জ্বালানি সংকটে সমাধান স্মার্টসিটি

বিশ্ব জুড়ে শহর বড় হচ্ছে আর জ্বালানির অভাবও বাড়ছে। তাই দরকার স্মার্টসিটির মত টেকসই সমাধান। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
ভোর ৪টা। কাচে ঘেরা বিশাল বহুতল ভবনের জানালাগুলোয় দিনের প্রথম আলো পড়ছে। এগুলো শুধু আলো-বাতাস ঢোকার জন্য তৈরি সাধারণ কাচ নয়; ভবনের নকশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আধুনিক সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি। দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবনের বিভিন্ন অংশে থাকা সৌরকোষ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। একই সময়ে ভবনের স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তাপমাত্রা, আলো ও বিদ্যুতের ব্যবহারে সামঞ্জস্য রাখে। ভবন থেকে বেরিয়ে মানুষ যখন শহরের ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে, তখন কোথাও কোথাও তাদের চলাচল থেকে অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ সংগ্রহের প্রযুক্তিও কাজ করছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপিত সেন্সর ও স্মার্ট মিটার বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করছে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা অনুমান করছে, কোথায়-কখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে পারে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকলে তা ব্যাটারি বা অন্য কোনো শক্তি-সংরক্ষণ ব্যবস্থায় জমা রাখা হচ্ছে।
এটি কোনো একটি শহরের বাস্তব চিত্র নয়; বরং বর্তমানে বিকাশমান বিভিন্ন প্রযুক্তিকে একত্র করলে ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য স্মার্ট ও টেকসই শহর এমনই হতে পারে। এই শহরের লক্ষ্য হবে শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; বরং বিদ্যুতের অপচয় কমানো, স্থানীয়ভাবে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা।
আধুনিক সভ্যতার অর্থনৈতিক অগ্রগতি দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কলকারখানা, যানবাহন, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিভিন্ন ধরনের ভবনে ব্যবহৃত বিপুল শক্তির একটি বড় অংশ এখনো কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আসে। এসব সম্পদ সীমিত এবং এগুলোর ব্যবহার পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বিপুল কার্বন ডাইঅক্সাইডসহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হয়। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে। তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার বিভিন্ন প্রবণতার সঙ্গে এই উষ্ণায়নের সম্পর্ক রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা। বিশ্বের কোনো অঞ্চলে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। আবার বড় কোনো জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশের নীতি পরিবর্তন কিংবা বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহের ঘাটতির কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যেতে পারে। আমদানিনির্ভর দেশগুলো তখন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির মতো সমস্যার মুখে পড়ে। এমন বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ব জুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে স্মার্ট সিটির ধারণা। সাধারণভাবে স্মার্ট সিটি বলতে এমন নগরব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি, সেন্সর, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন সেবা আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করা হয়। স্মার্ট সিটি শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নগর সম্পদের দক্ষ ব্যবহার। এই ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। কোথায়-কখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, কোন ভবনে কত শক্তি ব্যবহার হচ্ছে, কোথায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা যায়।
স্মার্ট সিটির জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্মার্ট গ্রিড। প্রচলিত বিদ্যুৎ গ্রিড মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। স্মার্ট গ্রিডে এর সঙ্গে যুক্ত হয় উন্নত যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি। এ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবহারের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা যায়। একই সঙ্গে বাড়ি, অফিস বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো ছোট আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী উৎসও গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কোনো ভবনে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব। আবার বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে ব্যাটারি বা অন্য শক্তি-সংরক্ষণ ব্যবস্থা থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যেতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়ে।
শহরে হাজার হাজার আইওটি ডিভাইস ও সেন্সর ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, আলো, ভবনের উপস্থিতি, যানবাহনের চলাচলসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্যান্য উন্নত সফটওয়্যারভিত্তিক ব্যবস্থা বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাস দিতে পারে। কোনো ভবনের একটি অংশ খালি থাকলে সেখানে আলো ও শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকলে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার সাময়িকভাবে কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এ ধরনের প্রযুক্তি বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি পুরোপুরি দূর করতে পারে না। তবে চাহিদা ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুতের অপচয় কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্মার্ট সিটি যদি হয় শহর পরিচালনার প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো, তাহলে তার জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে গ্রিন টেকনোলজি বা সবুজ প্রযুক্তি। সবুজ প্রযুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো এবং নবায়নযোগ্য ও কম কার্বন শক্তির ব্যবহার বাড়ানো। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, শক্তি-সাশ্রয়ী ভবন, ব্যাটারি সংরক্ষণ, বৈদ্যুতিক যান এবং বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন— সবই এর বিভিন্ন অংশ। গত কয়েক দশকে সৌরপ্রযুক্তিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো বিল্ডিং-ইন্টিগ্রেটেড ফটোভোলটাইকস। এ প্রযুক্তিতে ভবনের নকশার অংশ হিসেবেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী উপাদান যুক্ত করা হয়। ভবনের ছাদ বা নির্দিষ্ট জানালার অংশেও সৌরপ্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্মার্ট সিটি ও সবুজ প্রযুক্তির অনেক উপাদান এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পরীক্ষামূলক বা বাস্তব পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অবস্থিত কোপেনহিল একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এটি একটি বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনকারী স্থাপনা। এখানে উপযুক্ত পৌরবর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ এবং জেলাভিত্তিক সরবরাহের জন্য তাপ উৎপাদন করা হয়। আধুনিক পরিশোধন ও নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দূষণ কমানোর চেষ্টা করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাসদার সিটি েটকসই নগর পরিকল্পনার আরেকটি পরিচিত উদাহরণ। সেখানে সৌরবিদ্যুৎ, ছায়া তৈরি করে এমন স্থাপত্য এবং পরিবেশবান্ধব নগর নকশার বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। মরুভূমির উষ্ণ পরিবেশে শক্তির ব্যবহার কমানোর জন্য ভবনের নকশায় প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ও ছায়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে শহরটিকে সম্পূর্ণভাবে নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর বলে দাবি করা সঠিক নয়। এশিয়ার সিঙ্গাপুরেও জমির স্বল্পতার কারণে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন জলাধারে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত জমি ব্যবহার না করেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়। যদিও এর অবদান দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় এখনো সীমিত।
গ্রিন টেকনোলজি ও স্মার্ট জ্বালানি ব্যবস্থা শুধু ধনী দেশের জন্য নয়; উন্নয়নশীল ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
স্মার্ট সিটি ও সবুজ প্রযুক্তির অনেক উপাদান এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পরীক্ষামূলক বা বাস্তব পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে







