যুদ্ধাপরাধের বিচারক নাভি পিল্লাই পাচ্ছেন শান্তির নোবেল

নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। ফাইল ছবি
বিশ্বে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে শান্তির নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন নাভানেথাম নাভি পিল্লাই।
আজ শুক্রবার নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি ২০২৬ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হিসেবে এই আইনজ্ঞের নাম ঘোষণা করেছে।
৭৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই উত্তরাধিকার সূত্রে ভারতীয় তামিল হলেও তার জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকায়। তার বাবা-মা আবাস গড়েছিলেন আফ্রিকার দেশটিতে।
দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক নাভি পিল্লাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার চলছে।
নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেরও বিচারক ছিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল অবধি জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তিনি।
গত বছর শান্তিতে নোবেল জয় করেছিলেন ভেনেজুয়েলার সরকারবিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। এবার পুরস্কারটি গেল আফ্রিকায়।
আগামী ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এবার মনোনীতদের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। প্রতিটি নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি টাকা।
নাভি পিল্লাইর নাম ঘোষণার সময় নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, অসাধারণ সাহস ও সততার সঙ্গে বিশ্বে আরও সুসংহত আইনি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে এমন একজন ব্যক্তিকে, যিনি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বর্ণবাদী শাসনামলে জন্ম নেওয়া নাভি পিল্লাই ইউনিভার্সিটি অব নাটাল থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন ১৯৬৫ সালে। এরপর আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বৈষম্য-বঞ্চনা ও বর্ণবিভেদ অবসানে তার লড়াই স্মরণ করেছে নোবেল কমিটি। কালো মানুষের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার পক্ষে তার আইনি লড়াই চালানোর কথাও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চ আদালতের পর রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন নাভি পিল্লাই।
নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধের কয়েকটি মামলায় নাভি পিল্লাই দেখিয়েছেন, আইনি পদক্ষেপ প্রতিরোধ করতে পারে যুদ্ধ ও সহিংসতা। আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতেও রয়েছে তার অবদান।
‘স্বাধীনচেতা মনোভাব, জ্ঞান ও অবিচল অবস্থান তাকে আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রদ্ধেয় আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞে পরিণত করেছে,’ বলা হয় বিবৃতিতে।
নাভি পিল্লাই যুদ্ধাপরাধের জন্য যেভাবে রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী বিভিন্ন নেতাকে জবাবদিহির আওতায় এনেছেন এবং সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছেন, তা তুলে ধরেছে নোবেল কমিটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন সিদ্ধান্ত দেয় যে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি গণহত্যার সমান অপরাধ হতে পারে, সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে নাভি পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিলেন।
‘আমাদের সময়ের আন্তর্জাতিক আইনি নীতির অন্যতম প্রধান রক্ষক নাভি পিল্লাই। তার গৌরবোজ্জ্বল কর্মজীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বজুড়ে আইনের শাসনকে সমর্থন, শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করা কতটা জরুরি,’ বলা হয় বিবৃতিতে।
এই সময়ে নাভি পিল্লাইকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার ক্ষেত্রে নোবেল কমিটি বলেছে, ‘আমরা দেখেছি, হুমকি, সহিংসতা ও যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতি, চুক্তি এবং আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধান করা বেশি সম্ভবপর হচ্ছে।’
কিন্তু সে পথে এগোতে গিয়ে আইনি ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে চাপের মুখে পড়ছে, তা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইতিহাস দেখিয়েছে, আইনের শাসন ছাড়া বিশ্বে ন্যায্যতা আসবে না।
‘কিন্তু যে বিচারকরা প্রশংসার যথার্থ দাবিদার, তাদেরই আজ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হচ্ছে, তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রান্ত হচ্ছে। এমন সময়ে আমাদের প্রয়োজন সাহস, দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়সংকল্পসম্পন্ন মানুষ। বিচারকের আসনে নাভি পিল্লাইয়ের কাজের মধ্য দিয়ে এসব গুণেরই প্রতিফলন ঘটেছে।’




