অতিপ্রাকৃত
আতরের সুবাস

আঁকা : সোহানুর রহমান
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর এক ব্যস্ত এলাকার তুলনামূলক নিরিবিলি গলির গল্প এটি। ঘটনাটি যার কাছ থেকে শোনা, তিনি সেই পরিবারের ছোট মেয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সুবাদে সাধারণত থাকতেন ক্যাম্পাসে। পরিবারের তিন সদস্য— বাবা, মা ও বড় বোন ওই বাসায় থাকতেন। বাবা সরকারি চাকরি করায় দিনের বেশিরভাগ সময় তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। ফলে সারা দিন মা আর বড় বোনকেই কাটাতে হতো সেই ফ্ল্যাটে। বড় বোনের মানসিক সমস্যা ছিল। দিন দিন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় সেটা যে পরিবারটি বিশ্বাস করতে শুরু করে, তার ওপর অস্বাভাবিক কিছুর প্রভাব আছে। সে প্রায়ই একা চুপচাপ বসে থাকত এবং অস্পষ্ট স্বরে কী যেন বিড়বিড় করত।
ঘরের ভেতর আটকে রাখা যেত না তাকে। দরজা বাইরে থেকে লক করা থাকলেও গভীর রাতে নিচতলায় নামার সিঁড়িতে মাঝেমধ্যে তার দেখা মিলত। চুল এলিয়ে সিঁড়ির এক কোণে চুপচাপ বসে থাকত। পাশ দিয়ে কোনো ভাড়াটিয়া বা প্রতিবেশী যাওয়ার সময় শুনতে পেত তার সেই চিরচেনা বিড়বিড় শব্দ।
এর পর এলো সেই অভিশপ্ত দিন। সেদিন বাবা ও মা দুজনে মিলে কিছু কেনাকাটার জন্য বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তারা দেখেন, ঘরের দরজা ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ। বহু ডাকাডাকি ও নক করার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। শেষ পর্যন্ত দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই আঁতকে উঠে আবিষ্কার করলেন, ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে বড় মেয়ের নিস্পন্দ দেহ। মরদেহ নামানোর পর তা রাখা হলো নিচতলার গ্যারেজের একটি নির্দিষ্ট কর্নারে, যেখানে দারোয়ান রাতে একটি চৌকি পেতে ঘুমায়। সেখানেই গোসল করানো হয় মরদেহ এবং খাটিয়ায় তোলা হয়। আর ঠিক সেই রাত থেকেই শুরু হয় নতুন এক অলৌকিক ও লোমহর্ষক অধ্যায়।
যে সিঁড়িতে বসে ওই মেয়েটি বিড়বিড় করত, সেই সিঁড়ি দিয়ে রাতে যারাই উঠছিল, সবার মনে হচ্ছিল, ঠিক পিছু পিছু অদৃশ্য কেউ একজন হেঁটে আসছে বা সিঁড়ির কোণে ওত পেতে বসে আছে বলে মনে হলো। সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতাটি হয়েছিল সেই দারোয়ানের। যেখানে মরদেহটি রাখা হয়েছিল, ঠিক তার পাশেই চৌকিতে সে শুয়েছিল। ভয়ে বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল ওই খালি কর্নারের দিকে। গভীর রাতে হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে যায়। সে অনুভব করে, বাতাসে তীব্র আগরবাতি আর আতরের সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে। বুক কাঁপানো ভয়ে সে চোখ মেলে তাকায় এবং দেখে— সে যে কাপড় টাঙিয়ে রেখেছিল, ঠিক তার ওপাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে এবং সেখান থেকেই আসছে ওই তীব্র সুগন্ধ। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে সামান্য উঁকি দিয়ে দেখে, সেখানে কেউ নেই। কিন্তু মেঝেতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ঠিক একটু আগেই কেউ যেন সেখানে একগুচ্ছ আগরবাতি জ্বেলে রেখে গেছে এবং তার ধোঁয়া বাতাসে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে।
