৫ অক্টোবর শিশু স্বাস্থ্য দিবস
শিশুর সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়
- পুষ্টি - টিকা - মানসিক স্বাস্থ্য - রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

মডেল: মাহদিয়া ফাইরুজ রুহানী
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে পালিত হয় শিশু স্বাস্থ্য দিবস। শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য রোগমুক্ত থাকাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন সঠিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত ঘুম, টিকা, খেলাধুলা এবং সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ।
শিশু পুষ্টি: শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় মাতৃগর্ভে আসার আগে থেকেই। তাই সুস্থ প্রজন্মের জন্য কিশোরী বয়সে পুষ্টি ও প্রজনন স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি। শিশু গর্ভে এলে মায়ের সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পুষ্টি ও বিশ্রামের কোনো বিকল্প নেই। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। মায়ের দুধ শিশুকে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রদান করে, যা নবজাতকের জীবন বাঁচায়।
ছয় মাস বয়সের পর থেকে শিশুর শুধু বুকের দুধে পুষ্টির চাহিদা মেটে না। এ সময় থেকে ধীরে ধীরে নরম ও আধা-নরম খাবার শুরু করতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের বৈচিত্র্য ও ঘনত্ব বাড়াতে হবে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, শাকসবজি ও ফলমূলের মতো সুষম খাবার দিতে হবে। খাবারের সঠিক বৈচিত্র্য ও ঘনত্ব বজায় না রাখলে শিশুর উচ্চতা কম হওয়া বা ওজনে ঘাটতির মতো অপুষ্টির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বর্তমান যুগে আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনে শিশুর অতিরিক্ত ওজনও একটি বড় পুষ্টিগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিশু মাতৃগর্ভে পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না, সে বড় হয়ে খাটো হতে পারে এবং পরবর্তী জীবনে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে থাকে। তাই শিশুর বয়স অনুযায়ী যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করা মা ও পরিবারের প্রধান দায়িত্ব। সেই সঙ্গে শিশুকে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলায়ও উৎসাহিত করতে হবে।
শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুম: বর্তমান সময়ে শিশুর মনোবিকাশজনিত সমস্যা, যেমন— অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার, এডিএইচডি (ADHD), বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা, শেখার জটিলতা এবং ইন্টারনেট বা গেমিং আসক্তির মতো আচরণগত সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শিশু নিউরোলজিস্ট ডা. মো. মাহাজুর আলম সুমনের মতে, এই সমস্যাগুলো প্রতিরোধে শিশুর পুষ্টির পাশাপাশি তাকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, সামাজিক পরিবেশে মিশতে দেওয়া এবং মোবাইল ও টেলিভিশনের আসক্তি থেকে দূরে রাখা অপরিহার্য।
সাধারণত জন্মের পর তিন মাস পর্যন্ত শিশু দিনে ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুমায়। ঘুমের মাঝেই শিশুর মস্তিষ্কের কোষগুলো বিকশিত হয় এবং গ্রোথ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা শিশুকে বড় হতে ও লম্বায় বাড়তে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর বুদ্ধি, শেখার ক্ষমতা ও স্মরণশক্তি বাড়ায়। ঘুমের অভাব শিশুর সামগ্রিক বিকাশকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
শিশুর টিকা: শিশুকে কঠিন রোগ থেকে বাঁচাতে সরকার প্রদত্ত ইপিআই শিডিউলের সব টিকা সঠিক সময়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। হামের প্রকোপ এবং এর জটিলতা থেকে শিশুকে বাঁচাতে নিয়মিত টিকার কোনো বিকল্প নেই। সরকারি টিকার পাশাপাশি রোটা ভাইরাস, টাইফয়েড, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও হেপাটাইটিস-এ ভাইরাসের মতো বেসরকারি টিকাগুলোও শিশুর সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে রোটা ভাইরাসের টিকা শিশুর ডায়রিয়া প্রতিরোধে কার্যকর। এ ছাড়া যেসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের মেনিনজাইটিস বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো টিকাগুলো আলাদাভাবে দেওয়া প্রয়োজন।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে: সুষম খাবার ও টিকার পাশাপাশি শিশুকে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলার সুযোগ দিন। প্রতিদিন কিছুক্ষণ বাইরে খোলা জায়গায় সময় কাটানো এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে রাখা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া নিয়মিত হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা, বায়ুদূষণ থেকে দূরে রাখা এবং বাড়িতে একটি আনন্দময় ও প্রশান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা শিশুর সুস্থতার জন্য খুবই প্রয়োজন।
লেখক: সহকারী সার্জন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, ঢাকা।



