গল্পে ধাঁধা
হেকিম মুনশী ও বাঁশিরহস্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শরতের শেষ বিকাল। কিন্তু ইদানীং যেন প্রকৃতি তার নিয়ম মেনে আসছে না, সব কালেই বর্ষা বাগড়া দিচ্ছে। সারা দিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হওয়ার পর শেষ বিকালের আকাশ পরিষ্কার।
রাউতাড়া গ্রামের শেষ প্রান্তে বিশাল এক বটগাছ। নিচে পুরনো ইটের বেদি। একসময় কোনো শৌখিন জমিদার বটগাছের নিচটা বাঁধাই করেছিলেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় শুধু ইটের বেদিটাই আছে। গ্রামের মানুষ সন্ধ্যার পর ওই জায়গা এড়িয়ে চলে। কারণ, সাত রাত ধরে ঠিক মাঝরাতে বটগাছের নিচ থেকে বাঁশির শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু গ্রামে কোনো বাঁশিওয়ালা নেই আর সেই বাঁশিওয়ালাকে কেউ দেখেনি। মাঝরাতে বাঁশির সুর নিশ্চয় ভয়াবহ ঘটনা নয়। কিন্তু বাঁশির সুর ভেসে আসার পরই গ্রামের কারও না কারও ঘর থেকে মূল্যবান জিনিস হারাচ্ছে।
প্রথম রাতে হারিয়েছে শৌখিন রহিম হাজির রুপোর পানদানি। দ্বিতীয় রাতে নাদের আলীর বহুদিনের পুরনো পকেটঘড়ি। তৃতীয় রাতে মসজিদের খাদেমের সিন্দুক থেকে টাকা।
গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে— বটগাছের নিচে নাকি এক অদৃশ্য বাঁশিওয়ালা এসেছে। সে আগে বাঁশি বাজিয়ে মানুষকে ঘুম পাড়ায়, তারপর তার অদৃশ্য সঙ্গীরা চুরি করে।
জলু, ডিটু, ম্যাক আর ফজু এই খবর শুনে ছুটে গেল মুনশী দাদুর কাছে। হেকিম মুনশী তখন দাওয়ায় বসে হুক্কাদানিতে হুক্কা ফুঁকছিলেন। মুখ তুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।
ডিটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, দাদু, মাঝরাতে বটতলায় ভূত বাঁশি বাজায়! তুমি কিছু না করলে গ্রাম শেষ!
হেকিম মুনশী তখন পানের কৌটা খুলছিলেন। তিনি চোখ তুলে বললেন, ভূত বাঁশি বাজায়, না মানুষ বাঁশি বাজিয়ে ভূতের নাম কামায়— সেটি আগে দেখা দরকার।
ম্যাক বলল, ‘আপনার কথামতো ভূত হয়তো মিথ্যা হতে পারে, কিন্তু চুরিগুলো তো সত্যি সত্যি হচ্ছে!’
‘চুরি সত্যি হলেই চোর ভূত হয় না রে বোকা। সাহস আছে? চল, আজ রাতে বটতলায় যাই।’
রাত সাড়ে ১১টা। মুনশী দাদু ও চার কিশোর বটগাছ থেকে কিছুটা দূরে পরিত্যক্ত খড়ের গাদার আড়ালে লুকিয়ে আছেন।আকাশে কালো মেঘ। জলু ফিসফিস করে বলল, ‘দাদু, বাঁশিওয়ালা যদি সত্যিই অদৃশ্য হয়?’
‘তাহলে তার পায়ের ছাপও অদৃশ্য হবে। কিন্তু মানুষের পায়ের ছাপ সাধারণত অদৃশ্য হয় না।’
ফজু হঠাৎ মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দাদু, এখানে দেখো! বটগাছের দিকে যাওয়া পায়ের ছাপ।’
হেকিম মুনশী কাছে গিয়ে দেখলেন, কাদামাটির ওপর একজোড়া চওড়া খালি পায়ের ছাপ। ছাপগুলো বটগাছের দিকে গেছে, কুঁড়েঘরের কাছে গেছে। কিন্তু ফিরে আসার কোনো ছাপ নেই, যদি না একজন মানুষ এই রাতে ঠিক পায়ের ছাপে ছাপ মিলিয়ে ফিরে যায়। তিনি কুঁড়েঘরের পেছন দিকে টর্চের আলোয় কিছু একটা খুঁজতে লাগলেন। এবার পায়ের ছাপ পেলেন না, কিন্তু জুতার ছাপ অন্যদিকে চলে গেছে।
ডিটু জিজ্ঞেস করল, ‘চোর কি ফিরে যাওয়ার সময় উড়ে গেছে?’
