নিকাব পরা ছাত্রীকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা, ঢাবি শিক্ষিকাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব
নিকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে কটাক্ষের অভিযোগ ওঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ।
আজ বৃহস্পতিবার বিভাগীয় এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা হয়েছে। সভায় অভিযোগ ও সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি রেজল্যুশন নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বিভাগীয় চেয়ারম্যান বা একাডেমিক কমিটির এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই।
অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের বিষয়ে উপাচার্য, একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিভাগ থেকে ঘটনাটি তাদের অবহিত করা হবে।
এর আগে গতকাল বুধবার দুপুরে ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের এক ক্লাসে নিকাব পরিহিতা এক ছাত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর শব্দচয়ন করেন বলে অভিযোগ তুলেন ওই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মনিকা বলেছেন, ক্লাস চলাকালে সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব নিকাব পরার কারণ নিয়ে প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে তাকে ক্লাসের অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে গিয়ে বসতে বলেন। শিক্ষক তার নিকাবের কারণে ‘অস্বস্তিকর’ ও ‘অনিরাপদ’ বোধ করছেন বলেও জানান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মনিকার দাবি, এর আগের একটি ক্লাসেও ওই শিক্ষক তাকে নিকাব খুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ থেকে নিকাব পরা নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ওই শিক্ষক নিয়মিতভাবে তার পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন।
ইংরেজি বিভাগের অন্যান্য ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমিও অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্লাসে ইসলাম ও পর্দা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ করেন। তার দাবি, বুধবারের ক্লাসে নিকাব পরা শিক্ষার্থীকে সমর্থন করায় তাকেও প্রশ্ন করা হয়।
সুমি বলেছেন, একপর্যায়ে ওই শিক্ষক নিকাব পরা শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ এবং ‘বোমা মারতে পারেন’—এমন মন্তব্য করেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ ছাড়া শিক্ষক নিজেকে ‘রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান’ দাবি করে শিক্ষার্থীদের কেউ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেছেন বলে দাবি করেন সুমি।
ভুক্তভোগী ও বিভাগের অন্যান্য ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সত্যতা মেলে ঘটনার সময়ের একটি ভয়েস রেকর্ড থেকে। ৩০ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের একটি ভয়েস রেকর্ড আগামীর সময়ের হাতে এসেছে। রেকর্ডে ২৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের পর ওই শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, ‘তুমি এমনভাবে কাপড় পরবা যাতে শরীরের আকৃতি বোঝা যায়।’
২৮ থেকে ২৯ মিনিটের মধ্যে বলা হয়, নিকাব করায় তিনি ডিস্ট্রাকটেড (মনোযোগ বিচ্ছিন্ন) ফিল করছেন এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেও বিশ্ববিদ্যালয় কোনো কিছু করতে পারবে না। ২৯ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের সময় নিকাব করায় ওই শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ করে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ (মৌলবাদী) ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুব।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী আগামীর সময়কে বলেছেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা আমার কাছে এসেছিলেন। তারা আমাকে বিস্তারিত বলেছেন। ইতোমধ্যে বিভাগীয় ক্লাস থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জেনেছি। এ বিষয়টি নিয়ে কি ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেটা এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দেখবে।’
কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগুক, এ ধরনের ভাষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কখনো প্রশ্রয় দেবে না বলেও জানান অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী।
এদিকে শিক্ষার্থীকে মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী বলে কটাক্ষের প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। বিক্ষোভ শেষে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তারা।
ডাকসুর পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমার নেতৃত্বে একদল নারী শিক্ষার্থী আজ দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে লিখিতভাবে এ দাবি জানান।
এদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন ইসলামী ছাত্রী সংস্থার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা। এ সময় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।