পরের রাতে ঠিক আগের মতো তার মনে হলো, কেউ একজন তার ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, মানুষের আকৃতির ভয়ংকর এক ছায়া। আর সহ্য করতে না পেরে সে কাপড় সরিয়ে তাকাতেই মাঝরাতে এক বিকট আর্তনাদ দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। তার চিৎকারে বাড়ির সবাই ছুটে এসে মাথায় পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরায়।
চোখের দৃষ্টি অন্ধকারে সয়ে আসতেই দেখতে পেল, তার মৃত বোনের বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে একজন শুয়ে আছে
আত্মীয়স্বজন চলে যাওয়ার পর বাড়িতে আবার সেই তিন সদস্য— বাবা, মা আর ছোট বোন একা হয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতা কাটতে না কাটতেই একদিন ছোট বোন এক অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হয়। সে লক্ষ করে, মৃত বোনের বন্ধ থাকা রুমটির দরজার নিচ দিয়ে কাফনের সাদা কাপড়ের মতো কিছু একটা বেরিয়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে আরও বেশি হতভম্ব করে দিয়ে ভেতর থেকে অদৃশ্য কেউ এক টানে সেই কাপড়টুকু ভেতরে টেনে নিয়ে গেল। তাৎক্ষণিকভাবে সে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখল, রুমটি সম্পূর্ণ শূন্য।
কয়েক দিন পরের ঘটনা। তীব্র ঝড়-বৃষ্টির শব্দ আর অন্ধকারের মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল ছোট বোনের। গলা শুকিয়ে যাওয়ায় পানি খাওয়ার জন্য ডাইনিং স্পেসে আসে। ঠিক তখনই মৃত বোনের রুম থেকে ভেসে এলো এক অদ্ভুত শব্দ— খস খস খস খস! মনে হচ্ছিল, কেউ তার পায়ের গোড়ালি মেঝেতে জোরে জোরে ঘষছে। শব্দটির উৎস খুঁজতে খুঁজতে সে যখন সেই রুমের সামনে পৌঁছাল, দেখল দরজাটা সামান্য ভেজানো। সাহস করে দরজাটা একটু ঠেলে ভেতরে তাকাল। চোখের দৃষ্টি অন্ধকারে সয়ে আসতেই সে দেখতে পেল, তার মৃত বোনের বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে কেউ একজন শুয়ে আছে। মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে লম্বা লম্বা চুল। মুহূর্তের মধ্যে সেই অবয়ব শোয়া থেকে সোজা হয়ে বসে পড়ল। আবছা অন্ধকারেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তার গলার চারপাশে সেই ফাঁসির দাগ! সে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে মা-বাবাকে ডাক দেয়। তারা এসে রুম তল্লাশি করে কাউকে পেল না, শুধু মেঝের ওপর পড়ে ছিল থোকা থোকা লম্বা চুল।
এই ঘটনার পর পরিবারটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তারা এই ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যাবে। নতুন বাসা ঠিক হতে দু-একদিন সময় ছিল। আর ঠিক চলে যাওয়ার আগের দিন দুপুরের দিকে সেই মৃত বোনের রুমে জিনিসপত্র গোছাতে যান তাদের মা। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে সেই বিছানাতেই একটু শুয়ে পড়েন। হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড চাপ ও ব্যথায় তার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে তিনি যা দেখলেন, তাতে তার বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। পুরো ঘর অন্ধকার। আর ঠিক তার বুকের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই মৃত মেয়েটি! অবিকল তার সেই চেনা অবয়ব, কিন্তু শরীরটা যেন আরও দীর্ঘ আর চুলগুলো এলোমেলো। ওটা তার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে এপাশ থেকে ওপাশে দুলছিল। ভয়ে মায়ের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না, তিনি মনে মনে শুধু দোয়া পড়তে লাগলেন। ঠিক তখনই একটা ভারী শব্দে সেই সত্তাটি বুক থেকে বিছানার একপাশে ছিটকে পড়ে গেল। পরদিনই সেই বাসা ছেড়ে চলে যান তারা।





