মানুষ এত অস্থির না হইলে শহরটা সুন্দর হইত

রাজধানীর পুরনো ফুলবাড়িয়া মোড়ের ওভারপাসের নিচে দুটি টমটম ও নির্বিকার দাঁড়িয়ে একটি শীর্ণ ঘোড়া। ছবি: লেখক
জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই মহীনের ঘোড়াগুলো এখন ঘাস খায় ঢাকার পুরনো ফুলবাড়িয়া মোড়ের ওভারপাসের নিচে। পায়ের তলায় ভীষণ উৎক্ষিপ্ত এক শহরের পথ। এখানে বেঁচে থাকে প্রতিদিন মানুষের ভিড়-চিৎকার, যানজট আর পেটের ধান্দার লড়াই। মাঝেমধ্যে এক অদ্ভুত অরণ্য বলে মনে হতে পারে এই শহরকে। সেখানেই পুরান ঢাকার বিস্ফোরক ভিড়ের রাস্তার পাশে নির্বিকার দাঁড়িয়ে শীর্ণ ঘোড়াগুলো। তারা নিওলিথ জ্যোৎস্নায় নয়, গুলিস্তান থেকে সদরঘাট অবধি ঘোড়ার গাড়ি টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু জীবনানন্দের কবিতায় সেই ঘোড়ার সঙ্গে জুড়ে আছে জনৈক মহীনের নামও। কে সেই মহীন? একটু খোঁজ নিতেই পাওয়া গেল সেই মহীনকেও। শহর ঢাকায় তার নাম আকাশ। চারটি ঘোড়া আর দুটি ঘোড়ার গাড়ির মালিক এই আকাশ। পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে জন্ম নেওয়া আকাশ ১৮ বছর ধরে এ ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে রোজগার করেন, সংসার চালান। কিন্তু এখন এ বিমুখ শহরপ্রান্তে তার কাছে জীবন চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
বয়সে তরুণ আকাশের ব্যবসাটা পৈতৃক। তার বাবা একদা ঢাকায় গুলিস্তানের মোড় থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়িতে যাত্রী পরিবহন করতেন। এখন সেই জীবন-সংগ্রামে লিপ্ত আকাশ নিজেই। আকাশের নিজের ঠিকানা আনন্দবাজার এলাকা। বাড়িতে স্ত্রী আর দুই মেয়ে। সেই ছোট সংসারটার জীবনরেখা সচল রাখতে এ ঘোড়ায় টানা গাড়ি আকাশের কাছে আর যথেষ্ট নয়। মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় হয়ে যায় ঘোড়ার খাবার আর আনুষঙ্গিক জিনিসের জোগান দিতে। তারপর আছে গাড়ির হেলপারের বেতন। আর এখন তার মতো আরও ঘোড়ার মালিকদের পেশায় থাবা বসিয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। যাত্রীরা এখন ভিড়ের শহরে ধীরগতির ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসতে চায় না।
‘একটা সময় ছিল যখন এই ঘোড়ার গাড়ি চালাইয়া আমরা ভালোভাবেই দিন পার করতে পারতাম। কিন্তু এহন আর এইটা সম্ভব না। যাত্রী কমতাসে, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়তি; এই অবস্থায় আমরা চলুম কেমনে?’ আকাশের কণ্ঠে হতাশা ঝরে পড়ে কথা বলতে বলতে।
‘এই ঢাকা শহরে একটা জীবন কেটে যাচ্ছে আপনার, এই শহরটাকে কেমন লাগে আপনার?’
‘একটা সময়ে শহরটারে ভালো লাগত। ক্লাস টেন পর্যন্ত লেখাপড়া করছি। তারপর বাপ লেখাপড়া ছাড়াইয়া এই কাজে লাগাইয়া দিল। তহন পেট চালানো এত কঠিন আছিল না। এত মানুষও এহানে আসে নাই। এত ভিড় বাড়ে নাই। এহন আর ভালো লাগে না। কিন্তু বাপ-দাদার ব্যবসা ছাইড়া দিলে খামু কী?’
আকাশ ঘোড়ার গাড়ির ব্যবসার পাশাপাশি ছোটখাটো অন্য ব্যবসা করার চেষ্টা করেন। ইতিহাস বইয়ে তিনি পড়েছেন ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ি আর ঘোড়ার কথা। তারপর একদিন নিজেও বসে গেছেন ঘোড়ার গাড়ির চালকের আসনে। শহরের ভিড়ের রাস্তা দিয়ে যাত্রী নিয়ে গাড়ি ছুটিয়েছে গন্তব্যে। কিন্তু এখন আকাশ ভাবেন, ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঘোড়া এবং ঘোড়ার গাড়ি আর থাকবে না। ধীরে ধীরে জীবিকার প্রয়োজনে তাদের হয়তো অন্য পেশা বেছে নিতে হবে।
‘এই শহরে যখন কাজ না থাকে কী করেন?’
ম্লান হেসে উত্তর দেন আকাশ, ‘তেমন কিছুই করি না। কাজকাম না থাকলে বাড়ি চইলা যাই। পরিবারে সময় দেওনের চেষ্টা করি। মোবাইলে এইটা-সেইটা দেহি। আবার রাইত কাটলে তো কাজকামের ধান্দা শুরু হইয়া যায়।’
‘এ শহরটাকে কেমন দেখতে চান? ঢাকা কেমন হলে ভালো লাগত আপনার?’— চলে আসার সময় তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম। একটা মেশিন দিয়ে ঘোড়ার শরীরের পশম ছাঁটতে ছাঁটতে আকাশ উত্তর দিলেন, ‘এহানে যদি মানুষের ভিড়ভাট্টা কম থাকত, রাস্তায় যানবাহনের উপ্রে নিয়ন্ত্রণ থাকত আর মানুষজন যদি এত অস্থির না হইত তাইলে শহরটা সুন্দর লাগত। আগে তো এমনই আছিল আমাগো ঢাকা।’
আকাশ যখন রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তখনো অনেকটাই নীরব হয়ে আসা শহরে ওভারপাসের নিচে রুগ্ণ ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে থাকে, পা ঠোকে, ডেকে ওঠে হঠাৎ। মহীনের ঘোড়াগুলোকে তখন মনে হয়, এই শহরের ইতিহাসের শরীরে লগ্ন হয়ে আছে।




