রঙে বসনে আরাম

মডেল: সাবরিন ইসলাম, শাড়ি: সেইলর, সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ, ছবি: অপূর্বা
প্রচণ্ড গরমের দিনেও কোমল উজ্জ্বল রঙ মনকে হালকা করে। এই ধারণা থেকেই এসেছে ডোপামিন ড্রেসিং, যেখানে পোশাকের রঙ আর ফেব্রিক নিয়ে আসে মানসিক স্বস্তি। বিস্তারিত লিখেছেন অলকানন্দা রায়
প্রকৃতিতে সূর্যের দোর্দণ্ড প্রতাপ। দরজা খুললেই মুখে ঝাপটা গরম হাওয়ার। তবু থামে না জীবন। কেউ ক্লাসে যান, কেউ অফিসে, কেউবা সান্ধ্য নিমন্ত্রণে। যে যেখানেই থাকুন, পোশাকে আরাম ও স্টাইল তো চাই-ই, তাই না?
সেইলরের প্রধান ফ্যাশন ডিজাইনার সোমা সাদিয়া বলছিলেন, ‘অনেক দিন ধরে টাইট ফিট, ভারী কাপড়, গাঢ় রঙের পোশাক প্রাধান্য পেলেও গরমের দিনে ফ্যাশন আরামদায়ক হওয়া শ্রেয়। স্টাইল বজায় রাখার পাশাপাশি দিনভর নানা কাজকর্ম ও চলাচলে স্নিগ্ধতার বার্তা ছড়ানোও জরুরি। তাই বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ সামার সিজনের পোশাক ডিজাইনে ব্রিদেবল ভাবনার ওপর জোর দিচ্ছে।’ তার কথায়, কাপড়ই আরামের মূল উৎস। কটন, লিনেন, মসলিন— এই ফেব্রিকগুলো শুধু হালকা বলেই নয়, এগুলোর ভেতর দিয়ে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে। কোনো পোশাক যত সুন্দরই হোক, তাতে যদি বাতাস চলাচল না করে, তবে মিলবে না স্বস্তি। আর স্বস্তি না থাকলে সেই স্টাইলেরও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম।
লা রিভের ডিজাইন ও ক্রিয়েটিভ বিভাগের ম্যানেজার মারুফা ইয়াসমিন জানান, তাদের ব্র্যান্ড মূলত সামার টাইম ফেস্টিভ মাথায় রেখে পোশাকের নকশা সাজায়। ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন ট্রেন্ড ও বাংলাদেশের আবহাওয়ার সমন্বয়ে বাছাই চলে রঙের। মন ভালো করার অনুভূতি স্থায়ী করে, এমন সব কালার প্যালেট দিয়েই লা রিভের সামারের কালেকশন। রঙগুলো ভাগ করা হয়েছে কয়েক ধাপে। সফট প্যালেটে আছে লিচুর মতো ট্রান্সলুসেন্ট হোয়াইট, বাটারক্রিম, বেজ, লাইট ক্লে, ওয়ালনাট ব্রাউন ইত্যাদি। গরমের সময় এসব রঙ চোখে আরামের অনুভূতি ছড়ায়। অন্যদিকে জেড টিল, শ্যাওলা সবুজ, হলুদ, লাইলাক, ওয়াইন রেড, বারগান্ডি, মেরুন রেড, ডিপ ব্লু ওশানের শেডও ব্যবহার করা হয়েছে। ‘আন্তর্জাতিক ফ্যাশনেও এখন ব্রিদেবল ফেব্রিককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই আমরা পিওর কটন ও ভিসকোসের পাশাপাশি ব্লেন্ডেড ফেব্রিকে ফোকাস করেছি; যেমন কটন ও ভিসকোস ব্লেন্ড, রেয়ন ব্লেন্ড, কটন ব্লেন্ড জর্জেট, হালকা ফেইলি, ব্লেন্ডেড ক্রেপ ও জুম। এই কাপড়গুলোয় কটন, ভিসকোস অথবা লায়োসেলের ব্লেন্ড থাকায় গরম লাগে না; বরং তাপ ও ঘাম শুষে শরীরে শীতল অনুভূতি দেয়। বাতাস চলাচলও সম্ভব হয়’, বললেন সোমা।
সময়োপযোগী ফেব্রিকের গল্প আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে কাপড়ের দোকানি আবদুল কাদেরের কথায়। রাজধানীর নিউ মার্কেটের ভিড়ভাট্টার মধ্যে তার দোকানে এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে সুতি আর লিনেনের কাপড়। বললেন, ‘গরম শুরু হলেই মানুষ বুঝে যায়, কোন কাপড় তার দরকার। এখন কটন, মলমল, লিনেনের চল বেশি। আগে অনেকেই একটু চকচকে কাপড় কিনতেন; এখন সবাই খোঁজেন আরাম।’
কোনো পোশাক যত সুন্দরই হোক, তাতে যদি বাতাস চলাচল না করে, তবে মিলবে না স্বস্তি। আর স্বস্তি না থাকলে সেই স্টাইলেরও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম
রঙ, মন আর ডোপামিন
