ভুতুড়ে মাঠ ও অভিশপ্ত কুয়া

অলংকরণ: সোহানুর রহমান
রাজশাহী শহরের উপকণ্ঠে, পদ্মা নদীর কাছাকাছি এক এলাকায় রয়েছে একটি পুরনো মাঠ। ধরা যাক, সেই মাঠের নাম ‘ভাঙা মাঠ’। কথিত আছে, বহু বছর আগে এই মাঠের এক কোণে একটি পুরনো কুয়া ছিল, যা এখন মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। ওই কুয়াকে ঘিরেই স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় কিছু অদ্ভুত ও গা ছমছমে গল্প। লিখেছেন লুৎফুল কায়সার
মাঠটি দিনের বেলা একেবারেই সাধারণ। বিকালবেলা আশপাশের ছেলেরা এসে ফুটবল খেলে, বয়স্করা হাঁটতে আসেন, বাচ্চারা ঘুড়ি ওড়ায়। দোকানিরা মাঠের কোণে বসে চা বিক্রি করেন, স্কুল-কলেজফেরত ছেলেমেয়েরা আড্ডা দেয়। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই এর চেহারা যেন বদলে যায়। স্থানীয় বয়স্করা বললেন, মাগরিবের আজানের পর কেউ ওই মাঠের দিকে যেতে চায় না, বিশেষ করে মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোণ দিয়ে, যেখানে নাকি ওই পুরনো কুয়াটা ছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের চারপাশের গাছগুলোও যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে যায়, বাতাসে একধরনের অস্বাভাবিক ভারী নীরবতা নেমে আসে বলে অনেকে দাবি করেন।
গল্পটা শুরু হয় প্রায় ৪০ বছর আগে। তখন ওই এলাকা এতটা জনবহুল ছিল না, চারপাশে ছিল ধানক্ষেত আর ফাঁকা জমি। মাঠের পাশেই থাকত এক পরিবার, যাদের একটা মাত্র মেয়ে ছিল, নাম রহিমা। শোনা যায়, রহিমা একদিন সন্ধ্যাবেলা পানি আনতে গিয়েছিল ওই কুয়ার কাছে। আর সেদিনই সে নিখোঁজ হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাকে আর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করে, সে কুয়াতে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কুয়াটি এতটাই গভীর ছিল যে, তার দেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। রহিমার মা-বাবা বহু বছর ধরে মেয়ের অপেক্ষায় ছিলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, যদি মেয়ে ফিরে আসে— এই আশায়। কিন্তু তারাও একে একে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান আর রহিমার গল্পটা রয়ে যায় শুধু মুখে মুখে।
মেয়েটি হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই নাকি শুরু হয় অদ্ভুত সব ঘটনা। রহিমার মা বলতেন, সন্ধ্যাবেলা তিনি মাঠের দিক থেকে তার মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেতেন, যেন কেউ পানি চাইছে। প্রথমদিকে সবাই ভাবত, এটি শোকে কাতর মায়ের মনের ভুল। কিন্তু ধীরে ধীরে আরও অনেকে একই অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেন। প্রতিবেশীরা একে একে জানাতে থাকেন, সন্ধ্যার পর মাঠের কাছ দিয়ে গেলে তারাও যেন কারও ক্ষীণ কান্নার শব্দ শুনতে পান।
একজন প্রবীণ ব্যক্তি, যিনি এখনো ওই এলাকায় থাকেন, তার এখানে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তিনি তখন কিশোর, এক রাতে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে মাঠ পার হচ্ছিলেন। মাঠের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই শুনতে পান কারও কান্নার শব্দ, একদম মেয়েলি গলায়, ‘পানি দ্যাও, আমার পিপাসা ল্যাগেছে,’ বলে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো আশপাশে কেউ আছে; কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পাননি। তার মনে আছে, সেই মুহূর্তে বাতাস একদম থেমে গিয়েছিল, আর হঠাৎ করেই প্রচণ্ড ঠান্ডা অনুভব করেছিলেন তিনি, যদিও সেটি ছিল গ্রীষ্মের এক রাত। তার পায়ের নিচের মাটিও যেন হঠাৎ নরম হয়ে ভিজে উঠেছিল। ভয়ে তিনি দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসেন। তার পরদিন প্রচণ্ড জ্বরে পড়েন, যা প্রায় এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল।
এক রিকশাচালক নিয়মিত রাতে ওই মাঠের পাশ দিয়ে যাতায়াত করতেন। এক রাতে তিনি দেখেন, মাঠের মাঝখানে সাদা কাপড় পরা এক নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, মাথা নিচু করে, যেন কিছু খুঁজছে। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো মহিলা বিপদে পড়েছেন, তাই রিকশা থামিয়ে তার দিকে এগিয়ে যান। কিন্তু যতই তিনি কাছে যান, ততই সেই মূর্তি যেন দূরে সরে যেতে থাকে। একসময় তিনি লক্ষ করেন, মূর্তিটার পা নিচের মাটি স্পর্শ করছে না, সে যেন শূন্যে ভাসছে। এই দেখে তিনি রিকশা ফেলেই দৌড় দেন। এর পরে আর কখনো রাতে তিনি ওই পথ দিয়ে যাননি।
মাঠের পাশে বহু বছর ধরে চা বিক্রি করেন এক বৃদ্ধ দোকানি। বৃদ্ধের ভাষ্যমতে, প্রায় ১০ বছর আগে এক শীতের রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে তিনি মাঠের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ মনে হয়, কেউ যেন তার পেছন পেছন হাঁটছে। পেছন ফিরে তাকাতেই তিনি দেখেন, কিছুটা দূরে অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি স্থির দাঁড়িয়ে আছে, তার দিকেই তাকিয়ে। ভয়ে তিনি জোরে হাঁটতে শুরু করেন। যতই তার পা দ্রুত চলতে থাকে, ততই মনে হয় সেই ছায়ামূর্তিও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে, অথচ কোনো পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। কাদের চাচা বললেন, বাড়ির দরজায় পৌঁছেই তিনি পেছনে তাকিয়ে দেখেন, ছায়াটা যেন হঠাৎ বাতাসে মিলিয়ে গেছে। এর পর থেকে তিনি আর কখনো রাত করে দোকান বন্ধ করেননি।
মাঠ নিয়ে আরেকটি কথাও প্রচলিত আছে এলাকায়। বলা হয়, বর্ষাকালের শুরুতে... যখন প্রথম বৃষ্টি নামে, তখন নাকি ওই কুয়ার জায়গাটায় সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। কেউ কেউ বলেন, সে সময় মাঠের মাটি থেকে হালকা ভেজা মাটির গন্ধের বদলে একধরনের অচেনা ও তীব্র গন্ধ পাওয়া যায়, যা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কিন্তু যে একবার পায়, সে কখনো ভুলতে পারে না। স্থানীয় কিছু মানুষ এই সময়টাতে বিশেষভাবে সতর্ক থাকেন এবং সন্ধ্যার পর মাঠ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন নতুনদের।
সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটে কয়েক বছর আগে, যখন ওই মাঠে একটা কমিউনিটি সেন্টার বানানোর পরিকল্পনা করা হয়। মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হতেই শ্রমিকরা অদ্ভুত সব সমস্যায় পড়তে থাকেন। যন্ত্রপাতি হঠাৎ অকেজো হয়ে যেত, রাতের বেলা পাহারাদাররা অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পেত, এমনকি একজন শ্রমিক দাবি করে, সে মাটির নিচ থেকে একটা পুরনো কলসি খুঁজে পায়, যেটাতে হাত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সারা শরীর কাঁপতে শুরু করে আর সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফেরার পর সে বলেছিল, কলসিটা ধরার পর তিনি এক নারীকণ্ঠের ফিসফিসানি শুনতে পেয়েছিলেন। এ ঘটনার পর নাকি নির্মাণকাজ কিছুদিনের জন্য বন্ধও রাখা হয়েছিল। পরে কাজ আবার শুরু হলেও শ্রমিকদের অনেকে রাতে ওই এলাকায় থাকতে রাজি হননি।
আজও স্থানীয় ছেলেরা মাঝেমধ্যে সাহস পরীক্ষা করতে রাতের বেলা ওই মাঠে যায়। কেউ কেউ ফিরে এসে স্বাভাবিকভাবেই বলে, ‘কিছুই ঘটেনি, সব ফালতু কথা!’ কিন্তু কেউ কেউ বলে, মাঠের নির্দিষ্ট এক জায়গায় গেলে হঠাৎ শরীর ভারী হয়ে আসে, যেন কেউ পেছন থেকে টেনে ধরছে। কেউ কেউ আবার দাবি করে, মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলতে গেলে অদ্ভুত এক সাদা ছায়া ধরা পড়ে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। যারাই এই মাঠের কাছাকাছি বড় হয়েছেন, তারা প্রায় সবাই স্বীকার করেন যে ছোটবেলায় এই গল্প শুনে তারাও কখনো একা সন্ধ্যার পর মাঠ পার হওয়ার সাহস করেননি।



