ঢাকার ভূত
মিরপুরের ভূতের ফ্ল্যাট

আঁকা : সোহানুর রহমান
ব্যস্ত শহর ঢাকার বুকে এখনো আছে এমন কিছু বাড়ি, যেখানে রাত নামলেই বদলে যায় পরিবেশ। যুক্তি সেখানে হার মানে। এমনই এক ফ্ল্যাটের গল্প লিখেছেন সোহানুর রহমান
নিজের পরিচয় ও জায়গার নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার এক আপা বলেছিলেন জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়ের গল্প। সদ্য বিয়ে হয়েছিল তাদের। স্বামী সরকারি চাকরির কারণে রংপুরে কর্মরত তখন। দুজনের স্বপ্ন ছিল ঢাকায় নিজেদের একটি ফ্ল্যাট হবে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মিরপুরের একটি নিরিবিলি ফ্ল্যাট পেয়ে গেলেন সাধ্যের মধ্যে। কিনে ফেলতে সময়ও নিলেন না। কিন্তু স্বামী ভদ্রলোককে বেশিরভাগ সময় থাকতে হয় রংপুরেই। ফলে নতুন বাসায় মূলত একাই থাকেন স্ত্রী।
তিনি একটু ভিন্ন স্বভাবের। অন্ধকার পছন্দ করেন। ঘরে সারি সারি বিভিন্ন প্রজাতির ইনডোর গাছ, হালকা আলো। সব মিলিয়ে দিনের বেলায়ও সন্ধ্যার আবহ। আর বেশ সাহসী। তাই একলা এখানে থাকতেও ভয় লাগে না।
একদিন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে ডাইনিংয়ের পাশের ওয়াশরুমের ওপরে ছোট্ট স্টোরেজে কিছু একটা নজর কাড়ল। ভালোভাবে তাকাতেই চমকে উঠলেন। লাল সুতা দিয়ে বাঁধা কয়েকটি হাড়। মানুষ নাকি কোনো প্রাণীর, তা বোঝার উপায় ছিল না। হাড়ে হাত দিতেই হঠাৎ পুরো শরীর অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে, ভারী লাগতে শুরু করে। আতঙ্কে তিনি সেগুলো জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলেন।
আর এটাই যেন ওই নারীর পৃথিবীটা বদলে দিল। দিনে অস্বাভাবিক কিছু ঘটল না। ঘুমাতে গেলেন স্বাভাবিক সময়ে। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। কেন যেন মনে হলো কোনো একটা অস্বাভাবিকতা আছে ঘরে। তারপরই মনে হলো ডাইনিংয়ের পাশের ওয়াশরুমে কেউ গোসল করছে। জগে পানি তুলে বারবার গায়ে ঢালার স্পষ্ট শব্দ। শব্দ থামছেই না। সবিছানা থেকে নেমে পড়লেন। তারপর হেঁটে ওই বাথরুমের সামনে গেলেন। ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে লাইট জ্বালাতেই সব শব্দ মুহূর্তে থেমে গেল।
ওয়াশরুমে কেউ নেই। কিন্তু পুরো মেঝে ভেজা। যেন একটু আগেই কেউ গোসল শেষ করে বেরিয়ে গেছে।
স্বামীকে ফোন করলে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিলেন না। বললেন, ‘মনের ভুল। ঘুমিয়ে পড়ো।’
কিন্তু এরপর প্রায় প্রতি রাতেই একই ঘটনা ঘটতে লাগল। একপর্যায়ে ঠিক করলেন, যা-ই হোক ঘটনা, এর রহস্যভেদ করবেন। রাতে সব আলো নিভিয়ে অন্ধকার ঘরে না ঘুমিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে অন্ধকারে চোখ সয়ে এলো। তারপর যেটা দেখলেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করল না। খাটের নিচ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে কালো কুচকুচে, লম্বাটে, মানুষের মতো একটি অবয়ব। নিঃশব্দে সেটি দরজা পেরিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে চলে গেল। তারপরই আবার শুরু হলো গোসলের শব্দ।
ভয়ে তিনি আর একমুহূর্তও থাকলেন না সেখানে। ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে স্বামীকে ফোন করেন। স্বামীর পরামর্শে রাত কাটান এক সহকর্মীর বাসায়। পরে কয়েক দিন নারায়ণগঞ্জে বাবা-মায়ের বাসা থেকে অফিসে যাতায়াত করতে থাকেন।
কয়েক সপ্তাহ পরের কথা। সেদিন প্রবল বর্ষণ ঢাকা শহরে। আটকে গেলেন ওই নারীও। যখন কিছুটা ধরে এলো তখন রাত হয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জে যাওয়া সম্ভব নয়। কী আর করা! ফ্ল্যাটের চাবি সঙ্গে ছিল। সেখানেই চলে এলেন দ্বিধা কাটিয়ে।
