‘মা, আমি এসেছি’—এই একটি ডাকের অপেক্ষায় ১১ বছর

ছেলে নিয়ামুল হোসেনের ছবি নিয়ে মা রোকেয়া বেগম—ছবি: আগামীর সময়
প্রতিদিনের মতো ঘরের এক কোণে রাখা ছেলের ছবির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকেন রোকেয়া বেগম। তারপর ধীরে ধীরে তাকান ঘরের দরজার দিকে। যদি হঠাৎ করেই ফিরে আসে তার বড় ছেলে নিয়ামুল হোসেন। যদি একবার ডেকে ওঠে, ‘মা, আমি এসেছি।’ সেই আশাতেই কেটে গেছে ১১ বছর। কিন্তু অপেক্ষার হয়নি শেষ।
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বগা জেলে পল্লীর বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৬৫)। তার স্বামী শুকুর আলীর (৭০)।
বড় ছেলে নিয়ামুল হোসেন। ২০১৫ সালে জীবিকার তাগিদে অন্য জেলেদের সঙ্গে সাগরে মাছ ধরতে যান। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। সঙ্গে থাকা অন্য জেলেরা ফিরে এলেও নিয়ামুল আর ঘরে ফেরেননি।
পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য, বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়ের মধ্যে সাগরে কোথাও নিখোঁজ হয়ে যান নিয়ামুল। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। তবু মায়ের বিশ্বাস, ছেলে একদিন ঠিকই ফিরে আসবে।
নিয়ামুলের ছোট ভাই বাশার বললেন, ‘ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পরিবারের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। বহু জায়গায় খোঁজ করেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, দরজায় সামান্য শব্দ হলেই মা এখনও মনে করেন, নিয়ামুল ফিরে এসেছে।’
বৃদ্ধ বাবা শুকুর আলী বললেন, ‘বয়সের ভারে এখন আর কাজ করতে পারেন না। সংসারের অভাবের সঙ্গে ছেলেকে হারানোর কষ্টও প্রতিদিন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের কোনো খোঁজ জানতে চান তিনি।’
রোকেয়া বেগম বললেন, ‘১১ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমার ছেলে কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। প্রতিদিন তার জন্য অপেক্ষা করি। আল্লাহর কাছে শুধু একটাই দোয়া করি। মৃত্যুর আগে যেন একবার তাকে দেখতে পারি।’
স্থানীয় বাসিন্দা একলাস হোসেন জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। বৃদ্ধ বাবা-মা এখনও ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন। মানবিক কারণে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
পরিবারের দাবি, ছোট ছেলের সীমিত আয়েই এখন কোনো রকমে সংসার চলছে। একটি ছোট ঘরে বসবাস করছেন বৃদ্ধ দম্পতি। নিয়ামুল নিখোঁজ হওয়ার ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও তারা কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসন পাননি।
এ বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বললেন, ‘পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন পাওয়া যায়নি। আবেদন পেলে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
উপকূলের অসংখ্য জেলে পরিবারের মতো নিয়ামুলের পরিবারও আজ অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার দীর্ঘ এক অধ্যায়ের মধ্যে বন্দি। সময় এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বৃদ্ধ মা-বাবার চোখে এখনও একটাই স্বপ্ন। একদিন হয়তো দরজায় কড়া নাড়বে হারিয়ে যাওয়া ছেলে।




