ওই দেখা যায় এভারেস্ট

পঞ্চগড়ের মাটি থেকে ফিরোজ আল সাবাহের তোলা মাউন্ট এভারেস্ট
পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলে চমকে দিয়েছিলেন ফিরোজ আল সাবাহ। এবার পঞ্চগড় থেকেই তুলেছেন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু চূড়া মাউন্ট এভারেস্টের ছবি। শুনিয়েছেন সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্প
বাংলার এক সাধারণ গ্রামীণ জনপদ। চারপাশ জুড়ে বিস্তৃত ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়ের ছায়াঘেরা গৃহস্থ বাড়ি, টিনের চালা আর উঠোনে রোদে দেওয়া ধানের সুবাস। কিন্তু এই চেনা পরিচিত গ্রামীণ পটভূমির ঠিক ওপরের আকাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু— মাউন্ট এভারেস্ট!
আর যখন পঞ্চগড়ের কোনো এক মেঠোপথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ বাড়ির মাথার ওপর হিমালয়ের রাজাধিরাজ নিজের মুকুট পরে হাজির হয়, তখন দৃশ্যটি আর সাধারণ থাকে না; তা রূপ নেয় এক অবিশ্বাস্য অলৌকিকতায়।
কৈশোরের পাঠ্যবইয়ে প্রথম পরিচয় হয়েছিল এভারেস্টের সঙ্গে। এডমন্ড হিলারি আর তেনজিং নোরগের সেই রোমাঞ্চকর জয়ের গল্প কতশত কিশোর কল্পনার ডানায় ভর করে ঘুরে বেড়াত! তখন কে ভেবেছিল, নেপাল বা তিব্বতে না গিয়ে নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশের মাটি থেকেই কোনো দিন খালি চোখে বা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করা যাবে সেই দুর্গম সাগরমাথাকে? শৈশবে বাবার ভেসপার সামনে বসে উত্তরের হিমেল হাওয়ায় প্রথম হিমালয়কে চিনেছিলাম। তখন থেকেই উত্তর আকাশ যেন হাতছানি দিচ্ছিল। হাই স্কুল পেরিয়ে যখন ফটোগ্রাফিতে হাতেখড়ি, তখন প্রথম ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা দিয়েছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। সেই ছোটখাটো শুরু থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক দুর্নিবার নেশা। একে একে কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিবেশীদের চিনতে শিখলাম— মাসাং কাং, জিচু ড্রেক, চমোলহারি। কিন্তু মনের কোণে তখন এক অদ্ভুত কাঁটা বিঁধে আছে— পঞ্চগড় থেকে কি মাউন্ট এভারেস্ট দেখা সম্ভব নয়?
এই একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে বছরের পর বছর। ২০১৭ সাল থেকে শুরু হলো এই অদ্ভুত মানসিক ও বৈজ্ঞানিক যুদ্ধ। আমার চিরশত্রু স্কুলজীবনের সেই গণিতই হঠাৎ হয়ে উঠল পরম বন্ধু। পিথাগোরাসের সূত্র, ৩.৫৭-এর দিগন্তের হিসাব, পৃথিবীর বক্রতা আর বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণ— সব কষে দেখলাম, ভৌগোলিক ও গাণিতিক বিচারে পঞ্চগড় থেকে এভারেস্টের দূরত্ব প্রায় ২৪৪ কিলোমিটার। দৃষ্টিসীমা ও তাত্ত্বিক হিসাবে বাধা নেই। কিন্তু আসল বাধা হয়ে দাঁড়াল সামনে থাকা ‘ইলহাম’ ও লেসার হিমালয়ের বিশাল পাহাড়শ্রেণি। তারা তাদের প্রকাণ্ড শরীর দিয়ে আড়াল করে রেখেছিল এভারেস্টের উচ্চতাকে।
পাহাড় তো আর ঠেলে সরানো যায় না! তাই শুরু হলো পাখির চোখে দেখার লড়াই, ড্রোন ও ক্যামেরার লেন্স নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যান্ত্রিক পাখির উচ্চতা সীমানা ভাঙার ব্যর্থ চেষ্টা, হার্ডওয়্যার হ্যাক করার চিন্তা, একের পর এক প্রতিকূলতা, বাইক দুর্ঘটনা কিছুতেই দমে যাইনি। প্রতি বছর অক্টোবরের আকাশ পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হতো আমার নির্ঘুম রাত আর অভিযান।
অবশেষে এলো সেই বহুপ্রতীক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ— ২০২২ সালের এক অক্টোবরের ভোর। কুয়াশা কেটে গিয়ে মাঠঘাট তখন স্ফটিকস্বচ্ছ। ভোর ৬টা বেজে ১০ মিনিটে যখন নতুন এক প্রজাতির ক্যামেরা-পাখি আকাশে ওড়ালাম এবং মাউন্ট এভারেস্টের রেঞ্জে ফোকাস করলাম, তখন আমার হৃৎপিণ্ড যেন ছাতি ফেটে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। ডিসপ্লেতে আবছা নয়, স্পষ্ট ভেসে উঠল পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখর— সাগরমাথা, চোমোলোংমা, পিক ফিফটিন! শুধু এভারেস্ট নয়; পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাকালু, লোৎসে। আটহাজারি ক্লাবের গর্বিত সদস্যরা এক সারিতে দণ্ডায়মান! সেদিন আনন্দে আমার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল। মাটিতে সিজদাহ দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম পরম স্রষ্টার দরবারে। মনে পড়েছিল সেই ছোটবেলার কথা, আজ হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়া আমি দেখেছি নিজের দেশ থেকে; কিন্তু পাশে সেই বাবা নেই, যিনি প্রথম হিমালয় দেখিয়েছিলেন!
