কমছে জাপানের একক আধিপত্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের প্রথম মেট্রোরেল উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ তৈরি হচ্ছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ ও কারিগরি সহায়তায়। এ সাফল্যে ভর করে অন্যান্য মেট্রোরেলেও ঋণ দিতে আগ্রহ দেখায় সংস্থাটি। এর মধ্যে আরও নতুন দুটি মেট্রোরেল তৈরিতে অর্থায়নের চুক্তিও হয়েছে। কিন্তু সেগুলো রয়েছে অতিরিক্ত খরচ ধরা নিয়ে প্রশ্ন। এজন্য একক অর্থায়ননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় সরকার। জাইকার অর্থায়নে খরচ বেশি এবং সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়াসহ নানা কারণে জাপানের বিকল্প অর্থায়ন নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে অন্য মেট্রোরেল লাইনগুলোতে ঋণ নেওয়া হচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), দক্ষিণ কোরিয়া, বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে। পাশাপাশি আরও নতুন অর্থের উৎস অনুসন্ধানের কাজ চলছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) বাস্তবায়ন চলমান এবং প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মেট্রোরেল সম্পর্কিত এক বৈঠকে ইআরডির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমাদের পাশের দেশ ভারতের বেঙ্গালুরুতে মেট্রোরেল নির্মাণ খরচ কিলোমিটারপ্রতি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং চেন্নাইয়ে কিলোমিটারপ্রতি ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার হলেও এ দেশে জাইকার বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল নির্মাণ খরচ প্রতি কিলোমিটার ১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। এত বেশি খরচ কেন হচ্ছে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা দরকার।’
ওই সভার সভাপতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন, বাংলাদেশে মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয় এবং অন্যান্য দেশের তুলনায় এ দেশে মেট্রোরেলের কাজের গুণগত দিক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কি না— তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বর্তমানে চলমান প্রকল্পের প্যাকেজগুলোর ইঞ্জিনিয়ারিং এস্টিমেট ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) উল্লিখিত দরের তুলনায় অনেক বেশি। তাই আন্তর্জাতিকমানের প্রাইজ কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে পরীক্ষা করতে হবে।
সূত্র জানিয়েছে, এমআরটি লাইন-১-এর রুট হচ্ছে দুটি। একটি হলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পুরোটাই পাতাল রেল হবে। এ ছাড়া পূর্বাচল রুট হলো নতুন বাজার থেকে পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত উড়াল পথে মেট্রোরেল। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা ঋণ দেবে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। এরই মধ্যে এটির অত্যধিক প্রাক্কলিত ব্যয় নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এমআরটি লাইন-৫-এর (নর্দান রুট) আওতায় হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেল তৈরি হবে। এটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ রয়েছে ৬৮ হাজার ৯১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এটির ব্যয় নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
এদিকে জাইকার বাইরে এমআরটি লাইন-৫-এর (সাউদার্ন রুট) আওতায় গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত তৈরি হবে উড়াল ও পাতাল পথে সাড়ে ১৭ কিলোমিটার মেট্রোরেল। এটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়া ঋণ দেবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া এমআরটি লাইন-২-এর আওতায় গাবতলী-পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার মেট্রোরেল তৈরি করা হবে। এটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ দিতে চায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এআইআইবিও ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমআরটি লাইন-৪-এর আওতায় কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত ৯ দশমিক ৯ মাইল মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। এটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইডিসিএফ ঋণ দেবে ২১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।
সুদ বাড়িয়েছে জাইকা: জাইকা ছিল একসময় বাংলাদেশের উন্নয়নে অন্যতম সস্তা ঋণদাতা সংস্থা। এটির সুদের হার ২০১৫ সাল থেকে ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। ১৫ এপ্রিল থেকে সর্বশেষ দফা কার্যকর করা হয় বর্ধিত সুদ। অর্থাৎ বর্তমান সুদের হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া পরামর্শক সেবা খাতে ঋণের সুদের হার শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে এখন ১ শতাংশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইআরডির সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর ভাষ্য হলো— ‘আমরা শুরু থেকেই এ সুদহার বৃদ্ধির বিপক্ষে ছিলাম। বারবার জাইকার কাছে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো সাড়া দেয়নি।’







