দক্ষ মানুষকে পক্ষপাতিত্ব করে আটকে রাখা যায় না

‘ক্যাম্পাস টু করপোরেট’ আয়োজনে বক্তব্য রাখছেন গোলাম সামদানী ডন। ছবি: মহুবার রহমান
৯ জুলাই বৃষ্টিভেজা সকালে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)-এর মিলনায়তনে বসেছিল ক্যারিয়ার বিষয়ক এক কর্মশালা। আয়োজনে আগামীর সময় ক্যারিয়ার ক্লাব ও আইইউবি। প্রধান বক্তা ছিলেন গোলাম সামদানী ডন। তার বক্তব্যের সারাংশ স্বর্ণা রায়ের কলমে
কর্মশালার শুরুতে তরুণদের একটি গল্প শোনান জনপ্রিয় করপোরেট ট্রেনার ও মোটিভেশনাল স্পিকার গোলাম সামদানী ডন। তিনি বললেন, “আমি একদিন একজনকে বলেছিলাম, আপনাকে ১০ কোটি টাকা দেব, আপনি কি নেবেন? তিনি বললেন, ‘অবশ্যই নেব।’ বললাম, কিন্তু একটি শর্ত আছে। ‘কী শর্ত?’ বললাম, ‘শর্ত হলো আপনি আগামীকাল সকালে আর ঘুম থেকে উঠবেন না।’ তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘এটা কি কোনো কৌতুক?’ আমি বললাম, ‘না, এটাই শর্ত। আপনি ১০ কোটি টাকা পাবেন, কিন্তু ঘুমের মধ্যেই মারা যাবেন, সকালে আর চোখ মেলতে পারবেন না।’ তিনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘না ভাই, আমি এই টাকা চাই না।’ আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি ১০ কোটি টাকা চান না?’ তিনি বললেন, ‘না, চাই না।’”
গল্পটি শেষ করে কর্মশালার প্রধান বক্তা তরুণদের বললেন, তার মানে প্রতিদিন সকালে সুস্থভাবে জেগে ওঠার মূল্য ১০ কোটি টাকার চেয়ে অনেক বেশি। অথচ এই অমূল্য জীবনকে আমরা কীভাবে কাটাচ্ছি? আমাদের তারুণ্য কি সত্যিই সঠিক পথে এগোচ্ছে?
তিনি জোর দিয়ে বললেন, করপোরেট জগতে টিকে থাকতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই নিজেকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। কর্মশালায় তিনি সিজিপিএর গুরুত্বসহ আরও নানা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে অভিজ্ঞতার ঝুলি উন্মোচন করেন।
সিজিপিএ কি শুধুই নম্বর
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, সিজিপিএ কোনো ব্যাপারই না! কিন্তু এই করপোরেট ট্রেনারের মুখে শোনা গেল ভিন্ন কথা। প্রচলিত বা প্রথাগত চাকরির বাজার যেমন— নেসলে, বিকাশ, ইউনিলিভার, বিভিন্ন ব্যাংক কিংবা স্থানীয় বড় গ্রুপ অব কোম্পানি সিজিপিএকে বেশ গুরুত্ব দেয়। তার মতে, ৩.৫ সিজিপিএকে একটি গড় মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা উচিত। ৩.২ বা ৩.৩-এর নিচে নামলে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো শুরুতেই সিভি ফিল্টার বা ছাঁটাই করে দেয়। তবে অপ্রচলিত কাজ যেমন— ভিডিও এডিটিং, গ্রাফিকস ডিজাইনিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা কোডিংয়ের ক্ষেত্রে প্রার্থীর পোর্টফোলিও বা কাজের নমুনাই শেষ কথা। সেখানে সিজিপিএ ততটা গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু ঝুঁকি এড়াতে ভালো সিজিপিএ ধরে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
শিক্ষিত বেকারের কঠিন বাস্তবতা
ডন বললেন, ‘বাংলাদেশের চাকরির বাজার সম্পূর্ণভাবে নিয়োগকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে। এখানে চাকরিপ্রার্থীর তুলনায় চাকরিদাতার সংখ্যা অত্যন্ত কম। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ শিক্ষিত বেকার রয়েছেন, যারা কোনো না কোনো উচ্চতর ডিগ্রিধারী। চাকরিবিষয়ক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একটি পদের বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে দুই-তিন হাজার সিভি জমা পড়ে। যেহেতু নিয়োগকর্তারা আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না, তাই তারা আপনার সিভি ও সিজিপিএ দেখেই প্রথম মূল্যায়ন করবেন। দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও যদি রেজাল্ট খারাপ হয়, তবে নিয়োগকর্তারা ধরে নেন আপনি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নন।’
সার্টিফিকেট নয়, বাজার খোঁজে দক্ষতা
গোলাম সামদানী ডনের মতে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত প্রার্থীর সার্টিফিকেট ভাড়া করতে চায় না, তারা চায় সফট স্কিল ও হার্ড স্কিল। নানা ধরনের কারিকুলার ও কো-কারিকুলার কার্যক্রমের মাধ্যমে এই স্কিল গড়ে তোলা সম্ভব। যেমন— ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো খেলাধুলা আমাদের দলগত কাজ ও নেতৃত্ব শেখায়, যা হচ্ছে সফট স্কিল। আবার কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, গ্রাফিকস ডিজাইন করতে পারা হচ্ছে হার্ড স্কিল।
