অতি প্রাকৃত
ত্রিপুরার রহস্যময়ী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাত তখন প্রায় ১২টা। আগরতলা শহর পেরিয়ে পুরনো রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে একটি গাড়ি। দুপাশে ঘন জঙ্গল, মাঝেমধ্যে ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝি পোকার ডাক। আকাশে চাঁদ নেই। রাস্তার দুপাশে জ্বলছে না কোনো আলো।
গাড়ির চালক অমিত হঠাৎ দেখল, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী।
লাল বেনারসি। মাথায় ঘোমটা। হাতে শাঁখা-পলা। কপালে টকটকে সিঁদুর। এক হাতে রাস্তার ধারের গাছের ডাল আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্য হাতটি বাড়িয়ে যেন গাড়ি থামানোর ইশারা করছে।
অমিত ভাবল, নিশ্চয়ই কোনো বিপদ হয়েছে।
গাড়ি থামিয়ে জানালার কাচ নামাতেই তরুণীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
— দাদা, একটু দাঁড়াবেন?
গলার স্বর এতটাই করুণ যে অমিতের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
— কোথায় যাবেন?
— বাড়ি।
— বাড়ি কোথায়?
তরুণী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলল,
— আমার বাড়ি তো এখানেই ছিল।
অমিত অবাক হয়ে জানতে চাইল, ছিল মানে? এখন কোথায় যাবেন?
তরুণী এবার মাথা তুললেন।
ঘোমটার আড়াল থেকে তার মুখের অর্ধেক দেখা গেল। কপালে সিঁদুর, ঠোঁটে লাল রঙ। কিন্তু চোখ দুটি যেন অস্বাভাবিক স্থির।
— আমার বর আসেনি এখনো। আপনি কি একটু অপেক্ষা করবেন?
অমিতের হাতের লোম খাড়া হয়ে গেল।
— আপনার বর কোথায়?
তরুণী এবার মৃদু হেসে বলল— সেই তো সমস্যা। সবাই বলে, সে আর আসবে না।
কথাটা বলেই তিনি রাস্তার ওপারে তাকালেন।
অমিতও স্বাভাবিকভাবে সেদিকে তাকালেন।
কিন্তু পরক্ষণেই তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
রাস্তার ওপারে কেউ নেই।
আবার জানালার দিকে তাকাতেই দেখলেন, তরুণীও নেই।
শুধু গাড়ির দরজার পাশে পড়ে রয়েছে একমুঠো লাল ফুল।
আর সেই ফুলের পাশেই পড়ে রয়েছে একজোড়া শাঁখা-পলা।
অমিত গাড়ি চালিয়ে সোজা বাড়ি ফিরে গেলেন।
কিন্তু পরদিন সকালে তার গাড়ির পেছনের আসনে পাওয়া গেল একটি লাল বেনারসির আঁচল।
আঁচলটি ভেজা।
যেন কেউ সারা রাত ধরে কেঁদেছে।
ত্রিপুরার আগরতলার শহরতলির পুরনো রাস্তাগুলো ঘিরে এমনই এক রহস্যময়ী নারীর গল্প বহুদিন ধরে লোকমুখে ঘুরে বেড়ায়।
কেউ তাকে বলেন, ভূত-কনে। কেউ বলেন, তিনি এক অভাগিনী নববধূ। আবার কারও মতে, তার আত্মা আজও খুঁজে বেড়ায় সেই মানুষটিকে, যার সঙ্গে বিয়ের রাতে সাত পাকে বাঁধা পড়ার কথা ছিল।
লোককথার বিভিন্ন সংস্করণে তার নাম বদলে যায়। কোথাও তিনি মাধবী, কোথাও শিউলি, আবার কোথাও নামহীন এক তরুণী।
কিন্তু প্রতিটি গল্পের শেষটা প্রায় একই।
লাল বেনারসি পরা সেই নারী আজও রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকেন। কখনো রাস্তার পাশে, কখনো কোনো পুরনো বাড়ির সামনে, কখনো বা নির্জন বাঁশবাগানের ভেতর।
তার চোখে থাকে একটাই প্রশ্ন—
‘আমার বর কি ফিরবে না?’
কেউ বলেন, বহু বছর আগে এক বিয়ের রাতে তার স্বামী দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। কেউ বলেন, বিয়ের আগেই তাকে প্রতারণা করে ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছিল তার প্রেমিক।
আবার কোনো কোনো গল্পে শোনা যায়, বিয়ের রাতেই তাকে খুন করা হয়েছিল।
আজও ত্রিপুরার কিছু নির্জন রাস্তা ঘিরে এমন গল্প শোনা যায়। কেউ বিশ্বাস করেন, লাল বেনারসি পরা সেই নারী সত্যিই কোনো অভাগিনী আত্মা। কেউ বলেন, রাতের অন্ধকারে মানুষের ভয়ই জন্ম দেয় এমন কাহিনির।



