চা বাগানের অশরীরী
ছায়ামূর্তি

আঁকা : ফারজিন
চা বাগানের ম্যানেজার সজল ইবাদ আবারও পাঠকের সামনে হাজির হয়েছেন বাগানের অতিপ্রাকৃত ও ব্যাখ্যাতীত সব ঘটনার ঝাঁপি নিয়ে
সালটা ছিল ১৯৯৫। স্থান মনিপুর চা বাগান, একদম ফেঞ্চুগঞ্জের সার কারখানার পাশেই। আমি যে বাংলোতে থাকতাম, সেটি একসময় ছিল ডিসপেনসারি। মানে চা বাগানের ছোট হাসপাতালের মতো, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হতো। চা বাগানে ঠিক ওই রকম বাংলো আর ছিল না।
আমাকে আগেই চৌকিদার সতর্ক করে বলেছিল, ‘স্যার, এখানে খারাপ জিনিস আছে। আগের সাহেবের বউও পস্তাইছে, চিল্লাইছে। সত্যি খারাপ জিনিস।’ তবে আমি তেমন পাত্তা দিলাম না তার কথায়।
সাতটা দিন ভালোই গেল। অষ্টম দিনে গভীর রাতে পাশের রুমে শুনতে পেলাম, বড় বোতল থেকে পানি ঢাললে যে শব্দগুলো হয়, ঠিক সে রকম শব্দ— টপ, পক পক পক পক পক টপ টপ! একটু বিরতি দিয়ে আবার শুরু হলো— টপ, টপ, টপ টপ টপ টপ টপ টপ।
তখনই আমার সেই চৌকিদারের কথা মনে পড়ল। খারাপ কিছু আছে। পাশের রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি, কোনো শব্দ নেই। সেখানে ছিল একটা আলনা, কিছু পুরনো জুতা, একটা ক্যাম্প খাট; ক্যানভাস কাপড়ের খাট, এই আর কী, ভাঙাচোরা খাট। আবার বেডরুমে এলাম। তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম। তখনই শুরু হলো টপ টপ টপ টপ টপ টপ শব্দ।
গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখি, আমার মাথার পাশে ছায়ার মতো লম্বা একটা মানুষ! এটা পুরুষ, না মহিলা— বুঝতে পারলাম না; চুলগুলো অনেক লম্বা। আমি তো ভয়ে ঘামছি। ডানে তাকাই, বাঁয়ে তাকাই। আমি চাচ্ছি না মানুষটা দেখতে, আমার শরীর ঘামছে। হঠাৎ করে চিৎকার দিলাম, ‘অর্জুন! অর্জুন! অর্জুন!’ সে কী ভয়ংকর চিৎকার!
চৌকিদার দৌড়ে এসে বলে, ‘জি স্যার! জি স্যার!’
সকালবেলা শুনেছি, এটা যখন হাসপাতাল ছিল, এখানে প্রায় সময় রোগী মারা যেত কলেরায়। তখন কলেরা ছিল বাগানে, গুটি বসন্ত। কেউ কেউ বলে, কলেরায় মারা যাওয়াদের আত্মার প্রভাব থাকতে পারে বাংলোটায়।
১৯৭২ সাল। এটি আমার এক বসের কাছ থেকে শোনা, তার নাম ছিল ফারুক আহমেদ খান। এখন আর বেঁচে নেই। ঘটনার স্থান শ্রীমঙ্গলের মৌলভী চা বাগান। তখন আশ্বিন মাস, মানে দুর্গাপূজা শুরু হবে। হালকা হালকা বৃষ্টি, হালকা গরম, শেষ রাতে ঠান্ডা— এ রকম একটা পরিবেশ। তো, ফারুক সাহেব একাই থাকতেন, তখন বিয়ে করেননি। খুব ভয় পেতেন তিনি। নিজেই বলতেন, ‘আমি অশরীরী আত্মা, এগুলো ভয় পেতাম।’ ফলে নিরঞ্জন নামে একজন চৌকিদারকে তার বেডরুমের পাশে রাতে ঘুমাতে হতো।
একদিনের কথা। গভীর রাত। চারদিকে সুনসান, টিলার ওপর একটা বাংলোটায় ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিশাল বড় একটা হাত তার বুকের মধ্যে চাপ দিয়ে ধরল, নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। হাতভর্তি লোম! ফারুক সাহেব আমাকে বললেন, ‘কথা বলা বা চিৎকারও করতে পারতেছি না। ওই লোকটা পাশে এসে শুয়ে পড়ল। শোয়ার পর আবারও বুকের মধ্যে হাত রাখল। তার বিকট চেহারা! চোখ দিয়ে মনে হয় টর্চের মতো আগুন বের হচ্ছে, জিহ্বাটা সাপের মতো বিভক্ত!’
