প্রাণ কাড়ছে সস্তা লিফট
- আধুনিক ও এআরডি যুক্তের চেয়ে নিম্নমানের লিফটে খরচ বাঁচে কয়েক লাখ টাকা
- সেই টাকা বাঁচানোর ‘বাণিজ্যে’ ৬ বছরে গেছে ২০ নারী পুরুষ ও শিশুর প্রাণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বহুতল ভবনের সংখ্যা দেশে বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। সেই সঙ্গে একসময়ের বিলাসী অনুষঙ্গ থেকে নিত্যদিনের অপরিহার্য বাহনে পরিণত হয়েছে লিফট বা এলিভেটর। কিন্তু এই যান্ত্রিক বাহনটির পেছনেই লুকিয়ে চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা। সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর লোভ, অদক্ষ হাতের কারিগরি আর মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রের ব্যবহার লিফটকে বানিয়ে তুলেছে বহুতল ভবনগুলোর একেকটি চলন্ত মৃত্যুকূপ। নিয়মিত দেখভালে অনীহা আর সস্তার খেসারত সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে নিজেদের জীবন দিয়ে। পাশাপাশি পঙ্গুও হচ্ছেন বহু মানুষ।
বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের মতে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ লিফটের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা বা আয়ুষ্কাল ২০ থেকে ২৫ বছর। কিন্তু দেশের শত শত ভবনে এই সময়সীমা পার হওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে চালানো হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ লিফট।
অনেকে আবার লিফট কেনার সময় সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে বাজার থেকে বেছে নিচ্ছেন নিম্নমানের ও নামহীন ব্র্যান্ডের লিফট। শুধু তা-ই নয়, কোনো পেশাদার প্রকৌশলীর পরামর্শ ছাড়াই সম্পূর্ণ অদক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে এসব লিফট করা হচ্ছে স্থাপন। ফলে ভবনের শুরুতেই থেকে যাচ্ছে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি।
লিফট স্থাপনের পর প্রয়োজন সেটির নিয়মিত তদারকি। কিন্তু দেশের অধিকাংশ ভবনেই করা হয় না লিফটের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষণাবেক্ষণ বা ‘মেইনটেইন্যান্স’। অদক্ষ লোক দিয়ে দায়সারাভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত চারটি বড় গাফিলতির কারণে লিফটগুলো পরিণত হচ্ছে একেকটি সচল মৃত্যুকূপে। যার মধ্যে অন্যতম হলো তদারকির অভাব। মাসে অন্তত একবার নিয়মিত তদারকি এবং বছরে একবার সব যন্ত্রাংশ পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। দুর্ঘটনার আরেকটি অন্যতম কারণ অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস (এআরডি) না থাকা। বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট যেন মাঝপথে আটকে না যায়, সেজন্য এই যন্ত্রটি জরুরি। কিন্তু সস্তার লিফটে এটি থাকে না। দুর্ঘটনায় হতাহত বাড়তে ভূমিকা রাখে অকেজো অ্যালার্ম ও ফ্যান। লিফট আটকে গেলে ভেতরে বাতাস চলাচলের ফ্যান এবং জরুরি যোগাযোগের অ্যালার্ম বাটন নষ্ট থাকে বেশিরভাগ সময়ই। এতে ভেতরে থাকা মানুষ প্যানিক অ্যাটাক বা অক্সিজেনের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। মারাও যান অনেকে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠাও লিফটকে ঠেলে দেয় দুর্ঘটনার মুখে। লিফটের ধারণক্ষমতা বা সক্ষমতা না মেনে গাদাগাদি করে মানুষ ওঠানোও ডেকে আনে দুর্ঘটনা।
অনেক লিফটে আবার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠেন, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই যাত্রীদেরও সচেতন হওয়া দরকার। তবে কোনো কারণে লিফট আটকে গেলে আতঙ্কিত হয়ে কান্নাকাটি, দরজা ঝাঁকাঝাঁকি করলে বিপদ আরও বাড়তে পারে; বরং শান্ত হয়ে অপেক্ষা করতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ছয় বছরে দেশে ঘটেছে ৮৮৭টি লিফট দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৯০০ জন।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে ২০২৪ সালে। ওই এক বছরেই নিহত হন ৬ জন এবং আহত হন প্রায় ২০০ মানুষ। এর আগের বছর ২০২৩ সালে ১৭৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৯ জন।
২০১৯ সাল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের বার্ষিক প্রতিবেদনে লিফট দুর্ঘটনাকে আলাদা কোড না দিয়ে ‘ভবনে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার’ হিসেবে একসঙ্গে গণনা করা হতো, যে কারণে এর আগের বছরগুলোর লিফট দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্ভব হয়নি জানা। তা ছাড়া ফায়ার সার্ভিস শুধু সেই তথ্যই রাখে, যেখানে তাদের উদ্ধারকারী দল সরাসরি অংশ নেয় বা কল পায়। এর বাইরেও শত শত দুর্ঘটনার তথ্য থেকে যায় আড়ালেই।
সবচেয়ে বেশি লিফট দুর্ঘটনা ঘটছে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালগুলোয়, যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সবচেয়ে বেশি। সুস্থ হতে আসা রোগী কিংবা সেবাপ্রার্থী সাধারণ মানুষ এসব ভবনে ঢুকেই শিকার হচ্ছেন চরম আতঙ্কময় পরিস্থিতির।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিফট নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হলে সিংহভাগ দুর্ঘটনাই সম্ভব এড়ানো। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় অবহেলার প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের লিফট ব্যবহার বন্ধে সরকারের কঠোরতা এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।




