কলেজ ভর্তিতে কোটা বাতিলের প্রস্তাব, ভরসা জিপিএতেই
- নাকচ পরীক্ষা ও লটারি
- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত কোটায় মিলছে না শিক্ষার্থী। তাই চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে এসেছে এই কোটা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব। একই সঙ্গে আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অধীনস্থ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২ শতাংশ কোটা বাতিলের প্রস্তাব। মেধার ভিত্তিতে শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতেই এসব প্রস্তাব দিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।
আজ মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের সভায় এ প্রস্তাব নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। যেহেতু কোটা বাতিলের বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর— তাই অভিভাবক, শিক্ষক প্রতিনিধি ও নামি কলেজগুলোর প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে চলতি সপ্তাহেই আরও বড় পরিসরে বৈঠক ডেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে সভায় দুটি কোটাই বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা।
শিক্ষা বোর্ডের সূত্রমতে, বর্তমানে একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে মোট ৭ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত। এর মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১ শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ১ শতাংশ অধীনস্থ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য।
ভর্তি প্রক্রিয়ার কারিগরি দায়িত্বে থাকা বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোয় ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পর্যাপ্ত যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি। অনেকে নাতি-নাতনিদের জন্য এই কোটায় আবেদন করলেও পরে উপযুক্ত কাগজপত্র দাখিল করতে না পারায় জটিলতায় পড়েন। ফলে স্কোর থাকা সত্ত্বেও মেধাতালিকা থেকে ছিটকে গিয়ে ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ হারান তারা। এসব কোটা বাতিলের পক্ষে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের একই যুক্তি।
তারা বলছে, কলেজ ভর্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরের কোটা থাকা উচিত নয়। এটা সরাসরি বৈষম্য। বুয়েট জানায়, সরকারি গেজেট অনুযায়ী, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারিত হয়েছে ১২ বছর ৬ মাস। বর্তমানে জীবিত একজন মুক্তিযোদ্ধার সর্বনিম্ন বয়স ৮০ বছর ৭ মাস। সে হিসাবে তাদের সন্তানদের কলেজ ভর্তিতে না পাওয়া যুক্তিসঙ্গত।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড থেকে একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে সব ধরনের কোটা বাতিলের প্রস্তাব নিয়ে জানতে চাওয়া হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের কাছে।
আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, ‘এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত করতে আমরা বড় পরিসরে আরেকটি মিটিং ডেকেছি। ওই বৈঠকে অভিভাবক, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং দেশের বড় বড় কলেজের প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। সবার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রসঙ্গে শিক্ষাসচিব স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘এই কোটায় পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে তা পূরণ করা হয়। তারপরও যেহেতু বিষয়টি স্পর্শকাতর ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার, তাই আরও উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
বৈঠকে থাকা একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘কোটা বাতিলের পক্ষে আনা প্রস্তাব ও যুক্তি বাস্তবসম্মত বলে সবাই মত দেন। তবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, যেহেতু ইস্যুটি মুক্তিযোদ্ধা কোটাসংক্রান্ত, সিদ্ধান্তটি তিনি সরকারের সর্বোচ্চ মহল ও ক্যাবিনেটে অন্য সদস্যদের মতামত নিয়েই করতে চান।’
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমরা অনেকগুলো প্রস্তাব দিয়ে একটি ভর্তি নীতিমালা করেছি, যেটি গতকাল বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে কোটা পদ্ধতি বাতিলের বিষয়টিও ছিল। এ ছাড়া বিদ্যমান পদ্ধতি ছাড়াও ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই এবং লটারিতে বাছাই করার মতো পদ্ধতি ছিল। তবে কোনটি চূড়ান্ত হবে সেটি আরেকটি সভা করে চূড়ান্ত হতে পারে।’
বহাল থাকছে জিপিএভিত্তিক ভর্তি, নাকচ পরীক্ষা ও লটারি
২০১১ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সশরীরে কলেজে যেত। লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদন ফরম কিনে আবার সেই কলেজেই জমা দিত। এরপর প্রতিটি কলেজ ভর্তি পরীক্ষা বা জিপিএ’র ভিত্তিতে মেধাতালিকা প্রকাশ করত। এতে একজন শিক্ষার্থীকে ৫-৬টি কলেজে আবেদন করতে হতো। একই সময়ে একাধিক কলেজে নাম আসত; কিন্তু একটিতে ভর্তি হতো বাকি আসনগুলো আটকে থাকত।
পরবর্তী সময়ে অপেক্ষামাণ তালিকা থেকে সিট পূরণ করতে করতে ক্লাস শুরুর ১-২ মাস পার হয়ে যেত। ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বুয়েটের কারিগরি সহায়তায় দেশব্যাপী প্রথমবারের মতো অনলাইন ও টেলিটক এসএমএসের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা চালু করে। এতে ইন্টারনেটে বা টেলিটক মোবাইল থেকে এসএমএস পাঠিয়ে এক আবেদনেই একাধিক কলেজের পছন্দক্রম দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ডেটা হ্যান্ডেল করতে গিয়ে ভর্তির ওয়েবসাইটটি বারবার ক্র্যাশ হয়, কারিগরি ত্রুটির কারণে জিপিএ ৫ পেয়েও অনেকে কোনো কলেজ পায়নি, আবার কম জিপিএ পেয়েও অনেকে নামি কলেজে সুযোগ পেয়েছে। এটি নিয়ে দেশ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও ছাত্র-অভিভাবক আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরপর ২০১৫ সালে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইন-নির্ভর করে শিক্ষা বোর্ডের হাতে পুরো নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়।
ওয়েবসাইটের (xiclassadmission.gov.bd) মাধ্যমে আবেদনকে মূল মাধ্যম করা হয়, যেখানে ১০টি পর্যন্ত কলেজ পছন্দ করার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। প্রথমবারের মতো চালু হয় ভর্তি নিশ্চায়ন ও অটোমাইগ্রেশন। এই পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থী কলেজ পাওয়ার পর মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইনের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে নিশ্চিত করতে হয়। সিট খালি থাকাসাপেক্ষে পছন্দের কলেজে যেতে অটোমাইগ্রেশন পদ্ধতি আরও নিখুঁত করা হয়। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি করা হয় অনলাইনে।
তবে চলতি বছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল আন্তঃশিক্ষা বোর্ড। ভর্তি বাণিজ্য, তদবিরসহ নানা বিতর্কের কারণে বন্ধ হওয়া এ পদ্ধতি নাকচ করে দেয় মন্ত্রী নেতৃত্বাধীন সভা। বোর্ড থেকে লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি করানো যায় কি না এমন প্রস্তাবনাও ছিল। তবে বিদ্যমান জিপিএর ভিত্তিতেই ভর্তি হবেন শিক্ষার্থীরা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এমনটাই ঠিক হয়।