ডন বললেন, ‘নেতৃত্ব আমাদের রক্তেই থাকে। একটি ছোট শিশু যেমন কোনো কিছু পাওয়ার জন্য জেদ ধরে মেঝেতে শুয়ে পড়ে কিন্তু হাল ছাড়ে না, সেই অবুঝ শিশুর কৌতূহল ও জেদই হলো নেতৃত্বের আদি রূপ।’ কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় আমরা সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতায় আমাদের ভেতরের সেই নেতাকে হারিয়ে ফেলি। কো-কারিকুলার কার্যক্রম সেই নেতৃত্বগুণকে ফিরিয়ে আনে, এমনটাই অভিমত তার।
যেকোনো ভালো অফিসে কাজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ থাকবেই। হুটহাট চাকরি বদলে ফেলার চেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে শেখাটাই পেশাদারিত্বের আসল পরিচয়
ছাত্রজীবনেই হোক কাজের হাতেখড়ি
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই টিউশনি করা, কল সেন্টারে জব কিংবা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো খণ্ডকালীন কাজগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ পেশাদার জীবনের জন্য দারুণভাবে প্রস্তুত করে। ডন মনে করেন, এ ছোট ছোট খণ্ডকালীন কাজ মূলত আগামী দিনের বড় লড়াইয়ের জন্য তরুণদের মানসিক ও পেশাগতভাবে তৈরি করে। এটি শিক্ষার্থীদের বোঝায়, অর্থ উপার্জন করা কতটা কষ্টের এবং পেশাদার জীবন কতটা নিয়মতান্ত্রিক।
ওকিউপি সূত্র
গোলাম সামদানী বললেন, ‘আমরা ঠিক তাদের মতোই হয়ে উঠি, যাদের সঙ্গে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাই। একটি পচা ফল যেমন ভালো ফলকে পচিয়ে দেয়, তেমনি লক্ষ্যহীন ও নেতিবাচক বন্ধুদের আড্ডা আপনার সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেবে। জীবন থেকে এমন নেতিবাচক বা টক্সিক মানুষদের বাদ দেওয়া প্রয়োজন। সরাসরি সূত্রটি হলো অনলি কোয়ালিটি পিপল (ওকিউপি)। এর মানে হচ্ছে, শুধু মানসম্পন্ন ও ইতিবাচক মানুষের সঙ্গেই মেলামেশা করুন, যারা আপনাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে। বন্ধুদের আড্ডায় যখন ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা হবে, তখনই বুঝবেন আপনি সঠিক বৃত্তে আছেন।’
পাবলিক বনাম প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি বিতর্ক
কর্মশালায় আইইউবির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী শিহাব জানতে চেয়েছিলেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় কি না। জবাবে গোলাম সামদানী ডন নিজের উদাহরণ টেনে জানান, তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর প্রথম ব্যাচের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। বললেন, ‘করপোরেট জগতে পাবলিক বা প্রাইভেট ট্যাগের চেয়ে প্রার্থীর কাজ করার যোগ্যতাই আসল। একজন দক্ষ মানুষকে কোনো পক্ষপাতিত্ব দিয়েই আটকে রাখা যায় না। তাই নিজের দক্ষতাকে এমন চূড়ায় নিয়ে যেতে হবে যেন নিয়োগকর্তারা আপনাকে বাদ দেওয়ার সাহস না পান।’
জব হপার হওয়ার ক্ষতিকর প্রবণতা
আজকাল তরুণদের মধ্যে অতি অল্পতেই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার একটি বড় প্রবণতা দেখা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামান্য বকা কিংবা কাজের চাপে তারা হাল ছেড়ে দেন। দুই বছরে চারবার চাকরি বদলানো এই ‘জব হপার’দের কোনো ভালো কোম্পানিই সহজে বিশ্বাস করতে বা নিয়োগ দিতে চায় না। কারণ, যেকোনো ভালো অফিসে কাজের লক্ষ্যমাত্রা বা কেপিআই পূরণের চাপ থাকবেই। হুটহাট চাকরি বদলে ফেলার চেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে শেখাটাই পেশাদারিত্বের আসল পরিচয়— কর্মশালায় জানান ডন।
তিনি আরও বললেন, ‘অন্য কে কী করল, ফেসবুকে কী লিখল, তা নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়। বরং গ্র্যাজুয়েশনের পর থমকে না গিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।’ চাকরির বিজ্ঞপ্তির অনলাইন পোর্টালগুলোতে নিয়তিম ঢু মারার পরামর্শ দিয়ে ডন বলেন, ‘এগুলোতে চোখ বুলিয়ে বুঝে নিন নিয়োগকর্তারা কোন কোন যোগ্যতা খুঁজছেন প্রার্থীর মাঝে। সেই চাহিদার সঙ্গে নিজের দক্ষতার মিল ঘটিয়ে আজ থেকেই নিজেকে তিল তিল করে গড়ে তুলুন আগামী দিনের বিজয়ী হিসেবে।’
ক্যারিয়ার গড়তে
- প্রথম বর্ষ থেকেই প্রস্তুতি নিন
- সিজিপিএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
- দক্ষতাই শেষ কথা
- টক্সিক বন্ধু বর্জন করুন
- সময়ই সবচেয়ে বড় সম্পদ
- হাল না ছাড়ার মানসিকতা থাকা দরকার
- সাফল্যের জন্য তীব্র আকুলতা
- চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলোতে সাধারণত যেসব যোগ্যতা চাওয়া হয়, সেই অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলুন





