লাল-সাদার অপূর্ব মেলবন্ধন, প্রকৃতিতে শুভ্র রূপসী ‘কেউ’

ছবিটি কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আগামীর সময়
মেঠো পথের ধারে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হয়। গাঢ় লাল রঙের শংকু আকৃতির মঞ্জরি, আর তার ওপর ফুটে আছে পাতলা কাগজের মতো ধবধবে সাদা এক পাপড়ির ফুল। বৈপরীত্যের এই এক অদ্ভুত সৌন্দর্য! গ্রামীণ প্রকৃতির অন্যতম রূপসীে এই ফুলের নাম ‘কেউ’।
বর্ষা ও শরতের এই দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রাকৃতিক বনজঙ্গল, ছায়াবৃত স্যাঁতসেঁতে এলাকা কিংবা ছড়ার পাড়ে কেউ ফুলের শোভা সহজেই চোখ কাড়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় লাল কোনো মোমদানির ওপর সাদা রূপালী শিখা জ্বলছে।
প্রকৃতির ব্যাকরণ ও বৈজ্ঞানিক পরিচয়
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে এটি হেলেনিয়া স্পেসিওসা বা কস্টাস স্পেসিওসাস নামে পরিচিত। ইংরেজি ভাষায় একে ‘ক্রেপ জিনজার’ বা ‘ক্যানো রিড’ বলা হয়। কারণ, এর সাদা পাপড়িগুলোর বুনন সুক্ষ্ম ক্রেপ কাগজের মতো কুঁচকানো এবং এর গাছ দেখতে অনেকটা আদা বা বাঁশ গাছের কাণ্ডের মতো পেঁচানো (স্পাইরালিং স্টেম)।
গাছের গোড়া থেকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ডালপালাগুলো সোজা ওপরের দিকে উঠে যায়। সাধারণত এই গাছ ৫ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। গাছের ডালের মাথায় শক্ত ও খসখসে লাল রঙের একটি শক্ত মঞ্জরিপত্র বা ‘ব্র্যাক্ট’ তৈরি হয়। এই রক্তিম মঞ্জরির ভেতরের খাঁজ থেকেই একে একে ফুটে বের হয় শুভ্র কেউ ফুল। সাদা পাপড়ির মাঝখানে থাকে ঈষৎ হলুদ বা সোনালি ছোঁয়া। তবে প্রতিটি ফুল স্থায়ী হয় মাত্র এক দিন, কিন্তু একটি মঞ্জরি থেকে টানা বহু দিন ধরে নতুন নতুন ফুল ফুটতে থাকে।
কেউ কেবল মেঠো পথের সৌন্দর্য বাড়ায় না, লোকজ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এর ভূমিকা অপরিসীম। ভেষজ চিকিৎসকদের মতে, এই গাছের কন্দ বা রাইজোম হজমের সমস্যা, জ্বর, কাশি, ত্বক এবং হাঁপানি উপশমে ব্যবহার করা হয়। এর কন্দ ও পাতার রস রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বলে বহুকাল ধরে গ্রামীণ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গাছটির মূলের নির্যাসে কিছু প্রাকৃতিক উপাদান থাকায় প্রাচীনকালে তা কৃমিনাশক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
একসময় বাংলাদেশের বনাঞ্চল ও মেঠো পথের ধারে অনাদরে-অবহেলায় প্রচুর কেউ গাছ দেখা যেত। তবে দিন দিন প্রকৃতি ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বনাঞ্চল কাটার ফলে ঝোপঝাড় কমে যাওয়ায় এই অনিন্দ্য সুন্দর ফুলটি আগের চেয়ে কিছুটা বিরল হয়ে পড়ছে।
প্রকৃতির বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় এবং দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে এই কেউ ফুলের সংরক্ষণ জরুরি। উদ্যানপ্রেমীরা এখন বাড়ির বাগানে বা ছাদবাগানের নান্দনিকতা বাড়াতে লাল-সাদার এই অপূর্ব মেলবন্ধনের গাছটি রোপণ করছেন, যা সত্যি আশাব্যঞ্জক।
জনতা ব্যাংকের ভানুগাছ বাজার শাখার ব্যবস্থাপক ও প্রকৃতিপ্রেমী জাকির হোসেন জানান, কেউ ফুলের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে তিনি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকা থেকে একটি চারা নিজ বাড়িতে রোপন করেছেন।
শরতের স্নিগ্ধ সকালে লাল মঞ্জরির বুক চিরে জেগে ওঠা একটি কেউ ফুল যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির রূপসী সৌন্দর্যের জন্য খুব বেশি আয়োজনের প্রয়োজন হয় না, অনাদরে ফুটে থাকা এক চিলতে শুভ্রতাই যথেষ্ট।






