হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
সুরের অনন্ত যাত্রা

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৬ জুন ১৯২০ – ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯)
বাংলা গানের ইতিহাসে এমন কিছু কণ্ঠশিল্পী আছেন, যারা কেবল গায়ক নন- তারা নিজেরাই একেকটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাদের মধ্যে অন্যতম। ‘ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর’ বলে যাকে বর্ণনা করা হয়েছিল, সেই কণ্ঠের অধিকারী এই শিল্পী বাংলা, হিন্দি এবং আরও নানা ভারতীয় ভাষার গানে ছড়িয়ে দিয়েছেন এক অনন্য সুরমাধুরী।
বারাণসীর এক চিকিৎসক-মাতামহের বাড়ির অন্ধকুঠিতে জন্মানো থেকে শুরু করে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র নগরীর আলোকোজ্জ্বল বাতাবরণে প্রবেশ, আবার সেই নগরী থেকে কলকাতার সুরের মঞ্চ- সব মিলিয়ে এক অসাধারণ অধ্যায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, যা আজও শ্রোতার হৃদয়ে সুরে-বাণীতে অনুরণিত হয়। তিনি ছিলেন একাধারে কণ্ঠসঙ্গীত শিল্পী, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং প্রযোজক। হিন্দি সঙ্গীত জগতে তিনি হেমন্ত কুমার নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি দু-বার শ্রেষ্ঠ পুরুষ নেপথ্য গায়ক হিসেবে ভারতের জাতীয় পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার সহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন।
১৯২০ সালের ১৬ জুন বারাণসীতে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। পিতা কালিদাস মুখোপাধ্যায় এবং মাতা কিরণবালা দেবী। তার মাতামহ ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক। পৈতৃক নিবাস ছিল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার জয়নগরের বহরু গ্রামে। পরিবার কলকাতায় চলে আসে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে। ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়ার সময় তার সঙ্গে পরিচয় হয় ভবিষ্যতের কিংবদন্তি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। সেই সময়ে হেমন্ত ছোট গল্প লিখতেন, সুভাষ কবিতা লিখতেন এবং সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে তাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলেও সঙ্গীতের টানে সেই পড়া ত্যাগ করেন। তার সাহিত্যিক হওয়ার ইচ্ছে ছিল; কিছুদিন তিনি ‘দেশ’ পত্রিকার জন্যও লিখেছিলেন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন।
১৯৩৫ সালে বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রভাবে আকাশবাণীতে তার প্রথম গান রেকর্ড হয়। গানের প্রথম লাইন ছিল ‘আমার গানেতে এলে নবরূপী চিরন্তনী’। প্রারম্ভিক জীবনে তিনি পঙ্কজ মল্লিককে অনুসরণ করতেন, তাই ডাকনাম ছিল ‘ছোটো পঙ্কজ’। ১৯৩৭ সালে কলাম্বিয়া লেবেলে তার প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয়- ‘জানিতে যদি গো তুমি’ এবং ‘বলো গো বলো মোরে’। এরপর ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়ার জন্য তার চলচ্চিত্রের বাইরের রেকর্ড প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৪০ সালে ‘রাজকুমারীর নির্বাসন’ ছবিতে প্রথম বাংলা গান ‘জাগো প্রথম প্রণয়’ এবং ‘বন্ধু হে’ প্লেব্যাক করেন, সুর দিয়েছিলেন আরেক কিংবদন্তি শচীন দেব বর্মন। ১৯৪১ সালে ‘নিমাই সন্ন্যাস’ ছবিতে ছবি বিশ্বাসের ঠোঁটে ‘কহা কানু কহি’ গানটি প্লেব্যাক করেন। ১৯৪৪ সালে পণ্ডিত অমরনাথের সুরে ‘ইরাদা’ ছবিতে প্রথম হিন্দি গান গেয়েছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতে তার প্রথম রেকর্ড ছিল ১৯৪৪ সালে ‘প্রিয় বান্ধবী’ ছবির জন্য- ‘পথের শেষ কোথায়’। একই বছর কলাম্বিয়া লেবেলের অধীনে চলচ্চিত্রের বাইরে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেন- ‘আমার আর হবে না দেরি’ এবং ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’।
১৯৪০-এর দশকে হেমন্ত ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)র সক্রিয় সদস্য হয়েছিলেন এবং আর এক আইপিটিএ সদস্য- সঙ্গীত রচয়িতা এবং সঙ্গীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর সান্নিধ্যে সঙ্গীতনাট্যানুষঙ্গ শুরু করেছিলেন। আইপিটিএ সংস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং এর প্রতিরোধে ব্রিটিশ শাসক ও সম্পদশালী ভারতীয়দের নিষ্ক্রিয়তা। ১৯৪৯ সালে সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে চলচ্চিত্রের বাইরে ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা’ রেকর্ড করেন। দু-পিঠের ৭৮ আরপিএম এ ছয় মিনিটের ওই ডিস্ক রেকর্ডে বাংলার ভিন্ন গতির এক আবেগমথিত প্রচলিত কাঠামোকে ধারণ করেছিল। এই গান এক উন্নত এবং মমতাময়ী গ্রাম্য নারীর জীবন ও পরিবারকে সরল শান্ত মনোরম করে ফুটিয়ে তুলেছিল এবং বর্ণিত হয়েছিল কীভাবে দুর্ভিক্ষের দৈত্য লোকালয়ের পর লোকালয় গ্রাস করে চলেছিল। এই গান হেমন্ত এবং সলিলকে পূর্ব ভারতে এক অভাবনীয় জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল, এককথায়, হেমন্তকে তার সমসাময়িক পুরুষ গায়কদের থেকে এগিয়ে দিয়েছিল।
১৯৪৭ সালে ‘অভিযাত্রী’ ছবির মাধ্যমে সংগীত পরিচালক হিসেবে তার যাত্রা শুরু। ১৯৫১ সালে হেমেন গুপ্তের আমন্ত্রণে তিনি মুম্বাই পাড়ি দেন এবং ফিল্মিস্তান স্টুডিওতে যোগ দেন। ‘আনন্দমঠ’ (১৯৫২) ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘বন্দে মাতরম’ গানটির সুর করেন। বলিউডে নেপথ্য গায়ক হিসেবে দেব আনন্দের জন্য তার গানগুলি খুব জনপ্রিয় হয়- ‘ইয়েহ রাত ইয়েহ চাঁদনি’, ‘চুপ হ্যায় ধরতি’, ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা’, ‘তেরি দুনিয়া মে জীনে সে’, ‘না তুম হামে জানো’- প্রতিটি গানই মনে মনে বেজে ওঠে এখনও পাঠকের। ১৯৫৪ সালে ‘নাগিন’ ছবির সংগীত পরিচালনা করে ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ সংগীত নির্দেশনা পুরস্কার জেতেন। এই ছবির গানগুলি টানা দুই বছর তালিকা-শীর্ষে ছিল। ১৯৫৫ সালে ‘শাপমোচন’ ছবিতে উত্তম কুমারের জন্য নেপথ্য কণ্ঠে গান গেয়ে হেমন্ত-উত্তম জুটির সূচনা করেন। এই ছবির গানগুলি- ‘শোনো বন্ধু শোনো’, ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো’, ‘বসে আছি পথ চেয়ে’, ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’- বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। উত্তম-হেমন্ত জুটি পরবর্তী দশক জুড়ে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ভীষণ জনপ্রিয় গায়ক-নায়ক জুটি ছিলেন।
১৯৫৯ সালে ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবির মাধ্যমে হেমন্ত-বেলা প্রোডাকশন্স নামে প্রযোজনা শুরু করেন। মৃণাল সেন পরিচালিত এই ছবিটি রাষ্ট্রপতির স্বর্ণ পদক লাভ করে। পরে এই কোম্পানি গীতাঞ্জলি প্রোডাকশন্স নামে হিন্দি ছবি প্রযোজনা করে- ‘বিশ সাল বাদ’, ‘কোহরা’, ‘বিবি অওর মকান’, ‘ফরার’, ‘রাহগির’, ‘খামোশি’। ষাটের দশকে হেমন্ত বাংলার প্রধান পুরুষ গায়ক হিসেবে নিজের জায়গা ধরে রাখেন এবং হিন্দি চলচ্চিত্রের সঙ্গীতকার ও গায়ক হিসেবে পরিগণিত হন। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যগুলোর প্রধান পুরুষ কণ্ঠ ছিলেন তিনি- বাল্মিকী প্রতিভা, শ্যামা, শাপমোচন, চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে ‘হেমন্ত-কণিকা-সুচিত্রা’ ত্রয়ী রবীন্দ্রসঙ্গীতের জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধাষ্পদ শিল্পী ছিলেন। ১৯৬৬ সালে ‘মণিহার’ ছবির সুর করেন, যা প্রথম প্ল্যাটিনাম জুবিলী উদযাপনকারী ছবি। ১৯৬৭ সালে মুকেশের কণ্ঠে ‘মনকে কিছু বলো না’ এবং ‘আমার মনের কত’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ সালে ‘পলাতক’ ছবিতে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলা লোকসংগীত ও লঘু সঙ্গীতের সংমিশ্রণ ঘটান- যা ‘জীবনপুরের পথিক’, ‘আহা কৃষ্ণ কালো’-র মতো গানে বড়ো সাফল্য আনে।
১৯৭০-এর দশকে হিন্দি চলচ্চিত্রে নামমাত্র অবদান থাকলেও বাংলায় তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত, চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রের বাইরের গানের বিশিষ্ট শিল্পী ছিলেন। এই সময়ের জনপ্রিয় গানগুলির মধ্যে আছে ‘যদি জানতে চাও’ (১৯৭২), ‘একগোছা রজনীগন্ধা’, ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ (সলিল চৌধুরীর সুরে), ‘সেদিন তোমায় দেখেছিলাম’ (১৯৭৪), ‘খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার’ (স্ত্রী, ১৯৭২), ‘কে জানে ক’ঘণ্টা’ (সোনার খাঁচা, ১৯৭৪), ‘যেওনা দাঁড়াও বন্ধু’ (ফুলেশ্বরী, ১৯৭৪)। ১৯৭১ সালে ‘নিমন্ত্রণ’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ গায়কের জাতীয় পুরস্কার পান। ১৯৭১ সালে কনরাড রুকসের ‘সিদ্ধার্থ’ ছবিতে নেপথ্য গায়ক হিসেবে গান গেয়ে হলিউডে পা রাখা প্রথম ভারতীয় হয়ে ওঠেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে মেরিল্যান্ড, বাল্টিমোরের নাগরিকত্ব দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৮০ সালে প্রথম স্ট্রোকের শিকার হন হেমন্ত, ফলে কণ্ঠস্বরের মারাত্মক ক্ষতি হয়, তবু তিনি থামাননি গান রেকর্ড করা। ১৯৮৮ সালে ‘লালন ফকির’ ছবিতে গান গেয়ে দ্বিতীয়বার জাতীয় পুরস্কার পান। একই বছর ‘আমার গানের স্বরলিপি’ নামে তার আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রভাব বাংলা গানের প্রতিটি শাখায় বিস্তৃত- রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে আধুনিক গান, লোকগীতি থেকে চলচ্চিত্রের নেপথ্য কণ্ঠ। তার মৃত্যুর পর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়, তবু বাংলা গানে তাঁর উত্তরাধিকার দিন দিন আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে। তিনি যে ধাঁচে গান গেয়েছেন- সহজাত আন্তরিকতা, শব্দের স্পষ্ট উচ্চারণ এবং সুরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা- তা পরবর্তী প্রজন্মের গায়কদের কাছে এক আদর্শ হয়ে রয়েছে। শ্যামল মিত্র, মান্না দে, সুমন কল্যাণপুর, অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আজকের প্রজন্মের গায়ক- সবাই কোনও না কোনওভাবে হেমন্তের গায়কীর প্রভাব বহন করেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে হেমন্তের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেবব্রত বিশ্বাস স্বয়ং তাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত জনপ্রিয় করার ‘দ্বিতীয় নায়ক’ বলে অভিহিত করেছিলেন- প্রথম জন কিংবদন্তি পঙ্কজ কুমার মল্লিক। হেমন্তের গাওয়া ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’, ‘যখন ভাঙলো মিলন’, ‘আমার এ পথ’, ‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে’, ‘আগুনের পরশমণি’- এই গানগুলি আজও রবীন্দ্রসঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ রেকর্ডিং হিসেবে বিবেচিত। তিনি রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যগুলোর প্রধান পুরুষ কণ্ঠ হয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে মঞ্চ থেকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতেও হেমন্তের অবদান অমূল্য। উত্তম কুমারের সঙ্গে তার জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সফল গায়ক-নায়ক জুটি। ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘মণিহার’, ‘অদ্বিতীয়া’, ‘ফুলেশ্বরী’, ‘দাদার কীর্তি’- এই ছবিগুলোর গান আজও বাঙালির মুখে মুখে। তিনি দেখিয়েছিলেন, নেপথ্য গায়ক কেবল নায়কের ঠোঁটে গান গেয়ে দেন না- তিনি চরিত্রের আবেগ, যন্ত্রণা, আনন্দ সবকিছু কণ্ঠে ধারণ করেন।
হেমন্তের মানবিকতা ও ব্যক্তিত্বও তার উত্তরাধিকারের অংশ। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বহড়ু গ্রামে তার প্রয়াত পিতার স্মরণে তিনি একটি হোমিয়োপ্যাথিক হাসপাতাল চালাতেন। জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য ব্যক্তি ও পরিবারকে আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য করেছিলেন, যা তার মৃত্যুর পরেই প্রকাশ্যে আসে। তার স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায় ‘আমার স্বামী হেমন্ত’ নামে স্মৃতিকথা লিখেছেন। ১৯৮৭ সালে তাকে পদ্মভূষণ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলে তিনি বিনীতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন- ১৯৭০ সালে পদ্মশ্রীও একইভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া তার প্রয়াণের প্রায় দুই দশক পরেও প্রত্যেক বছর অন্তত একটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অ্যালবাম প্রকাশ করে, যা প্রমাণ করে তার গানের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও শ্রোতার চাহিদা আজও অটুট। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তার গানগুলির শ্রবণসংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়ে গেছে। বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটেছিল তার মৃত্যুতে, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এক অফুরন্ত সুরসম্ভার- যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলবে।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রভাব কেবল পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল না- বাংলাদেশের আধুনিক গানেও তার ছাপ সুস্পষ্ট। ষাট ও সত্তরের দশকে ঢাকা ও কলকাতার সঙ্গীতজগৎ একই সুরে বাঁধা ছিল হেমন্তের কণ্ঠে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত গায়ক ফিরোজ সাঁই, আব্দুল জব্বার, মাহমুদুন্নবী, সৈয়দ আব্দুল হাদী- সবাই হেমন্তের গায়কীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তার স্টাইল অনুসরণ করতেন। বাংলাদেশের আধুনিক গানের জনপ্রিয়তা ও বিস্তারে হেমন্তের গাওয়া ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ও নদীরে’- এই গানগুলি প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে মান্না দে, শ্যামল মিত্র, হেমন্তের সমসাময়িক ও পরবর্তী গায়করা তার সুরের নৈপুণ্য ও কণ্ঠের আন্তরিকতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। আধুনিক বাংলা গানে তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন, সহজ-সরল মেলোডি প্রধান গানেও গভীর আবেগ ও জীবনবোধ ধারণ করা সম্ভব। সলিল চৌধুরীর সঙ্গে তার যুগলবন্দি বাংলা আধুনিক গানকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল- ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা’, ‘ধান কাটার গান’, ‘রানার ছুটেছে’- এই গানগুলি আজও আধুনিক বাংলা গানের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
বাংলা চলচ্চিত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নেপথ্য কণ্ঠ এক বিপ্লব এনেছিল। তিনি কেবল গান গেয়ে দিতেন না- তিনি চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেতেন। উত্তম কুমারের অভিনয়ের সঙ্গে তার কণ্ঠ এমনভাবে মিলেমিশে যেত যে দর্শক কখনও অনুভব করতেন না যে গানটি অন্য কেউ গেয়েছে। ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবির ‘ও নদীরে’ গানটি যখন বাজত, তখন উত্তমের চরিত্রের বেদনা যেন হেমন্তের কণ্ঠেই জীবন্ত হয়ে উঠত। ‘হারানো সুর’ ছবির ‘আজ দুজনার দুটি পথ’- এই গানটি বিবাহবিচ্ছেদের যন্ত্রণা ও নতুন পথের সন্ধানের গল্প বলেছিল হেমন্তের কণ্ঠে। ‘সপ্তপদী’ ছবির ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’- এই গানটি সুচিত্রা সেন ও উত্তম কুমারের রোমান্সকে অমর করে দিয়েছে। ‘মণিহার’ ছবির ‘কে যেন গো ডেকেছে’, ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ’- এই গানগুলিতে হেমন্তের কণ্ঠ যেন ছবির প্রতিটি ফ্রেমে আলো ফেলেছে। ‘অদ্বিতীয়া’ ছবির ‘আহা প্রজাপতি’, ‘চঞ্চল মন আনমনা হয়’- এই গানগুলি বাংলা ছবির সংগীত ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র। ‘ফুলেশ্বরী’ ছবির ‘যেওনা দাঁড়াও বন্ধু’, ‘টাপুর টুপুর বৃষ্টি’- এই গানগুলি হেমন্তের সুর ও কণ্ঠে অমর হয়ে আছে। ‘দাদার কীর্তি’ ছবির ‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে’- এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি হেমন্তের কণ্ঠে এতটাই জনপ্রিয় হয় যে আজও এই গানটি শুনলে দাদার কীর্তি ছবির সেই দৃশ্যই চোখে ভেসে ওঠে। হেমন্ত প্রমাণ করেছিলেন, চলচ্চিত্রের গান কেবল বিনোদন নয়- তা চরিত্রের আবেগ, সামাজিক বাস্তবতা ও জীবনদর্শনের বাহক হতে পারে।
১৯৮৯ সালের ৩১ মে আকাশবাণীর জন্য তিনটি গান রেকর্ড করেন- ‘মাথার উপর আকাশ’, ‘ঐ মূর্তিটা তৈরি’ এবং সর্বশেষে ‘একটাই শুধু প্রশ্ন আমার’। শেষ গানটি তার মৃত্যুর আগে প্রকাশ করতে নিষেধ করেন; মৃত্যুর পরদিন গানটি রেডিওতে প্রচারিত হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্র সদনে শেষবারের মতো সংগীত পরিবেশন করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ রাত ১১:১৫টায় দক্ষিণ কলকাতার এক নার্সিংহোমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, “রবীন্দ্রসঙ্গীতের দ্বিতীয়বার মৃত্যু হল।” পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত পত্রিকা যুগান্তর শিরোনাম করে, "হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু; বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অবসান"।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রাপ্ত পুরস্কারগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য- পদ্মশ্রী (১৯৭০, অস্বীকৃত), পদ্মভূষণ (১৯৮৭, অস্বীকৃত), ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ সংগীত নির্দেশনা (নাগিন, ১৯৫৬), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (নিমন্ত্রণ ১৯৭১, লালন ফকির ১৯৮৬), সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৬), মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার (১৯৮৯)। তিনি দুবার ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ১৯৮৫ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাম্মানিক ডি.লিট প্রদান করে। ২০১২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা মৈত্রী পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয় এই মহান শিল্পীকে।
বলুন তো, আপনার শোনা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কোন গানটি আপনার সবথেকে প্রিয়?








