাইলে, আমরাও লড়াই করতে জানি।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক







