বিলুপ্তির পথে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প
- মজুরি ও বাজার সংকট

ছবি: আগামীর সময়
শ্রমিকের মজুরি সংকট, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, যন্ত্রচালিত তাঁতের আগ্রাসন এবং সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে বিলুপ্তির পথে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও শাড়ির ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশায় এই প্রাচীন পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন দক্ষ কারিগররা। সরকার এই শিল্প রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা দেখলেও আশাবাদী হতে পারছেন না প্রান্তিক কারিগররা।
টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প রক্ষায় সরকার দক্ষ কারিগর তৈরির মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। কাঁচামালের উচ্চমূল্য, যন্ত্রচালিত তাঁতের আগ্রাসন এবং ন্যায্য মজুরির অভাবে চরম হতাশায় দিন পার করছেন প্রান্তিক কারিগররা। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যবসায়ীরা যেমন নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না, তেমনি জীবন-জীবিকার তাগিদে বহু দক্ষ তাঁতি বাধ্য হয়ে ছাড়ছেন বাপ-দাদার এই প্রাচীন পেশা।
শিল্পটির করুণ অবস্থার বাস্তব চিত্র উঠে আসে টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাকের কথায়। তিনি জানালেন, ২০১৫ সালে পাথরাইল এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতিপরিবার থাকলেও, বর্তমানে তা কমে ৪০০-৪৫০টিতে দাঁড়িয়েছে। জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ তাঁতি এরই মধ্যে এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। রপ্তানি বাণিজ্যেও বড় ধাক্কা লেগেছে। আগে স্থলপথে এক দিনে প্রতিবেশী দেশে শাড়ি পৌঁছলেও, এখন সময় লাগছে এক থেকে দেড় মাস। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষায় বিদেশি ক্রেতারা হারাচ্ছেন আগ্রহ।
যদিও এসব সংকটের মধ্যেই শিল্পের আধুনিকায়নে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এ খাতের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং কারিগরদের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ করা হবে।
সরকারের উদ্যোগেও আশাবাদী হতে পারছেন না বাজিতপুরের প্রদীপ তরফদার। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, একটি শাড়ি তৈরি করতে প্রায় তিন দিন লাগে, অথচ মজুরি পাওয়া যায় মাত্র ৭৫০ টাকা। ন্যায্যমূল্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে শুধু দক্ষ কারিগরদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কী লাভ?
দীর্ঘ ৫০ বছর এ পেশায় থাকা নির্মলকান্তি জীবনে কোনোদিন প্রশিক্ষণের নাম শোনেননি। তার মতে, পুরনোরা নিরুপায় হয়ে কাজ করছেন, আর নতুন প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসছে না। তাই নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে সরকারকে আগে বাস্তবসম্মত আশার আলো দেখাতে হবে।
লিয়াজোঁ কর্মকর্তার (তাঁত বোর্ডের বাজিতপুর) তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সদর, দেলদুয়ার ও বাসাইলের ৩২টি সমিতিতে তাঁতি ছিল ১৮ হাজারের বেশি, যা বর্তমানে ১৫ হাজারের নিচে নেমেছে। অন্যদিকে, কালিহাতী বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা জানালেন, তাদের ১৭টি সমিতির অধীনে ২০১৮ সালে ১৮ হাজার ৮৪ জন তাঁতি থাকলেও, বর্তমানে তা নেমে এসেছে অর্ধেকে।
এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) ‘টাঙ্গাইল শাড়ি উইভিং (লেভেল-২)’ অকুপেশনের কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড ও কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন ডকুমেন্টের ওপর একটি ভ্যালিডেশন কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালায় বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু আহমদ ছিদ্দিকী বলেছেন, আমরা তাঁত বোর্ডের আওতাধীন টাঙ্গাইলের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এনএসডিএর অধীনে নিবন্ধন করে দ্রুত আধুনিক কোর্স চালুর উদ্যোগ নিচ্ছি, যা এ শিল্পের উন্নয়ন ও মানবসম্পদ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
এনএসডিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে।