ঠিক রাত ১২টায়— ফুঁউউউউ...
বাঁশির দীর্ঘ শব্দ ভেসে এলো বটগাছের দিক থেকে। চারজনই চমকে উঠল। মুনশী দাদু হাত তুলে সবাইকে চুপ করতে বললেন। বাঁশির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে দূরের একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তারপর আচমকা শব্দ বন্ধ। এমনকি কুকুরের ডাকও।
কয়েক মুহূর্ত পর গ্রামের দক্ষিণপাড়ার দিকে একটি ক্ষীণ আলো নড়তে দেখা গেল।
‘ওই যে!’ ম্যাক ফিসফিস করে বলল।
মুনশী আলোটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেউ হাঁটছে। কিন্তু আলোটা মানুষের হাতে নেই।’
পরদিন সকালে গ্রামের বাজারে হইচই পড়ে গেল। গ্রামের ধনী ধানের আড়তদার নওশের মোড়ল জানালেন, তার সিন্দুক থেকে একটি পুরনো মোগল আমলের সোনার মোহর ও নগদ টাকা হারিয়েছে। ‘গত রাতে ১২টার সময় বাঁশির শব্দ শুনেছি। তারপর আর কিছু মনে নেই। সকালে উঠে দেখি, সিন্দুক খোলা।’
হেকিম মুনশীকে তার বাড়িতে ডাকা হলো ঘটনা কী, দেখার জন্য। সিন্দুকটির তালা অক্ষত। চাবি নওশের মোড়লের নিজের কাছে ছিল।
সব দেখে মুনশী জানতে চাইলেন, ‘আপনার ঘরে গত রাতে কে কে ছিল?’
—‘আমি, আমার স্ত্রী আর আমার ভাগ্নে সেলিম। সেলিম পাশের ঘরে ঘুমায়।’
—‘বাঁশির শব্দ শোনার পর আপনি কী করেছিলেন?’
—‘জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলাম। তারপর জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়ি।’
হেকিম মুনশী জানালার নিচের মাটি দেখলেন। সেখানে সামান্য ভেজা কাদা, কিন্তু কোনো পায়ের ছাপ নেই।
প্রাথমিক তদন্ত শেষে হেকিম মুনশীর সন্দেহ গিয়ে দাঁড়াল কয়েকজনের ওপর। প্রথমজন, নওশের মোড়লের ভাগ্নে সেলিম— সে সিন্দুকের পাশের রুমেই থাকে।
দ্বিতীয়জন, বশির বাঁশিওয়ালা— গ্রামের মেলায় বাঁশি বাজায়। সে নাকি কয়েক দিন ধরে বটগাছের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে।
তৃতীয়জন, করিম কামার— তার বাড়ি বটগাছের কাছেই। রাত জেগে কাজ করে বলে অনেকে তাকে সন্দেহ করে।
চতুর্থজন, মকবুল মুনশী— গ্রামের হিসাবরক্ষক। তার টাকার প্রয়োজন ছিল এবং ঘটনার আগের দিন নওশের মোড়লের কাছে টাকা ধার করতে এসেছিল। সে সিন্দুকে টাকা থাকার কথা জানত।
সেদিন দুপুরে মুনশী ওদের নিয়ে বটগাছের কাছে গেলেন। গাছের একপাশে ঝোপঝাড়, অন্যপাশে পরিত্যক্ত একটি কুঁড়েঘর। তিনি কুঁড়েঘরের ভেতরে ঢুকে মেঝে পরীক্ষা করলেন। দেয়ালের পাশে একটি ফাঁপা বাঁশ পড়ে আছে। বাঁশের একপ্রান্তে সরু ছিদ্র এবং বাঁশির মধ্যে কয়েকটি ছোট ছোট ফুটো। মুনশী বাঁশটি তুলে মুখের কাছে ধরলেন না। বরং কানে লাগিয়ে বললেন, ‘এটা বাঁশির মতো মনে হলেও বাঁশি নয়; বাতাসের চলাচলের পথ। এর ভেতর দিয়ে বাতাস গেলেই ফুটোর কারণে বাঁশির মতো সুর শোনা যায়। আর এটা ভূতে বানায়নি, মানুষই বানিয়েছে।’
সেই রাতেই মুনশী দাদু একটি পরিকল্পনা করলেন। তিনি চার কিশোরকে গ্রামের চারটি নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিলেন।
রাত ১২টা বাজতেই আবার বাঁশির শব্দ শোনা গেল। ফুঁউউউ...
