বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার সংস্কারে মাইলফলক
- মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের রূপরেখা উপস্থাপন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৃহৎ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তি— মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং শ্রম কূটনীতিলব্ধ অর্জনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফরের সার্বিক সাফল্য, বাণিজ্য সম্প্রসারণের রূপরেখা এবং কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর প্রস্তুত করা একটি পূর্ণাঙ্গ সারসংক্ষেপ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়া এবং উদীয়মান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন সন্ধিক্ষণে উপনীত হচ্ছে বলে জানানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগের সম্ভাবনার পাশাপাশি উভয় দেশের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর জটিলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান। সেটি মোকাবিলার অংশ হিসেবে ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর সফর দুই দেশের মধ্যকার গভীর সৌহার্দ্যের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। সরকারের এই চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বাস্তবে রূপ দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ বিএমসিসিআই অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
মন্ত্রিসভা বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের মধ্যে উভয় দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের গতি ত্বরান্বিতকরণ করা হয়। এ ছাড়া অগ্রাধিকারমূলক খাতে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ, শ্রমবাজার পুনঃউন্মুক্ত এবং আঞ্চলিক জোট আসিয়ানে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান সুদৃঢ় এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে মন্ত্রিসভা।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে নতুন সম্ভাবনা: মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত বিবরণীতে জানানো হয়, এই সফর শুধু একটি নিয়মিত আনুষ্ঠানিক সফর ছিল না; বরং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কূটনীতিক্ষেত্রে যে নতুন উচ্চতায় পদার্পণ করছে, এটি তারই এক বাস্তব দলিল।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি: মালয়েশিয়ার রাজধানী পুত্রাজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে আয়োজিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ‘বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্তবাণিজ্য চুক্তি’ সম্পাদন ত্বরান্বিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে উভয়পক্ষই আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে প্রস্তাবিত এফটিএ স্বাক্ষর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সম্পূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছায়। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে।
অগ্রাধিকারমূলক খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণ: মন্ত্রিসভার কার্যবিরণীতে বলা হয় প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে সে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অবকাঠামো, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, ডিজিটাল আইসিটি টেকনোলজি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং আধুনিক বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে মালয়েশীয় বিনিয়োগ ও যৌথ অংশীদারত্ব জোরদারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল’ আবার কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
শ্রমবাজার সংস্কার, দক্ষ কর্মী প্রেরণ: দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে মালয়েশিয়া হলো বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম শ্রমবাজার এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদার। এই সফরকালে শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা ও প্রবাসী কর্মীদের অধিকার রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ আবার শুরু, দক্ষ কারিগরি কর্মী প্রেরণ, অনিয়মিত শ্রমিকদের পর্যায়ক্রমে বৈধকরণ এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ কমিয়ে এনে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা রহিত করার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। এর মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
আসিয়ান জোটে সমর্থন আদায়: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট ‘আসিয়ান’-এ বাংলাদেশ যেন যুক্ত হতে পারে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়ার স্পষ্ট ও পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, আসিয়ান কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জোরালো করতে তারা গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান: রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং মিয়ানমারে প্রবাসীদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মালয়েশিয়া কূটনৈতিক প্রভাব অব্যাহত রাখবে বলে জানায়। আসিয়ান ফোরাম এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে কার্যকর পথ খোঁজার বিষয়েও মালয়েশিয়া সচেষ্ট থাকবে।
দ্বিপক্ষীয় সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা স্মারক: সফরকালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিধান এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মন্ত্রী পর্যায়ে দুটি কৌশলগত যৌথ নোটিং বা কূটনৈতিক নোট বিনিময় করা হয়েছে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশ মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর্যালোচনা শেষে জানানো হয়, মালয়েশিয়ার এই ঐতিহাসিক সফর শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের সার্বিক বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ানো, রফতানি ঝুড়ি বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
সফরের প্রস্তাবিত সিদ্ধান্ত ও প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এই সফরের ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশ আরও শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মন্ত্রিসভার সার্বিক মূল্যায়নে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।