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, সেদিন পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। সিঁড়িতে পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনাকে তো অনেক দিন দেখি না। অথচ আপনার বাসা থেকে প্রায়ই চলাফেরার শব্দ পাই।’ কথাটা শুনে তিনি আর কিছু না বলে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়লেন। দরজা খুলতেই দেখলেন ধুলোর আস্তরণ জমেছে সর্বত্র। মেঝেতে অদ্ভুত পায়ের ছাপ। কোথাও আবার আগরবাতি পুড়ে শেষ হলে যেমন কালচে গুঁড়া পড়ে থাকে, তেমন দাগ। কিছুই গায়ে না মেখে একটি বড় মোমবাতি জ্বালিয়ে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।
রাতের কোনো একসময় তীব্র ব্যথায় ঘুম ভাঙল। মনে হচ্ছে, পায়ের ওপর কেউ বিশাল ভারী কিছু চাপিয়ে রেখেছে। চোখ খুলে দেখলেন, মোমবাতি অনেক আগেই নিভে গেছে। বাইরে ঝড় থেমেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি। সেই ক্ষণিক আলোয় যা দেখলেন তাতে বুক কেঁপে উঠল। পায়ের ওপর বসে আছে কালো একটা কিছু। অনেকটা সেদিন যে অবয়বটাকে খাটের নিচ থেকে ছুটে যেতে দেখেছিলেন সেটার মতো।
চোখ দুটি অস্বাভাবিক সাদা। কখনো তার দিকে, কখনো ডাইনিংয়ের দিকে তাকাচ্ছে। ভয়ে চিৎকার করতেই সেটি এক লাফে নেমে ডাইনিংয়ের দিকে ছুটে গিয়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়েই তিনি আবার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে স্বামীকে ফোন দিয়ে প্রচণ্ড রাগারাগি করলেন। কেন তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে ফ্ল্যাটটির বিষয়ে খোঁজখবর নেননি সেজন্য।
এবার স্বামী বিষয়টি গুরুত্ব দিলেন। পরদিনই ছুটি নিয়ে রংপুর থেকে ঢাকায় চলে এলেন। স্ত্রী আর কোনোভাবেই ফ্ল্যাটে ফিরতে চাইছিলেন না। কিন্তু স্বামী নিজে সব দেখে নিশ্চিত হতে চাইলেন। সেই রাতে দুজনে ফ্ল্যাটে থাকলেন। ডাইনিংয়ের একটি লাইট জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
গভীর রাতে স্বামীর ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলো। ইচ্ছে করেই তিনি শোবার ঘরের অ্যাটাচড ওয়াশরুমে না গিয়ে সেই ডাইনিংয়ের পাশের ওয়াশরুমে ঢুকলেন।
সবকিছু স্বাভাবিকই লাগছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে হঠাৎ পুরো ওয়াশরুম অন্ধকার হয়ে গেল। যেন বাইরে থেকে কেউ সুইচ বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি ভেবেছিলেন স্ত্রী মজা করছেন। কয়েকবার ডাকলেন। কোনো উত্তর নেই।
ঠিক তখনই তার মনে হলো, কমোডের পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অদৃশ্য সেই উপস্থিতি যেন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুহূর্তেই ভয় পেয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। রুমে এসে দেখলেন, স্ত্রী গভীর ঘুমে। আর একমুহূর্তও সেখানে থাকেননি তারা।
পরদিন এক হুজুরকে নিয়ে গেলেন ফ্ল্যাটে। সব ঘর, বারান্দা, ওয়াশরুম ঘুরে দেখলেন তিনি। তারপর চিন্তিত কণ্ঠে বললেন, ‘এখানে আপনারা দুজন ছাড়াও আরও উপস্থিতি আছে। এ ফ্ল্যাটে কয়েকশ জিনের বসবাস। এটি তাদের চলাচলের জায়গা। তাদের সরানো প্রায় অসম্ভব। আপনারা যদি থাকতে চান, তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই থাকতে হবে। না হলে ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যান।’
কিন্তু ফ্ল্যাটটি কিনতে তাদের সঞ্চয়ের বড় অংশ খরচ হয়েছিল। আবার অন্য কাউকে বিক্রি করলেও সে বিপদে পড়তে পারে— এ অপরাধবোধও কাজ করছিল। শেষ পর্যন্ত তারা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনার পর কয়েক কেটে গেছে। আজও সেই নারী একই ফ্ল্যাটে থাকেন। একইভাবে অল্প আলো, ইনডোর গাছে ভরা, অন্ধকারে মোড়া নিজের ঘরে।
অনেক দিন পর তার সঙ্গে আবার দেখা হলে জানতে চেয়েছিলাম, ‘এখনো কি কিছু দেখেন?’
তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘মাঝেমধ্যে শব্দ শুনি। মনে হয় কেউ সামনে দিয়ে চলে গেল। কিন্তু আমি আর খেয়াল করি না। কারণ আমি বুঝে গেছি, যতক্ষণ তুমি ওদের গুরুত্ব দেবে না, ওরাও তোমাকে ততটা বিরক্ত করবে না।’




