বিনা পয়সায় চুল কাটেন আবেদ আলী

নিজ বাড়ির উঠানে চুল কাটছেন আবেদ আলী
অন্যের ফসলে স্প্রে মেশিনে ওষুধ ছিটিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন আবেদ আলী। নিজের সংসারে নিত্যসঙ্গী টানাপড়েন। তারপরও নিজে ফিটফাট থাকার পাশাপাশি অন্যদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার পরামর্শ দেন। নিজে নরসুন্দর নন, তবু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী কিংবা অসচ্ছল ব্যক্তিদের বিনা পারিশ্রমিকে চুল কেটে দেন তিনি। গড়ে প্রতিদিন পাঁচজনের মাথার চুল কাটেন আবেদ আলী। শুধু অন্যদের পরিচ্ছন্ন রাখতে ৩৫ বছর ধরে এলাকায় এমন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখাঁন ইউনিয়নের রনজিতেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা আবেদ আলী (৮০)। ছয় ছেলেমেয়েসহ আটজনের অভাবের সংসার চালাতে একসময় ঘানি টেনে সরিষার তেল উৎপাদন করে বিক্রি করতেন। সে কারণে এলাকায় সবাই তাকে আবেদ তেলি বলেই চেনেন। চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেরা বিয়ে করে গড়েছে আলাদা সংসার। বর্তমানে সাইকেলে স্প্রে মেশিন নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ক্ষেতের ফসলসহ গাছে ওষুধ ছিটানোর কাজ করেন আবেদ। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয়ে চলে স্ত্রীসহ তাদের দুজনের সংসার। নিজের অভাব-অনটন থাকলেও অসচ্ছল মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে চুল কাটার কাজটি তিনি ধরে রেখেছেন। প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের মানুষ ভিড় করেন তার বাড়িতে। হাসিমুখে সবার চুল কেটে দেন তিনি।
শুরুর গল্পটা জানালেন আবেদ, একদিন গ্রামের এক স্কুলছাত্র কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে আসে। চুল বড় হওয়ায় স্কুলশিক্ষক তার চুল ধরে টেনেছেন। কারণ জানতে চাইলে শিশুটি জানায়, টাকা না থাকায় চুল কাটাতে পারেনি। সেদিন একটি ব্লেড এনে ওই ছাত্রের চুল কেটে দেন তিনি। সেই যে শুরু, এরপর আর থামেননি। এভাবে কেটে গেছে ৩৫ বছর।
রাজারহাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রনজিতেশ্বর গ্রাম। সরেজমিনে আবেদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দারিদ্র্যের ছাপ রয়েছে সংসারে। উঠানে ছোট্ট টুলে বসিয়ে গায়ে কাপড় জড়িয়ে চুল কাটছিলেন গ্রামের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর। পাশে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছিল আরও তিন শিক্ষার্থী। কাঁচি-চিরুনি কিংবা আধুনিক কোনো সরঞ্জাম নেই আবেদ আলীর। ডান হাতে ব্লেড চালানোর সময় বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এই পদ্ধতিতে চুল কাটায় দক্ষ হয়ে উঠেছেন তিনি। কেউ নিজের পছন্দের ধরন জানালে সেভাবেই চুল কেটে দেন। অর্থের অভাবে যারা নিয়মিত সেলুনে যেতে পারেন না, তাদের অনেকেই তার কাছে চুল কাটাতে আসেন।
আবেদের কাছে নিয়মিত চুল কাটান গ্রামের আহসান হাবীব হাসান। তিনি বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আবেদ দাদার কাছে চুল কাটাই। টাকার অভাবে চুল কাটাতে না পারলে উনিই আমার শেষ ভরসা।’
স্থানীয় বাছড়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ‘আমিও অনেক সময় তার কাছে চুল কাটিয়েছি। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি মানুষের চুল কেটে আসছেন, বিনিময়ে তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেন না। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন ভরসার মানুষ।’
আবেদ আলী বললেন, ‘অপরিষ্কার মানুষ দেখতে ভালো লাগে না। এলোমেলো-ঝাঁকড়া চুল দেখতে খারাপ লাগে। মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখলে আমার মন ভালো হয়ে যায়। সে কারণে অন্যের চুল কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’
কুড়িগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা ববিতা খাতুন বললেন, অভাবের মধ্যেও নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ আলীর রয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এমন অনন্য উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন।