ফারুক সাহেব হালকা শীতের কারণে একটা লেপ গায়ে দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ‘নিরঞ্জন! নিরঞ্জন!’ তারপর লেপ নিয়ে জানালার মধ্যে গিয়ে লাফ মারলেন! সোজা গিয়ে জানালায় বারি খেলেন। নিরঞ্জন কী করল, বাগানের ঘণ্টা পেটানো শুরু করল— ঢং ঢং ঢং ঢং! সবাই এসে দেখে, কিছুই নেই।
ওই ঘটনার পর ফারুক সাহেবের সাত দিন জ্বর ছিল, প্রচণ্ড জ্বর! এই জ্বরের ঘোরে ফারুক সাহেব একই কথা বলতেন, ‘কে তুমি, কে তুমি আমার পাশে, কে?’ এরপর সাধারণ কোনো অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় ভালো হয়নি। তখন তো চিকিৎসা ব্যবস্থাও সে রকম ভালো ছিল না। শেষ পর্যন্ত চা বাগানের যে ঝাড়ফুঁক হয়, সে চিকিৎসায় এটা ভালো হয়।
ওঝা বলেছিল, যে এসেছিল, সে ছিল একটা অশরীরী আত্মা। ওই আত্মাকে চা বাগানের আরেকটা শ্রমিকের ওপর ভর করানো হয়। এনে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তুমি যে বাংলোতে আছো, এত ডিস্টার্ব কেন করো? তুমি কী করলে যাবা?’ তখন সে ওই ছেলের মুখ দিয়ে বলল, ‘আমাকে একটা শূকর, একটা পাঁঠা আর একটা মুরগি দিতে হবে!’
এসব দেওয়ার পর ওটা চলে যায়।
তৃতীয়টি আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা। ঘটনাটা পাল্লাতোলা চা বাগানে, সম্ভবত ’৯৩ সালে। আমি ছিলাম অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। মুর্দাকুচি নামে একটি জায়গা আছে এখানে। ৭ নম্বর সেকশনে। বাগানের বাংলো থেকে আড়াই কিলোমিটার হবে। হেঁটে যেতে লাগে ৩০ মিনিট। তো, আমি মোটরসাইকেলে যেতাম ডিউটিতে। তখন দুপুর, প্রায় ২টা বাজে। কাজকর্ম শেষ, পাতা তোলাও নেই। পাতা তোলা অন্য সেকশনে ছিল।
মুর্দাকুচি মানে যেখানে মরা লাশ ফেলত অনেক আগে। ওখানে একটা বাগান আছে। আমি গিয়ে দেখি, এখানে গরু-টোরু চরে বাগান নষ্ট করে কিনা, কোনায় ঢুকি। তো, আমার বাংলোর একটা পানিওয়ালা ছিল, নাম রসিক। হঠাৎ গিয়ে দেখলাম, ওখানে রসিকের মতো একটা লোক ঘাস কাটছে! ওই জায়গাটিতে দুপুর ২টার সময় আলো ঢোকে না। মানে দুপুর ২টার সময় মনে হবে বিকাল ৫টা বাজে। এ সময় রসিক এখানে, কী করে?
আমি ডাকলাম, ‘রসিক! রসিক!’ রসিক ইয়া বিকট চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকাল! বড় চোখ, অস্বাভাবিক! মানে সে কুঁজো হয়ে ঘাস কাটছে, কিন্তু সে যেভাবে তাকাল এবং কোনো উত্তর দিল না। উত্তর না দেওয়াতে এবং এত বড় চোখ দেখে খুব ভয় পেয়ে গেলাম।
মনে হলো, হয়তো আমাকে ঘাড় মটকাতে পারে, কিছু না কিছু একটা করবে। আমি দৌড় দিলাম। সেই সঙ্গে ভয় তাড়ানোর জন্য বিকট শব্দে গান গাইতে শুরু করলাম! গাইতে গাইতে ভয় কিছুটা কমে এলে গতি কমিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ সামনে গিয়ে দেখি, আবার ওই রসিকের মতো আরেকটা লোক! সেও তাকিয়ে আছে! ভয়ংকর, মানে বড় বড় চোখ। আমাদের মতো মানুষ, কিন্তু অনেক বড়। সে কোনো কথা বলে না!
এখন আমি ব্যাক করব, না সামনে যাব— তাও চিন্তা করছিলাম। কারণ, সামনেও ওই জিনিসটা, পেছনেও তাই। আবার চিৎকার করলাম। তারপর পাহাড়ি একটা কাঁচা রাস্তা ধরে উঠতে লাগলাম। যখন অপর পাশ দিয়ে নিচে নামছি, দেখি আবার রসিক! এ তো কঠিন অবস্থা! তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে
এ সময়ই হঠাৎ ওখানে খাসিয়াপুঞ্জির দুজন খাসিয়াকে পেলাম। তাদের হাতে বন্দুক। সাহস ফিরে পেলাম। তারা ওখানে শিকার করতে এসেছে। আমি পুরো ঘটনাটা খুলে বললাম। একটা ছেলের নাম ছিল ওয়ালেস। সে সাহস আনার জন্য একটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করল। আমি ওদের সঙ্গে বাগানে চলে এলাম।
এই ঘটনা এখনো আমি ভুলতে পারি না। ওটা আসলে কী ছিল? আর এইগুলো কেন আমার সঙ্গেই ঘটে তা-ও জানি না।





