৫ মাসের সন্তানের কাছে ফেরার তীব্র আকুতি ছিল বিথীর

বিথী স্বাভাবিক অবস্থায় (বামে) হাসপাতালের বিছানায় ফেসবুক লাইভে মৃত্যুর কদিন আগে (ডানে)
‘আমার ছোট্ট দুধের শিশুটি পথের দিকে চেয়ে আছে, তার মায়ের সুস্থ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায়’ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সন্তানের কাছে ফেরার আকুতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবেই লিখেছিলেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের বিথী আক্তার (২৫)। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো না। সন্তানকে আর বুকে জড়িয়ে নেওয়া হলো না তার। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাসের চিকিৎসা ও যন্ত্রণার পর বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ নার্স বিথী।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকেই বিথীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একাধিক অস্ত্রোপচার, আইসিইউ ও সিসিইউতে চিকিৎসার পরও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিথীর মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার স্বামী মো. রাকিবুল ইসলাম।
গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. তামান্না ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন বিথী। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকদের অবহেলায় তার পেটের ভেতর গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও নানা জটিলতায় ভুগতে থাকেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথম অস্ত্রোপচারের প্রায় দুই মাস পর গত ১৫ জুলাই বিথীর আবারও বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়। পরবর্তী সময়ে অবস্থার আরও অবনতি হলে কয়েক দিন তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৪ অক্টোবর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর আগে সামাজিক মাধ্যমে নিজের শারীরিক অবস্থা ও সন্তানের জন্য আকুতির কথা জানিয়েছিলেন বিথী। গত ২৯ সেপ্টেম্বর এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘সুস্থ-সবলভাবে সন্তান জন্ম দিয়ে সুখের সংসার করার কথা আমাদের। কিন্তু আজ দুই মাস ১৪ দিন হাসপাতালে পড়ে আছি।’
২৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুইক লাইভে এসে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। জানান তার মতো অসংখ্য মা সন্তান জন্ম দিতে এসে এভাবে মৃত্যুর মুখে পড়েছেন।
এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া আরেক পোস্টে নিজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে বিথী লিখেছিলেন, ‘বিগত চারটা মাস ধরে আমার ওপর দিয়ে ঝড় যাচ্ছে। এখন আমি সিসিইউতে ভর্তি আছি। আমার এখন হার্টের সমস্যাসহ নানা রোগ দেখা দিয়েছে। আগের ওজন ছিল ৬১ কেজি, আর এখন ৩৯ কেজি। বাবুটাকে চার মাস ধরে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছি না, আর পারব কি না জানি না। বাচ্চাকে ধরা তো দূরের কথা, কান্না করলে ঘরে শুয়ে শুয়ে কান্না করি।’
একই পোস্টে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন বিথী। লিখেছিলেন, ‘বাঁচব কি না শিওর না। আমি মরে গেলে আমার সন্তানের কী হবে? একজন মা-বাবার বড় সন্তান আমি। আমি মারা গেলে বাড়ির হাল কে ধরবে? আমার সাজানো পরিবার, স্বপ্ন, জীবন সবই নষ্ট।’
সন্তানের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতির পাশাপাশি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের বিচারও চেয়েছিলেন বিথী। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘মাছুম বাচ্চাটার জন্য হলেও আজকের মানববন্ধনে সবাই উপস্থিত থাকবেন। আমার সুস্থতা ফিরে পাব না, কিন্তু ডাক্তার তামান্নার বিচার হতে হবেই। উনার বাড়ি রাজবাড়ী হওয়ার পরেও কেন শাস্তি দিচ্ছেন না, খুঁজে বের করতে পারছেন না। ডাক্তারের স্বামী রাজবাড়ী কোর্টের উকিল। নাম, অ্যাডভোকেট সিমুল। কঠিন বিচার চাই।’




