হঠাৎ ঝড়ের আগন্তুক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘটনাটি আমার নয়, আমার কাজিন আকিবের। বর্তমানে মাস্টার্স শেষ করে ঢাকায় একটি করপোরেট অফিসে চাকরি করছি। তার থেকে এটি শোনার পর এতটাই মোহিত হয়ে পড়ি যে, লেখার লোভ সামলাতে পারিনি। তার জবানিতেই লিখলাম—
ডিসেম্বর ২০১২, তখন আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কামারচর গ্রামে আমার বাড়ি। গ্রামের বাজারে বাবার একটি ছোট্ট ইলেকট্রিকের দোকান ছিল। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার শরীর বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি প্রতিদিন দোকানে বসতে পারতেন না। তাই আমিও মাঝেমধ্যে দোকানে বসতাম।
বাজারের রাস্তার দুপাশে ছোট-বড় মিলিয়ে কম করে হলেও ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটার মতো দোকানপাট ছিল। প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে গ্রামের মানুষের মিলনমেলা বসত। বাজারের পশ্চিম দিকে ছিল একটি প্রাইমারি স্কুল। স্কুলের সামনের ছিল বিশাল এক মাঠ। সেই মাঠে ডালপালা ছড়িয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে ছিল বহু বছরের পুরনো একটি বটগাছ। আর স্কুলের পাশে ছিল একটি মসজিদ। রাস্তার ওপাশে বেশ একটি পুরনো পুকুর। বিশাল সেই পুকুরের দুই পাড় জুড়ে ছিল অসংখ্য শতবর্ষী আমগাছ। ডালপালাগুলো এতটাই ছড়ানো যে, দিনের বেলাতেও সেখানকার মাটিতে সূর্যের আলো ঠিকমতো পড়ত না।
তখন রাত ৯টা-১০টার মধ্যেই জনশূন্য হয়ে পড়ত পুরো বাজারটা। রাতে খুব কম মানুষই এদিকে আসত। কেউ কেউ বলত, নিশিরাতে পুকুরপাড় থেকে অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসে। আবার কারও মুখে শুনেছি, গভীর রাতে নির্জন রাস্তা দিয়ে পরিচিত মানুষজনের বেশ ধরে কাউকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। আমি এসব কথা শুনে কখনো ভয় পেতাম না। কিন্তু একদিন এক অদ্ভুত রাত আসে আমার জীবনে। তারপর আমার সব সাহস পুরোপুরি উবে যায়।
বাজারের বিভিন্ন দোকানের দরজা কিংবা চাল কেটে মালপত্র চুরি হতো দেখে পাহারা দেওয়ার জন্য সব দোকানদার মিলে মাসিক বেতনে একজন প্রহরী রেখে ছিল। প্রতি রাতে দোকানদারদের মধ্য থেকে যেকোনো একজন প্রতিনিধি হিসেবে থাকত সেই প্রহরীর সঙ্গে।
এক রাতে আমাদেরও পালা এলো পাহারা দেওয়ার। আব্বা অসুস্থ বলে আমাকেই দায়িত্ব নিতে হলো। প্রহরী চাচার বয়স অনেক বেশি, প্রায় ষাটের কাছাকাছি তো হবেই। সেই রাতে ৯টা-১০টার দিকে একে একে বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল।
পুকুরের বড় বড় গাছগুলো এমনভাবে নড়ছে, যেন তার ওপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে
আমরা দুজন বাজারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কয়েকবার হেঁটে এলাম। রাত যত গভীর হলো, চারপাশ ততই নিস্তব্ধ হয়ে এলো। আমরা দুজন বাজারের দুদিক থেকে হেঁটে এসে একটি বন্ধ দোকানের সামনে বসে কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করলাম। অনেকক্ষণ পর ঘড়িতে সময় দেখলাম, রাত ২টা পেরিয়েছে। এ সময় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে চাচা মাঠের দিকে চলে গেলেন। তখন আমি একা গিয়ে বসেছি একটি বেঞ্চের ওপরে।
পুকুরপাড়ের ঝোপঝাড় শত শত জোনাকি পোকার আলোয় জ্বলজ্বল করছিল আর চারপাশের আমগাছগুলো থেকে নিশাচর ঝিঁঝি পোকার অবিরাম ডাক ভেসে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন পুরো দৃশ্যপট পাল্টে গেল। চোখের পলকে সমস্ত জোনাকির আলো একযোগে নিভে গেল। মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল ঝিঁঝি পোকার ডাকটাও। পুরো বাজার আর এর চারপাশের পরিবেশ এক ভারী ও দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
হঠাৎ লক্ষ করলাম, রাস্তার ওপারে, মসজিদের পাশের পুকুরের গাছগুলো কেমন যেন অস্বাভাবিকভাবে দুলছে। বড় বড় গাছ এমনভাবে নড়ছে, যেন তার ওপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে চারপাশে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু কোথায় ঝড়? আমার গায়ে তো বাতাস লাগছে না। এমনকি রাস্তার অপর পাশে থাকা আমগাছগুলোর পাতাও প্রায় স্থির। একই রাস্তার দুই পাশে গাছপালা। অথচ মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, এক পাশের গাছগুলো ঝড়ের কবলে নড়ছে, অথচ অন্য পাশের গাছগুলোর পাতাও যেন নড়তে চাইছে না।
মসজিদের পুকুরের পাশের গাছগুলো তখনো প্রচণ্ড ঝাপটায় দুলছে। কয়েকটি গাছের মোটা ডালও ভেঙে পড়বে বলে মনে হচ্ছিল। আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল! মনে হলো, মসজিদের পাশের ওই পুকুরের ভেতর থেকে কিছু একটা উঠে আসতে চাইছে। আমি বেঞ্চটা ফেলে রেখেই দৌড়ে মাঠের দিকে ছুটলাম।
‘চাচা! চাচা!’
চিৎকার শুনে তিনি দৌড়ে এলেন। কাছে এসে আমার অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হইছে?’
কাঁপা কাঁপা হাতে চাচাকে পুকুরের দিকে আঙুল তুলে দেখালাম।
‘ওই যে! ওই পুকুরের গাছগুলা... কীভাবে কাঁপছে দেখেন!’
তিনি গাছগুলোর দিকে অদ্ভুতভাবে চেয়ে রইলেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই দেখলাম, মসজিদের পাশের পুকুরের গাছগুলোর সেই অস্বাভাবিক দুলুনি হঠাৎ করে থেমে গেছে।
চাচা আমার দিকে তাকিয়ে তারপর আস্তে করে বললেন— ‘তুমি কোন জায়গায় বসছিলা? নিশ্চয়ই রাস্তার মধ্যখানে?’
‘জি, ঐ বেঞ্চটায় বসছিলাম।’
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। এহন আমার লগে থাকো।’
তারপর আমার এক হাত ধরে টেনে নিয়ে রাস্তার এক পাশে দাঁড় করালেন।
কয়েক সেকেন্ড পরেই ঘটল এক বিস্ময়কর ঘটনা। চারপাশে কোথা থেকে যেন হালকা সাদা ধোঁয়া বের হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, যেন ভোরের কুয়াশা। হঠাৎ করেই আমরা দেখলাম, বাজারের পশ্চিম দিক থেকে একজন মানুষ হেঁটে আসছেন।
লোকটির পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা। ধীর পায়ে তিনি এগিয়ে আসছেন। তার মাথা সামান্য নিচু। আরও কয়েক পা এগিয়ে আসতেই আমি তাকে চিনতে পারলাম। আমাদের গ্রামের সবুজ কাকা! বাজারের ভেতরেই তার পান-সুপারির দোকান আছে। বেশভূষার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, তিনি অনেক দূর থেকে এসেছেন। গভীর রাতে হঠাৎ তিনি এদিকে কেন আসছেন?
আমি চাচার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি লোকটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
সবুজ কাকা আমাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। চলে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি বিষয় খেয়াল করলাম। তিনি হাঁটছেন, অথচ তার পায়ের কোনো শব্দই শোনা যাচ্ছে না। নিস্তব্ধ রাতের এই পরিবেশে রাস্তা দিয়ে যখন কেউ হেঁটে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পায়ের জুতার শব্দ হলেও শোনা যাওয়ার কথা।
যখন তিনি আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, কয়েকবার ডাক দিলাম। সবুজ কাকা! সবুজ কাকা! কিন্তু লোকটি আমার ডাকের কোনো জবাব দিলেন না। কী এমন হলো যে তিনি কিছু না বলেই আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন?
আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, লোকটি পুকুরের কাছে যাচ্ছেন। আমি প্রহরী চাচার দিকে তাকালাম। দেখলাম, চাচা সবুজ কাকাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে দেখেই যাচ্ছেন। আর লোকটি ততক্ষণে রাস্তার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। সেখান থেকে পুকুরের পাশ দিয়ে একটি সরু পথ চলে গেছে সোজা স্কুলের দিকে। এই পথের দুই পাশেই ঝোপঝাড় আর কয়েকটি শতবর্ষী আমগাছ আছে। ধীর পায়ে তিনি সরু পথটা ধরে এগিয়ে চলতে চলতে পুকুরের পাশের অন্ধকারে গিয়ে হারিয়ে গেলেন।
এরপর আমি চাচাকে বললাম, উনি কি সত্যি আমাদের সবুজ কাকাই ছিলেন?
এবার চাচা আমার দিকে তাকিয়ে বলা শুরু করলেন।
‘এগুলা তো আর নতুন কিছু না বাজান। তয় ভয় পাওনের কিচ্ছু নাই। তুমি যদি তার ক্ষতি না করো, হেও তোমার কোনো ক্ষতি করত না। তয় সাবধানে থাকা লাগব।’
এই বাজারটা বহুত পুরান। আগে তো আমরা এই জায়গায় দিনের বেলায় আইতেও ডরাইতাম। এই পুকুরঘাটে উল্টাপাল্টা অনেক কিছুই ঘটছিল। এহন এদি দেখলে আর ডর করে করে না, সইয়া গেছে সব।’
আমি তড়িঘড়ি বললাম—
‘তাহলে গাছের ডালগুলো কেন কাঁপছিল?’
চাচা এবার আমার দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন—
‘তোমারে সরাইয়া দেওয়ার লাইগা। তুমি তো বুজবার পারতাছিলা না, তাই গাছপালা দিয়া ইশারা দিতাছিল।’
চাচার কথাগুলো শুনে জিজ্ঞেস করলাম—
‘আমি যদি তখন সেখান থেকে না সরতাম?’
চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিচু গলায় বললেন—
‘তাইলে হয়তো আজকে তোমার লগে আরও খারাপ কিছু হইত।’



