ঋতুপর্ণের সিনেমায় নায়িকাদের সাজে থাকত তারই শাড়ি-গয়না

ঋতুপর্ণ ঘোষ। ছবি: সংগৃহীত
বাংলা চলচ্চিত্রের ভাষা ও ভাবনার জগৎ বদলে দেওয়া অনন্য এক জাদুকর ঋতুপর্ণ ঘোষ। ক্যামেরার পেছনে তিনি শুধু গল্পই বাঁধেননি, বরং সমাজের সচেতনে-অচেতনে লুকিয়ে রাখা মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতির রূপকার হয়ে উঠেছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের এ নন্দিত নির্মাতা তার সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের জটিলতা ও নীরব হাহাকার। আজ তার জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তিনি পা দিতেন ৬৩ বছরে। তবে শারীরিক উপস্থিতিকে ছাপিয়ে তার অমর সৃষ্টি ও বৈপ্লবিক ভাবনা আজও বাংলা সিনেমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
ঋতুপর্ণ ঘোষ শুধু কাজের ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমী ছিলেন না, তার যাপন ও জীবনধারায় ছিল এক অনন্য মৌলিকতা। যেকোনো ভিড়ের মধ্যেও নিজের চিন্তা-চেতনা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য দিয়ে তিনি অনায়াসেই আলাদা হয়ে উঠতেন। জীবনের শত পথচলা ও ঘাত-প্রতিঘাত সামলেও তিনি কখনো নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্য থেকে সরে যাননি; বরং চিরকাল নিজের আদর্শে অটল থেকেছেন।
শাড়ি-গয়না বেশ পছন্দ করতেন ঋতুপর্ণ। তাই তার সিনেমার নায়িকাদের সাজসজ্জা, শাড়ি ও গয়না সব সময়ই আলাদা মাত্রা পেত। মজার বিষয় হলো, সিনেমায় ব্যবহৃত এই শাড়ি ও গয়নাগুলোর বেশিরভাগই ছিল তার ব্যক্তিগত সংগ্রহের।
নির্মাতা ও সংগীতশিল্পী অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে উঠে আসে ঋতুপর্ণের এ বিশেষ অনুরাগের কথা। তিনি জানান, ঋতুপর্ণের এই সাজপোশাকপ্রীতি বা পোশাকের ভিন্নতা সেই সময়ে সমাজ কিংবা কাছের মানুষের কাছেও সবসময় সহজবোধ্য ছিল না; অনেকেই তা দেখে অস্বস্তি বোধ করতেন।
‘রোববার’ পত্রিকার ‘ঋইউনিয়ন’ কলামে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় তার স্মৃতিচারণ করে লেখেন, মজার ছলেই ঋতুদা একবার জানিয়েছিল, তার গয়নাপ্রীতির কথা। সিনেমার নায়িকারা যত গয়না পরে, আসলে সবই যে ঋতুদার, সেটা শুনে অবাক হয়েছিলাম বিস্তর। বলো কী! সব তোমার? ঋতুদা হাসত। ‘শাড়িগুলোও আমার।’ কী করো অত জিনিস নিয়ে? ঋতুদা বলত, ‘কিছুই করি না, কখনো ইচ্ছে হলে পরব ভবিষ্যতে’।
অনিন্দ্য আরও এক ঘটনা জানালেন এভাবে, “ঋতুদার শাড়ি-গয়নায় সজ্জিত চেহারাটা হজম করতেই অসুবিধে হত। যেমন হয়েছিল বুদ্ধদেব গুহর মেয়ের বিয়েতে। ঋতুদা একটা জমকালো চুড়িদারের মতো পোশাক পরেছিল, সঙ্গে ওড়না ও পাগড়ি। আমায় দেখে বলল, ‘আয়, একটা ছবি তুলি।’ লজ্জায় পালিয়ে গিয়েছিলাম। আসলে ঋতুদার মনের মধ্যে যে অন্য একটা মন আছে, সেটা বুঝেও বুঝতে চাইতাম না। সমাজের চোখে পোশাকের একটা টাইপ আছে। হিসেব এদিক থেকে ওদিক হয়ে গেলে সব গণ্ডগোল পাকিয়ে যায়। টি-শার্ট আর জিন্স পরা ঋতুদাকে এই পোশাকে অচেনা লাগছিল। যেন মনে হচ্ছিল লোকটা বদলে গেছে!”
১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তার বাবা সুনীল ঘোষ পেশায় ছিলেন একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী। অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি কপিরাইটিংয়ের মাধ্যমে নিজের সৃজনশীল কর্মজীবন শুরু করেন এবং আশির দশকে একজন সফল কপিরাইটার হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
১৯৯২ সালে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন তার প্রথম সিনেমা ‘হিরের আংটি’। এর দুবছর পর মুক্তি পাওয়া দ্বিতীয় সিনেমা ‘উনিশে এপ্রিল’ যা তাকে এনে দেয় ব্যাপক প্রশংসা ও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা।
পরে তিনি একে একে উপহার দেন ‘দহন’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘অসুখ’, ‘উৎসব’, ‘তিতলি’, ‘শুভ মহরৎ’, ‘চোখের বালি’, ‘অন্তরমহল’, ‘দোসর’, ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’, ‘খেলা’, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’, ‘আবহমান’, ‘নৌকাডুবি’, ‘চিত্রাঙ্গদা’ এবং ‘সত্যান্বেষী’-র মতো অসংখ্য সমাদৃত চলচ্চিত্র।
ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন ভারতের অন্যতম প্রশংসিত এক চলচ্চিত্র নির্মাতা। কর্মজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন বিভাগে তিনি ১২টি ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন; পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও লাভ করেন ব্যাপক খ্যাতি ও সম্মান।
দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর ২০১৩ সালের ৩০ মে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রখ্যাত এ নির্মাতা পরলোকগমন করেন।








