মেয়াদের শেষপ্রান্তে রাকসু, বাস্তবায়ন হয়নি বহু প্রতিশ্রুতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) এক বছরের মেয়াদের ৯ মাস শেষ হয়েছে। এ সময়ে নির্বাচনী ইশতেহারের ২৪ দফা প্রতিশ্রুতির ৫৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে দাবি করেছে রাকসু।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে এমন প্রতিশ্রুতির সংখ্যা খুবই কম। ফলে মেয়াদের শেষ তিন মাসে বাকি ৪১ শতাংশ প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে ২৩টি পদের মধ্যে ভিপি ও এজিএসসহ ২০টিতে জয় পায় ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। নির্বাচনের আগে তারা এক বছরের মধ্যে ২৪টি সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার প্রকাশ করে। এতে শতভাগ আবাসিকতার রোডম্যাপ, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভাতা, মানসম্মত খাবার, প্রশাসনিক কার্যক্রম আধুনিকায়নে অ্যাপ, মেডিকেল সেন্টারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ছিল। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের দাবিগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
প্রথম দেড় মাস বাজেটসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এরপর ৯ মাসে ৫৯ শতাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকি ৪১ শতাংশ কাজ নিয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে
রাকসু ভিপি
তবে নয় মাস পার হলেও এসব প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল এখনো শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছেনি।
রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ দাবি করেন, প্রথম দেড় মাস বাজেটসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এরপর ৯ মাসে ৫৯ শতাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকি ৪১ শতাংশ কাজ নিয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
তার ভাষ্য, বড় পরিসরের ও উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে ইশতেহারে যেহেতু এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তাই শিক্ষার্থীদের কাছে তারা দায়বদ্ধ। মেয়াদের বাকি সময়ে সর্বোচ্চসংখ্যক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম তানবীর মন্তব্য করেন, শিক্ষার্থীরা ইশতেহারের ওপর আস্থা রেখেই রাকসুকে নির্বাচিত করেছেন। ৯ মাস পার হলেও অধিকাংশ প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি। বাজেট বা প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাত এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়।
আবাসন ও ভাতা
শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা আবাসন সংকট। ইশতেহারে শতভাগ আবাসিকতার রোডম্যাপ ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভাতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
মোস্তাকুর রহমান জাহিদ উল্লেখ করেন, অনাবাসিক ভাতার বিষয়ে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এখনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ভাতা না থাকায় বিষয়টি জটিল হয়ে আছে।
তিনি আরও জানান, ইউজিসি ছয়টি নতুন আবাসিক হল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। হল ও মেডিকেল সেন্টারের জন্য প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদিত হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে কাজ শুরুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
শিক্ষার্থী শোয়াইব মন্তব্য করেন, প্রতিশ্রুতিগুলো যদি বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে, অন্তত একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত ছিল।
খাবারের মানে পরিবর্তন নেই
ডাইনিং ও ক্যানটিনে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং নির্ধারিত মূল্যে খাবার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাকসুর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় পরিদর্শন করলেও খাবারের মান উন্নয়নে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান মন্তব্য করেন, শুধু পরিদর্শন নয়, শিক্ষার্থীরা খাবারের মানের স্থায়ী পরিবর্তন দেখতে চান।
প্রশাসনিক অ্যাপ
প্রশাসনিক কার্যক্রম আধুনিকায়নে একটি অ্যাপ চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। তবে রাকসুর দাবি, আইসিটি সেন্টার ও গবেষণা বিভাগের সমন্বয়ে অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে এবং আগামী আগস্টে এটি উদ্বোধনের সম্ভাবনা রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি
ইশতেহারে জুলাই আন্দোলনের দাবিগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও ছিল। এর মধ্যে রাকসু নির্বাচনকে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হলেও হামলাকারীদের বিচার, জুলাই জাদুঘর স্থাপন এবং ১৬ জুলাইকে ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস’ ঘোষণাসহ অন্যান্য বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট
মেডিকেল সেন্টারকে ২০ শয্যায় উন্নীত করা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবার প্রতিশ্রুতিও এখনো পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাখাওয়াত নাহিদ মন্তব্য করেন, মেডিকেল, ইন্টারনেট, লাইব্রেরি ও রিডিং রুমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এখনো প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখতে পাননি।
দৃশ্যমান অগ্রগতি
৯ মাসে রাকসু কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপন, ক্যাম্পাসে ফার্মেসি চালু, থিসিস প্রণোদনা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও বিভিন্ন হলের রিডিং রুমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপন, নারী উদ্যোক্তা মেলা এবং বিদেশি শিক্ষকদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, ফ্যাক্ট-চেকিং, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ওয়ার্ডপ্রেস ও গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যে আইইএলটিএস প্রস্তুতি, বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজন এবং কয়েকটি ভেন্যুর ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়নে ১৩ কোটি ২০ লাখ ৯২ হাজার টাকার বাজেট অনুমোদিত হলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য লিফট, ব্রেইল পদ্ধতি, অডিওবুক ও বিশেষ বাথরুম সুবিধার প্রতিশ্রুতিও এখনো দৃশ্যমানভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের রহমান অমি মন্তব্য করেন, প্রতিটি অ্যাকাডেমিক ভবনে লিফট থাকা জরুরি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের চলাচলে এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
এ বিষয়ে ভিপি দাবি করেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ঘোষিত বিভিন্ন উদ্যোগের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম উল্লেখ করেন, প্রশাসন ও রাকসু পৃথক সত্তা হিসেবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। শতভাগ আবাসিকতা এক বছরের মধ্যে নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে নতুন ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণ হলে আবাসিক সুবিধা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে উন্নীত হবে এবং ধাপে ধাপে শতভাগ আবাসিকতার দিকে এগোনো হবে।
রাকসুর কাজে প্রশাসনের অসহযোগিতার অভিযোগ নাকচ করে উপাচার্য জানান, রাকসুর এখতিয়ারের মধ্যে থাকা সব উদ্যোগে প্রশাসন ইতিবাচক সহযোগিতা করে আসছে।