এবার ডিটু চিৎকার করে উঠল, ‘দাদু! আলোটা বটগাছের নিচে নয়, কুঁড়েঘরের পেছনে!’
মুনশী উঠে দাঁড়ালেন। একটি ছোট আলো মাটির কাছাকাছি নড়ছে। কিন্তু আলোটির সামনে কোনো মানুষ নেই। কিছুক্ষণ পর আলোটি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মুনশী দৌড়ে কুঁড়েঘরের পেছনে গেলেন। একটি লাল নাইলনের দড়ি এক গাছ থেকে আরেক গাছে বাঁধা।
জলু দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বোঝা গেল দাদু?’
—হারিকেনের আলোটা মানুষ হাতে নিয়ে হাঁটেনি। হারিকেন ঝুলিয়ে আলোটা দড়ির সাহায্যে টেনে নেওয়া হয়েছে। আর বাঁশির শব্দও দূর থেকে বাতাস দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
মুনশী দাদু সকালে সবাইকে নিয়ে নওশের মোড়লের বাড়িতে গেলেন। ওখানেই সবাইকে ডাকলেন। উপস্থিত হলো যাদের যা যা হারিয়ে গিয়েছিল, সেই মানুষগুলো। মুনশী দাদু বললেন, বাঁশির সুর বাজিয়ে লোকজনকে বিভ্রান্ত করে ভূতের আলোর ভয় দেখিয়ে এসব চুরির কাজ একজনই করছে এবং সে সবার মধ্যে বসে আছে।
মাতবরের কথামতো সেখানে সেলিম, বাঁশিওয়ালা, হিসাবরক্ষক ও কামার সবাই ছিল। মুনশী দাদু সেলিমকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি গত রাতে বাইরে কাদার মধ্যে কোথাও বেরিয়েছিলে?
সেলিম দুদিকে মাথা নেড়ে না জানাল।
মুনশী দাদু হঠাৎ সেলিমকে বললেন, ‘সেলিম, তোমার ঘরে কি লাল নাইলন দড়ি আছে?’
সেলিম চমকে উঠল। ‘লাল দড়ি? কেন?’
মুনশী তার পকেট থেকে লাল নাইলন দড়ির একটি অংশ বের করলেন। ‘কারণ এই দড়ির সঙ্গে তোমার ঘরের মশারির বাঁধন দেওয়া দড়ি মিলে যাচ্ছে। তুমি যদি এক দড়ি দিয়েই দুই কাজ না করতে।
সেলিম চুপ করে রইল।
মুনশী এবার সেলিমের স্যান্ডেলের তলা উঁচু করে ধরলেন। সেখানে কাদামাটি জমে আছে।
‘তুমি বাঁশির শব্দ তৈরি করেছিলে, আলো টেনে নিয়ে গিয়েছিলে আর মানুষকে ভয় দেখিয়ে চুরি করেছিলে। কিন্তু একটা ভুল করেছ।’
সেলিম ধরা পড়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘কী ভুল?’
পাঠক
বলুন তো, সেলিম কি
ভুল করেছিল?
উত্তর পাঠাতে হবে ১১ নভেম্বরের মধ্যে। সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজন পাবেন ১০০০ টাকার বই।