গরমের দিনে শুধু শরীর নয়, মনও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এখানেই আসে ডোপামিনের প্রসঙ্গ, যাকে বলে ‘ফিল-গুড’ হরমোন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, রঙ আমাদের মনমানসিকতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। বাটার ইয়েলো, সফট পিঙ্ক, স্কাই ব্লু বা মিন্ট গ্রিনের মতো কোমল উজ্জ্বল রঙ মনকে হালকা করে; ক্লান্তি কমায়। এই ধারণা থেকেই এসেছে ডোপামিন ড্রেসিং, যেখানে পোশাকের রঙ হয়ে ওঠে মানসিক স্বস্তির উপায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সুতি নয়, মসলিন বা টেরি ক্লথও বেশ সুবিধাজনক। লিনেন কাপড় দেখতে যেমন আভিজাত্যপূর্ণ, তেমনি রোদ প্রতিরোধে বেশ কার্যকর। আমাদের দেশি খাদি বা খদ্দরের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। একসময় একে সাদামাটা মনে করা হলেও এখন নানা রঙের ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে অভিজাত ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
গরমের পোশাকে কোন রঙ আরাম দেবে— এমন প্রশ্নে জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের গবেষণায় দেখা গেছে, সাদার অবস্থান শীর্ষে। রোদের তাপ প্রতিফলিত করার ক্ষমতাই একে অন্য রঙ থেকে এগিয়ে রেখেছে। এরপরই অবস্থান হলুদ, ধূসর ও লালের। এই রঙগুলো শরীরকে তুলনামূলক শীতল রাখতে সহায়ক। তবে কালো এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ, এটি তাপ শোষণ করে শরীরকে আরও গরম করে তোলে। এ ছাড়া বাটার ইয়েলো, মিন্ট গ্রিন বা আইসি ব্লু রঙের পোশাক এ সময়ে শরীর ও চোখের পাশাপাশি মনেও এনে দিতে পারে প্রশান্তি।
বৈশ্বিক আঙিনায় গ্রীষ্মের ভাষা
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন হাউজগুলোও এখন একই পথে হাঁটছে। শ্যানেল তাদের সামার কালেকশনে বেছে নিয়েছে প্যাস্টেল ল্যাভেন্ডার ও হালকা হলুদ। গুচি ব্যবহার করেছে গাঢ় টমেটো রেড ও ক্লাসিক কালো। লুই ভিতোঁর পোশাকে খেলা করছে সিলভার ও গোল্ডের ঝলক। ডিওরের সংগ্রহে দেখা যাচ্ছে ডিপ গ্রিন ও সফট পিক্টোরিয়াল শেড। প্রাদার সামার লাইনে আছে অলিভ গ্রিন ও ঘাসের মতো সবুজ। ভারসাচি বেছে নিয়েছে উজ্জ্বল নিয়ন হলুদ ও পপ কালার। লোয়ি ব্যবহার করছে নিউট্রাল আর্থ টোনের সঙ্গে উজ্জ্বল কমলার সংমিশ্রণ।
দেশি ফ্যাশনেও এই ধারা বহমান। জারা, এইচ অ্যান্ড এম, ইউনিক্লোর সাম্প্রতিক কালেকশনে দেখা যাচ্ছে ঢিলেঢালা কাট, ন্যাচারাল ফেব্রিক এবং প্যাস্টেল রঙের ব্যবহার। ইউনিক্লোর এয়ারিজম প্রযুক্তি গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করছে। অন্যদিকে জারা ও এইচ অ্যান্ড এম গুরুত্ব দিচ্ছে ফ্লুইড সিলুয়েট ও কমফোর্টেবল ডিজাইনে। বিশ্বরঙ ও রঙ বাংলাদেশ দেশীয় কাপড় ও রঙকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করেছে। ইয়েলো ও আড়ংয়ের সংগ্রহেও দেখা যাচ্ছে হালকা রঙের পাশাপাশি গাঢ় রঙের প্রাধান্য; সঙ্গে ঢিলেঢালা কাট ও ব্রিদেবল ফেব্রিক।
সব মিলিয়ে বার্তা পরিষ্কার— গরমে ফ্যাশন মানেই আরামকে বেছে নেওয়া। এমন পোশাক, যা দেখতে ভালো এবং শরীরকে রাখে স্বস্তিতে, মন করে ফুরফুরে। কারণ, এই তীব্র গরমে স্বস্তিই সবচেয়ে বড় স্টাইল স্টেটমেন্ট। দুপুরবেলা যখন রোদের তেজ প্রখর, তখন বাইরে বের হওয়ার জন্য ঢিলেঢালা সুতি বা লিনেনই সেরা। অনেকে ভাবেন, হাফহাতা পরলেই আরাম; কিন্তু রোদ থেকে বাঁচতে ফুলহাতা বা বড় হাতা অনেক সময় বেশি কার্যকর। অফিসের ফরমাল লুকে পছন্দের রঙের লিনেন শার্ট বা সুতির শাড়ি বেশ মানানসই।
কেনাকাটা বা ঘোরাঘুরিতে আঁটসাঁট জিন্সের বদলে ঢিলেঢালা কাফতান বা ওভারসাইজড টি-শার্ট বেছে নিলে চলাফেরায় স্বস্তি। সন্ধ্যায় আবহাওয়া কিছুটা নরম হলেও ভ্যাপসা গরম থেকে যায়। তাই দাওয়াত বা আড্ডার সাজে ভারী সিল্ক এড়িয়ে চলা মঙ্গল। এর বদলে পাতলা জর্জেট, শিফন বা মসলিন শাড়ি হতে পারে দারুণ পছন্দ। মোগল ঘরানার ফিউশন গাউনগুলোও এখন বেশ জনপ্রিয়— দেখতে সুন্দর, পরতেও আরাম।







