দোতনা আর তার মায়ের গল্প

প্রতিকৃতি এঁকেছেন অনন্যা প্রমা
দোতনা একটি ছোট্ট শিশু। মামার সঙ্গে দারুণসব কাণ্ড ঘটায় সে। শুধু গল্পের চরিত্রই নয়; এই নামে সত্যি একজন মানুষও আছে। তার মা আবার তোমাদের জন্য মজার মজার লেখা লিখেছেন। সেই মায়ের লেখার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন আশিক মুস্তাফা
“ছোট্ট মিশুর বয়স তখন পাঁচ কি ছয়। ওরা থাকত পুরোনো ঢাকায়। চমৎকার একটি বাড়িতে। বাড়ির কাছে মস্ত বড় মাঠ, সবুজ ঘাসে ঢাকা। যেন কার্পেট বিছানো। মাঠের মাঝখানে বিরাট একটা বটগাছ। পাড়ার ছেলে-মেয়েরা সারা বিকেল সেই মাঠে খেলা করে। মিশু বারান্দায় দাঁড়িয়ে খেলা দেখে আর বলে, আম্মু মাঠে যাই? ওদের সাথে খেলা করব।
আম্মু বলেন, তুমি এখনো অনেক ছোট। ছোট্ট বাবুদের একা একা মাঠে যেতে নেই, হারিয়ে যাবে। একটু বড় হও, তারপর মাঠে যাবে।
আম্মু ওকে বাড়ির ঠিকানা শেখান। বলেন, ‘যদি কখনো হারিয়ে যাও, ঠিকানা জানা থাকলে ঠিক ঠিক বাড়ি চলে আসতে পারবে।’”
এরপর?
এরপর মিশু মাঠে গিয়েছিল? মাঠে গিয়ে সে কি হারিয়ে গিয়েছিল? তা আমি বলতে পারব না বাপু! তোমরাই পড়ে নাও ‘রিমুর টাট্টু ঘোড়া’ শিরোনামে বইয়ে। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাবাজারের অন্যধারা প্রকাশনী। বলবে এই বই কার লেখা?
তা বলছি। তার আগে বরং এই লেখকের একটা ছড়া পড়ি, চলো—
‘গানের টিচার প্রশ্ন করে
তাল কাহাকে কয়?
খোকন শুধায় তাল নাকি স্যার
অনেক প্রকার হয়?
চুল্কে মাথা বললো খোকন
বুদ্ধি গেছে খুলে
তাকিয়ে দেখুন গাছের আগায়
তাল রয়েছে ঝুলে।
হলফ করে বলতে পারি
তালের প্রকার দুই
টিচার রেগে ধমকে ওঠে
আস্ত গাধা তুই।
খোকন বলে কাঁচা-পাকা
দুই প্রকারের তাল
আজ খেয়েছি কাঁচা কিনে
পাকনা খাব কাল।
তোর মাথাতে গোবর ঠাসা
টিচার দিলো গাল
পরের ক্লাসে আসবি শিখে
ছন্দ এবং তাল।’
মজার না ছড়াটা?
এই মজার ছড়া আর মজার গল্প যিনি লিখেছেন, তার নাম বলছি। তার আগে চলো তার সম্পর্কে একটু জেনে নিই।
তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকার আরমানিটোলায়। বাড়ির পাশেই ছিল আনন্দময়ী গার্লস হাই স্কুল। সেখানেই পড়েছেন। স্কুলের পাশেই ছিল আরমানিটোলা মাঠ। এটিই তবে গল্পের মিশুদের মাঠ? ওই যে, প্রথম যে গল্প পড়েছ, সেই গল্পের মিশুর কথা বলছি আরকি!
আর মিশুটাই কি লেখক?
আচ্ছা, মিশু কি ছেলেদের নাম হয় নাকি মেয়েদের?
সে তোমরা ভাবো। আমি বরং লেখক সম্পর্কে আরেকটু বলি। সেই মাঠে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যেতেন লেখক। আর কথায় কথায় ছড়া বানাতেন। কথাও বলতেন ছন্দ মিলিয়ে। সেই এইটুকুন বয়স থেকে গল্প শুনতে ভীষণ পছন্দ করতেন। বই পেলে তো কথাই নেই; শেষ না করে উঠতেনই না! তাদের বাসায় পত্রিকা রাখা হতো। পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন বাবা। ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় শিশুদের একটি কলাম ছিল। সেখানে শিশুদের লেখা ছাপা হতো। সেইসব লেখা খুব মন দিয়ে তিনি পড়তেন। পড়তে পড়তে নিজেও লিখতে চাইতেন। এই চাওয়া থেকে ছয় কি সাত বছর বয়সে ‘সিংহ মামার বিয়ে’ শিরোনামে একটি ছড়া লিখে ফেললেন। তারপর ‘পাকিস্তানি খবর’ নামে একটি পত্রিকায় পাঠালেন। ১৯৬৮ সালে কবিতাটি প্রকাশও পেয়ে যায়। কেবল তাই নয়; এই প্রথম ছাপা কবিতার জন্য তিনি ১০ টাকা সম্মানীও পেয়ে যান। ভাবতে পারো, এইটুকুন একটা পুঁচকে ছড়া লিখে কী কাণ্ড ঘটিয়ে দিল!
কিছুদিন পর সে সময়ের আলোচিত শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার আসর’ ও ‘চাঁদের হাট’ থেকে তাকে ফোন করে লেখা চান সম্পাদকরা। খোঁজখবরও নিতেন।
তারও পরের, ১৯৬৯ সালের কথা। ছোটদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন। এরই মধ্যে তার শ-দুয়েক লেখা ছাপা হয়ে যায় পত্রপত্রিকায়। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে। তখনো থামাননি লেখালেখি। এরপর ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ বেতার ও ১৯৮৪ সালে বিটিভিতে সংবাদ পাঠ শুরু করেন। এখনো সংবাদ পাঠের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সংবাদ পাঠের পাশাপাশি বিভিন্ন চ্যানেলে উপস্থাপনার দায়িত্বও পালন করছেন। তার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। সেই থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। ১৯৯৭ সালে ‘সাপ্তাহিক মানবজমিন’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক মানবজমিন’-এর সম্পাদক নিযুক্ত হন। তিনি এখনো পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করছেন।
এবার নিশ্চয়ই গুগল করে নাম বের করে ফেলেছ তোমরা? তা করো। তার আগে আরেকটু কথা বলে শেষ করি, এই লেখকের জনপ্রিয় শিশুতোষ বইয়ের সিরিজ ‘দোতনা’। এখানে রয়েছে দোতনা নামের ছোট্টমোট্ট একটা ছেলে আর তার মামাকে ঘিরে দারুণসব গল্প। এই দোতনা আসলে লেখকেরই একমাত্র ছেলে। তার ছড়ার বইগুলোর মধ্যে আছে ‘ছড়ার আকাশ তারায় ভরা,’ ‘ছড়ার দেশে যাই ভেসে’, ‘নতুন ছড়া’, ‘সময় কাটুক ছড়ার সাথে’ ইত্যাদি। তবে তার মজার একটি বইয়ের কথা বলিনি। সেই বইয়ের খোঁজ তোমরা দিও; ঠিক আছে?
যাওয়ার আগে দোতনার মায়ের কথা, মানে লেখকটার কথা বলি। প্রিয় এই লেখকের নাম মাহবুবা চৌধুরী।