এরপর ২০২৬ সালে এসে এই অভিযান পেল এক নতুন পূর্ণতা। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার আমি পঞ্চগড় সদরের আশপাশে এমন এক নিখুঁত কোণ ও ফ্রেম খুঁজে বের করলাম, যেখানে বাংলাদেশের এক সাধারণ পল্লীপ্রকৃতির মধ্যে ধরা দেয় হিমালয়ের মুকুট। অক্টোবরের ভোরে যখন সূর্যরশ্মি ১৫ কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এভারেস্টের গায়ে আছড়ে পড়ে এবং সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে এসে আমার ক্যামেরার সেন্সরে ধরা দেয়, সে এক লৌকিক জগতের বাইরের অনুভূতি। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ, কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর মাথার ওপর কোজাগরী চাঁদ— সব মিলিয়ে সে এক অন্য ব্রহ্মাণ্ড। পঞ্চগড়ের মাটির কাসুং বা ইষ্ট ফেস থেকে তোলা সেই ১৪০ মেগাপিক্সেলের প্যানোরমা বা ফুল ফ্রেম ছবি আমার ক্যামেরার ফ্রেমে অমর হয়ে রইল।
কিন্তু ছবিগুলো যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করলাম, তখন শুরু হলো কিছু মানুষের অন্তহীন বিতর্ক ও কটাক্ষ। মানুষ একটু কৌতূহলী হতে চায় না, সত্যটা জানতে চায় না। কিন্তু এসব নেতিবাচকতা মন্তব্য আমাকে স্পর্শ করে না।
আমি সামান্য এক রক্তমাংসের মানুষ। শুধু চেয়েছি আমার জন্মভূমির মাটি থেকে প্রকৃতির এই অপরূপ মহিমা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করতে। এই অভিযান ও ছবির পেছনে যে মানসিক শান্তি, যে বছরের পর বছরের সাধনা ও তপস্যা লুকিয়ে আছে, তা কেউ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।
এভারেস্টের কোনো কণ্ঠস্বর নেই, তবুও সে কথা বলে। সে আমাকে বলেছে, ‘অভিনন্দন, এতদিন পর খুঁজে পেলে আমাকে।’ এই নিখাদ প্রাপ্তির আনন্দ বুকে নিয়ে, আমার পঞ্চগড়ের মাটি থেকে যখনই উত্তর আকাশের দিকে তাকাই, মনে হয় প্রিয় এভারেস্ট আমাদের খুব কাছেই এসে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
সত্যি সম্ভব
ফিরোজ আল সাবাহ মাউন্ট এভারেস্টের ছবি তোলার পর ফেসবুকে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন পঞ্চগড় থেকে সত্যি এটা সম্ভব কি না। আমরা এ বিষয়ে মতামত নিয়েছি একজন ভূগোলের অধ্যাপক ও একজন আলোকচিত্রীর
ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণে পঞ্চগড় থেকে মাউন্ট এভারেস্ট দেখা অসম্ভব নয়। এভারেস্টের উচ্চতা ৮,৮৪৮.৮৬ মিটার হওয়ায় পৃথিবীর বক্রতা সত্ত্বেও এর চূড়া প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার দূর থেকেও দৃশ্যমান হওয়ার জ্যামিতিক সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি আলোকচিত্রী ফিরোজ আল সাবাহ পঞ্চগড় থেকে এভারেস্টের ছবি তোলার দাবি করেছেন। এখান থেকে মাউন্ট এভারেস্টের দূরত্ব প্রায় ২২০ কিলোমিটার। তবে ছবিটি সত্যিই এভারেস্টের কি না, তা নিশ্চিত করতে ছবির জিপিএস অবস্থান, ক্যামেরার দিক, মধ্যবর্তী ভূপ্রকৃতির উচ্চতা এবং পৃথিবীর বক্রতা বিবেচনায় জিআইএসভিত্তিক লাইন অব সাইট অ্যানালাইসিস করতে হবে। তবে দাবিটি ভৌগোলিকভাবে সম্ভব।
ড. উবাইদুর রহমান সিদ্দিকী
অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত— এ দুই সপ্তাহ পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশাপাশি মাউন্ট এভারেস্ট দেখার ও ক্যামেরাবন্দি করার অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়।
পঞ্চগড়ের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ফিরোজ আল সাবাহসহ বেশ কয়েকজন পেশাদার ফটোগ্রাফার এই সময়ে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন উপযুক্ত স্পট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলেছেন।
ফিরোজ আল সাবাহ এভারেস্টের ছবিও তুলেছেন। পরিবেশের অনুকূল অবস্থা, অর্থাৎ আকাশে কোনো ধূলিকণা বা মেঘ না থাকা এবং পর্যাপ্ত ভিজিবিলিটি থাকার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে।
সৈয়দ জাকির হোসেন
আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক





