১০ বছর পর শুরু হচ্ছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্মাণকাজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা কারণে থমকে থাকার পর অবশেষে শুরু হচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুল আলোচিত ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড)-এর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ। প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর অংশ হিসেবে আগামীকাল সোমবার সকাল ১০টায় প্রকল্প এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি কৌশলগত অবস্থানে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এখানে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ হওয়ার পাশাপাশি দেশের রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বললেন, প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবায়নের মোট সময় পাঁচ বছর ধরা হলেও প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট কারখানা নির্মাণের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
আনোয়ারার প্রকল্প এলাকায় অনুষ্ঠেয় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে। ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘদিন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রসর হয়নি।
পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। ওই সফরের ধারাবাহিকতায় বেজা এবং চীনের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সিআরবিসির মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি বিনিময় হয়। চীন সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সরকারের মেয়াদের প্রথম চার মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কাজ শেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রকল্পটিকে পূর্ণাঙ্গ শিল্পনগর হিসেবে গড়ে তুলতে মূল অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশাপাশি ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার একটি সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন করবে চীন সরকার রেয়াতি ঋণের মাধ্যমে এবং বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।
এই অর্থে চার লেনের সংযোগ সড়ক, সেতু, পরিবেশবান্ধব কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট-টন সক্ষমতার বহুমুখী জেটি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বললেন, চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেছেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে চীন থেকে কাপড়, অ্যাকসেসরিজ ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এসব উপকরণ যদি চট্টগ্রামের এই অর্থনৈতিক অঞ্চলেই উৎপাদন ও সরবরাহ করা যায়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় ও লিড টাইম উভয়ই কমবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়বে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পোশাকশিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, উন্নত টেক্সটাইল, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।




